মহানবী সাঃ এর জীবনী। নবুওয়তের সপ্তম থেকে নবম বৎসর
কুরায়শগণ দেখল, মুসলমানের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। হযরত আমীর হামযা ও হযরত উমরের ন্যায় বীর পুরুষগণ ইসলামের পতাকা ৩লে উন্নত মস্তকে দন্ডায়মান হচ্ছে। প্রকাশ্যভাবে কা'বা গৃহে আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করে মুসলমানগণ ৩।দের ঠাকুর-দেবতাদের অপমান করতেছেন। হাবশা হতে তাদের প্রতিনিধিদল অপমানিত হয়ে বিড়াতিড় হচ্ছে। মুসলমানগণ যে হাবশাতে শান্তির জীবন যাপন করছে, শুধু তাই নয়; বরং হাবশা-রাজ নাজ্জাশী স্ব ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামকে শক্তিশালী করে তুলছেন। তাদের অজস্র অর্থ ব্যয়, বাধা-বিঘ্ন, ষড়যন্ত্র এবং সর্ববিধ প্রচেষ্টা বিফলে গেল। এজন্য তারা ক্রোধে ক্ষোভে ও অভিমানে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগল।
কুরায়শগণ প্রকাশ্যে কিছু না বললেও অভ্যন্তরীণভাবে অনেক কিছু করল। তারা সপ্তম হিজরীর ১লা মুহাররম রাত্রি বেলায় বণু কিনানার খায়ফে এক গোপন সভা আহবান করে স্থির করল যে, মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর সমর্থনকারী আত্মীয়-স্বজন এবং শিষ্যবৃন্দকে পূর্ণভাবে বয়কট করে রাখতে হবে। তারা সকলে মিলে এই মর্মে একটি প্রতিজ্ঞাপত্র দস্তখত করল। এই প্রতিজ্ঞাপত্রের লেখক ছিল মনসূর ইবন 'ইকরামা। তাতে লেখা হল-
![]() |
| মহানবী সাঃ এর জীবনী। নবুওয়তের সপ্তম থেকে নবম বৎসর |
১. মুসলমানদের সাথে ক্রয়-বিক্রয়, সামাজিক আদান-প্রদান, চলা-ফেরা আলাপ-আলোচনা সব বন্ধ থাকবে।
২. কেউ তাঁদেরকে কন্যা দান করতে বা তাঁদের কন্যা গ্রহণ করতে পারবে না। তাঁদের সাথে বৈবাবিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে রহিত হয়ে যাবে।
৩. যে-কোন ব্যক্তি যে কোন অবস্থায় তাদেরকে যে কোন প্রকার সাহায্য করবে, সে অপরাধীরূপে কঠোর দণ্ডের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
৪. যে পর্যন্ত হত্যা করার জন্য তারা স্বেচ্ছায় মুহাম্মদ (সাঃ)-কে আমাদের হাতে সমর্পণ না করবে সে পর্যন্ত এই প্রতিজ্ঞাপত্র বলবৎ থাকবে। প্রতিজ্ঞাপত্রের মর্ম শুনে দস্তখত ও সকলের সম্মতি গ্রহণ করা হল এবং পবিত্রতার ছাপ লাগায়ে প্রতিজ্ঞার দৃঢ়তা সাধনের জন্য এটা কা'বা শরীফে লটকায়ে দেয়া হল।
কুরায়শদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও বৈরীভাব লক্ষ্য করে খাজা আবূ তালিব অবিলম্বে হাশিম এবং মুত্তালিব গোত্রের লোকদেরকে নিয়ে পরামর্শ করলেন। স্থির হল-এই সময় শহর হতে বাইরে অবস্থান ঝরাই সঙ্গত। কারণ, সেখান হতে পানীয় ও খাদ্য সংগ্রহের কোন একটা কিছু চেষ্টা করা সম্ভব হতে পারে। শহরের ভিতরে কুরায়শদের মধ্যস্থলে থেকে এটা কিছুতেই সম্ভব হবে না।
এই পরামর্শ অনুসারে শহর হতে কিছু দূরে হাশিম বংশের বহু কালের অধিকৃত একটি গিরিসঙ্কটে গিয়ে নিজে তার অস্থায়ী আবাস রচনা করলেন। চতুর্দিকে পর্বত বেষ্টিত হওয়ার দরুণ স্থানটি দূর্গের ন্যায় বেশ সুরক্ষিত ছিল। এই স্থানটি শি'আবু আবী তালিব বা আবূ তালিবের গিরিসঙ্কট নামে পরিচিত।
অকস্মাৎ এই ঘটনা ঘটে যাওয়ায় তাঁরা বিপদের জন্যে খাদ্যশস্যাদিও সংগ্রহ করতে পারেননি। বাইরে থেকে খাদ্য সংগ্রহ করার পথও বন্ধ হয়ে গেল। কারণ বাইরে থেকে সেখানে যেন কোন উপায়েই পানীয় খাদ্য পৌঁছতে না পারে, কুরায়শগণ সেই হেতু সর্বপ্রকার ব্যবস্থা অবলম্বন করে রেখেছিল। যতই দিন যায় তাঁদের খাদ্য সঙ্কট ততই বৃদ্ধি পায়।
ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়ে তাঁরা বৃক্ষ-পত্র খেতে আরম্ভ করলেন। ক্ষুধার তাড়নায় স্ত্রীলোক ও শিশুসন্তানগণ ছটফট করতে থাকত। তাঁদের করুণ ক্রন্দনে পাষাণদের হৃদয় ও কেঁপে উঠত; কিন্তু কুরায়শদের পাষাণ হৃদয় এতটুকুও বিচলিত হত না। হযরত সা'আদ ইবন ওক্কাস বলেন, একদিন রাত্রিকালে এক খণ্ড শুষ্ক চামড়া পেয়ে তা ধুয়ে পরিষ্কার করে নিলাম এবং আগুনে পুড়ে গুড়া করে পানিতে মিশ্রিত করে তা দ্বারা উদর-জ্বালা নিবারণ করলাম। হায় কি মহাবিপদে। অসহ্য উদর-জ্বালা, আবক্ষ তৃষ্ণা, ক্ষুধার্ত শিশুদের কাতর আত্মীয়-স্বজনগণের বিমর্ষ সুর্দী তিন বৎসর কাল দারুণ দুঃখ-ক্লেশের মধ্য দিয়ে কাটতে হয়েছিল। ধন্য তাঁদের ধৈর্য। ধন্য তাঁদের সংকল্পের দৃঢ়তা।
কুরায়শগণ মনে করল, এবার মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর ধর্ম চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এজন্য বের হতে যেন কোন দ্রব্য যেতে না পারে তজ্জন্য কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করল। এই সুযোগে তাঁদেরকে নিষ্পেষিত করে ফেলতে পারলেই মক্কাভূমি ইসলামে উপদ্রব হতে মুক্ত হতে পারবে। এই কথা ভেবে তারা পূর্ণোদ্যমে নির্যাতন চালিয়ে যেতে লাগল।
অপর পক্ষে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুগামীদের কি অপূর্ব, ধৈর্য এবং সংযম। তাঁদের প্রাণ ওষ্ঠাগত, সম্মুখে মৃত্যুর বিকট মূর্তি তাঁদেরকে গ্রাস করার জন্য প্রস্তুত; অথচ তাঁরা নিজেদের সংকল্পে অটল এবং সম্পূর্ণ নির্বিকার। এত যে দুঃখ, এত যে বিপদ, তবু কারও মুখে কোন কথা নেই, ধৈর্য্যচ্যুতি নেই, যার জন্য এ দুঃখ বরণ করছেন; তাঁর ভালবাসায় একটুখানি শিথিলতাও নেই। জীবন-মরণ পণ করে সত্যের সেবায় আত্মোৎসর্গ করে নিশ্চিত হয়ে রয়েছেন। জগতের ইতিহাসে তার নমুনা আছে কি?
এরূপ ধের্য ও দৃঢ়দা ছিল বলেই তাঁরা কিয়ৎ সময় পরেই অতি সহজে বিশ্ববিজয়ী হতে পেরেছিলেন। এটা মুসলমানদের আদর্শ।
এতবড় দুর্দিনেও রাসূল (সাঃ) সত্য প্রচারে বিরত থাকে নি। আমীর হামযা (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে তিনি কখনও বা গোপনে আবার কখনও বা প্রকাশ্যভাবে সত্য প্রচার করতে থাকতেন। হজ্জের মৌসুমে হজ্জযাত্রীদের নিকট যেয়ে তাদেরকে স্থানে স্থানে সমবেত করে সত্যবাণী প্রচার করতেন। আবু লাহাব তাঁর পশ্চাৎ পশ্চাৎ ঘুরতে থাকত এবং লোকদেরকে বলত যে, এই লোকটি পাগল, তোমরা তাঁর কথা শুন না। রাসূল (সাঃ) নীরবে সব সহ্য করতেন এবং তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে স্বীয় কর্তব্য পালনে রত থাকতেন।
হাশিমীদের কোন কোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন রাত্রিকালে চুপে চুপে তাঁদের নিকট খাদ্য-শষ্য পৌঁছাতে থাকত। কিন্তু ধরা পড়লে মহাবিপদ ঘটবে, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় খাদ্য পৌঁছায়ে দেয়া সম্ভব হত না। একদিন হযরত খাদীজার ভাতুষ্পুত্র হাকীম হযরত খাদীজার জন্য কিছু গম নিয়ে যাচ্ছেন। আবূ জাহল দেখে তাকে বলল, তুমি এটা কি করতেছ? প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে গম নিয়ে যাচ্ছে কেন? আমি তোমাকে অপমানিত না করে ছাড়ব না। ঘটনাক্রমে, আবুল বুখতরী তথায় এসে উপস্থিত হল। সে আবু জাহলকে বলল, তুমি হাকীমকে ছেড়ে দাও। তার ফুফু ক্ষুধায় মারা যাচ্ছেন, এমন সময় সে নিজ ফুফুকে সাহায্য না করে পারে না। এই কথা শুনে সে আবুল বুখতরীকে গালি দিতে আরম্ভ করল। আবূ বুখতরী রাগান্বিত হয়ে উটের মস্ত বড় একটা হাড় উঠায়ে তাকে ভীষণভাবে আঘাত করল। সে আঘাত সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল। তখন আবুল বুখতরী আরও কয়েক ঘা ঘুষি ও লাথি মেরে তাকে খুব শিক্ষা দিল। অদূরে দাঁড়ায়ে হযরত আমীর হামযা নিজ চক্ষে এই তামাশা দেখতেছিলেন।
স্বভাবের বিরোধিতা করে মানুষ বেশী দিন টিকে থাকতে পারে না। যা স্বাভাবিক তা স্বতঃই প্রকাশিত হয়ে পড়ে। মানুষের প্রতি মানুষের এত নির্মমতা যে অন্যায় ও অস্বাভাবিক, কুরায়শদের মধ্যে অনেকের মনেই তা জাগরিত হয়ে উঠল। মানুষের প্রাণে প্রাণে পরস্পর যে একটা নিগূঢ় সম্পর্ক আছে, একটা গোপন যোগসূত্র আছে এবং সেই সম্বন্ধটা যে সকল দ্বন্দু কলহের উর্ধ্বে, অনেকেই তা মর্মে মর্মে অনুভব করতে লাগল। মানুষের ধর্মমত স্বতন্ত্র হতে পারে; কিন্তু এজন্য কি এত নিষ্ঠুরতা? দুই একজন হৃদয়বান মহানুভব ব্যক্তি ইতঃপূর্বেই এই অমানুষিক নির্মমতাকে ঘৃণার চক্ষে দেখে আসতেছিল। হাশিম ও মুত্তালিব বংশের আত্মীয় স্বজনদের মধ্যেও অনেকেই তাঁদের দুর্দশা দেখে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল।'
আমির ইবন লুয়াই গোত্রের হিমাশ ইবন 'আমর কিছু দিন যাবতই গম, যব প্রভৃতি খাদ্যশস্য উটের পিঠে বোঝাই দিয়ে রাত্রিকালে চুপে চুপে গিরি সঙ্কটে পৌঁছায়ে দিয়ে আসতেছিল। এজন্যই মরণাপন্ন ক্ষুধার্তগণ নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিলেন। হিশাম মনে মনে ভাবতে লাগল, এভাবে গোপনে গোপনে আর কত দিন সাহায্য করা চলবে? ধরা পড়লে সমাজের নিকট কৈফিয়তই বা কি দিব? এই কুখ্যাত বয়কটকে সমূলে ব্যর্থ করতে না পারলে আর নিস্তার নেই।
একদা হিশাম খাজা আবু তালিবের ভাগিনেয় যুহায়র ইবন আবূ উমায়্যা মুখযুমীর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, যুহায়র, তুমি মজায় মজায় পেট পুরে খাও, আর তোমার মামা ও তাঁর বংশধরগণ ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করে মরচ্ছেন, এটা কি তোমার নিকট খুব ভাল লাগে? হিশাম ব্যথিত স্বরে উত্তর করল, "আমি একা কি করতে পারি? যদি একজন সমর্থক ও পেতাম তবে এই অলক্ষ্মী প্রতিজ্ঞাপত্রটি ফেরে চিরে চুলায় দিতাম। হিশাম বলল-"বেশ ত আমি আছি।"
অবশেষে তাঁরা দুই জনে পরামর্শ করে মুত'ইম ইবন 'আদী, আবুল বুখতরী ইব্ন হিশাত এবং যাম'আ ইবন আল-আসওয়াদের নিকটে গমণ করে অনেক আলাপ-আলোচনার পর তাঁদেরকে নিজেদের মতে আনল। পরদিন প্রাতে তাঁরা সকলেই কা'বা গৃহে গেল। সেখানে কুরায়শ-সদারগণ সকলেই একসবায় সমবেত ছিল। তাঁরা ও একে একে উক্ত সভায় যোগদান করল।
যুহায়র সভাস্থ সকলকে সম্বোধন করে বলল, "হে মক্কাবাসিগণ, আমরা সকলে পানাহারে পরিতৃপ্ত হয়ে আনন্দোল্লাসে জীবন যাপন করব, আর বনু হাশিম ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করে প্রাণ দিবে এটা কেমন বিচার? এই বর্বর প্রতিজ্ঞাপত্রটি ছিন্ন না করে আমি আর ক্ষান্ত হব না।
পাষও আবু জাহল ক্রোধে লাল হয়ে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল, কখনও না, এটা হতে পারে না। মিথ্যাবাদী, তুমি প্রতিজ্ঞাপত্র ছিন্ন করবে, তোমার সাহস কত? আবু জাহল মনে করেছিল যে, কেউ যুহায়রের সমর্থন করবে না। কিন্তু ফলে তার এই ধারণা ঠিক হল না। সভার অপর প্রান্ত হতে ঘুম'আ বলে উঠল-"আবু জাহল, সে নয়, প্রকৃতপক্ষে তুমিই মিথ্যাবাদী। যুহায়র সত্য কথাই বলেছে। এটা লেখার সময়ও ত আমাদের মত ছিল না। মানুষে কি এমন কলঙ্কময় প্রতিজ্ঞা করে? সভার অন্য প্রান্ত হতে আবূ বুখতরী দাঁড়ায়ে উঠে বলল, "তারা সত্য কথাই বলছে, আমরা এই বর্বর প্রতিজ্ঞায় কখন সম্মত হই নি। এখনও তা মানতে আমরা বাধ্য নই।" মুত'ইম বলল-"বাস্তবিক এমন অন্যায় প্রতিজ্ঞাপত্রে আমরা কখনই রাজী হতে পারি না, আর পারবও না।" সর্বশেষে হিশাম বলল, এখনই এটা ফেরে ফেলা উচিত। ঠিক এই সময় এক আশ্চর্য কাও ঘটল। খাজা আবু তালিব হিরিসঙ্কট হতে বের হয়ে হঠাৎ সেই সভায় উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলেন, আমার ভাতিজা মুহাম্মদ (সাঃ) বলছেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জানায়ে দিয়েছে যে, তোমাদের প্রতিজ্ঞাপত্রখানি কীটে কেটে নষ্ট করে ফেলেছে। শুধু আল্লাহ তা'আলার নামটি ব্যতীত আর যা কিছু তোমরা লিখেছিলে তা সবই কীটদের উদরস্থ হয়েছে। একথা যদি সত্য না হয় তবে আমি এখনই মুহাম্মদ (সাঃ) কে তোমাদের হাতে সমর্পণ করব। অন্যথায় এই অত্যাচার হতে বিরত থাকা উচিত।
মুড় ইম তৎক্ষনাৎ প্রতিজ্ঞাপত্রটি নামায়ে এনে দেখতে পেলেন যে, আল্লাহ তা'আলার নাম লিখিত ছিল তা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পূর্ণ কাগজই কীটে খেয়ে ধ্বংস করে ফেলেছে।
যুহায়র ও তার সাথিগণ তৎক্ষণাৎ উলঙ্গ তরবারি হাতে নিয়ে গিরিসঙ্কটে গেলেন এবং অন্তরিত নিপীড়িতদেরকে তথা হতে বের করে তাঁদের স্ব স্ব বাড়ী ঘরে পৌঁছে দিলেন।
মুফাস্স্সিরকুল শিরোমণি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস এই গিরিসঙ্কটেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন।
কোন কোন রিওয়ায়তে বর্ণিত হয়েছে যে, এই প্রতিজ্ঞাপত্রের লেখক মনসুর বিন 'ইকরামার হাতটি অবশ হয়ে অকেজো হয়ে গিয়েছিল।
নবুওয়তের দশম বৎসর
নবুওয়তের দশম সনের প্রারম্ভে তিন বৎসর পর গিরিসঙ্কট হতে মুসলমানগণ বের হয়ে আসলেন, রাসূল (সাঃ)-এর সাথে তাঁর যে সমস্ত বংশধর গিরিসঙ্কটে আবদ্ধ ছিলেন, তাঁরা সকলে মুসলমান ছিলেন না। তখনও তাঁরা নিজেদের পুরুষানুক্রমিক ধর্মের মোহ কাটাতে পারেন নি। হুবল ঠাকুর এবং অন্যান্য দেবতাদের ক্রোধভয়ে তখনও তাঁরা বিচলিত হয়ে উঠতেন। কিন্তু শৈশব হতে রাসূল (সাঃ)-এর ন্যায়নিষ্ঠতা, সত্যপ্রিয়তা এবং অপকটতা দেখে তাঁরা তাঁর প্রতি মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। এজন্যই তাঁরা রাসূল (সাঃ)-এর পক্ষে সমর্থন করে অম্লান বদনে সমস্ত কষ্ট, সমস্ত নির্যাতন বরণ করে নিয়েছিলেন।
যারা বাইরে কোন্দলে-কোলাহল ও হিংসা-বিদ্বেষ বিরহিত হয়ে আল্লাহ তা'আলার রাসূলের খিদমতে নিরিবিলিভাবে দীর্ঘ বৎসর অবস্থান করার সুযোগ পেয়েছিলেন, বাস্তবিক তাঁরা অত্যন্ত সৌভাগ্যশালী। তাঁরা রাসূল (সাঃ)-এর জ্ঞানের গভীরতা, চরিত্রের মধুরতা এবং শিক্ষার সৌন্দর্য মর্মে মর্মে অনুভব করতে পেরেছিলেন। এজন্য পানীয় এবং আহার্যের অভাবে প্রাণ দেওয়াও তাঁদের জন্য সহজ হয়ে উঠেছিল; কিন্তু রাসূল সঙ্গ ত্যাগ করা তাঁদের জন্য একেবারেই সম্ভব ছিল না। মি'রাজ : রাসূল (সাঃ)-এর প্রসিদ্ধ অলৌকিক ঘটনা মি'রাজ অন্তরীণ হতে মুক্তি পাওয়ার পর, এই ১০ম সনেই সংঘটিত হয়েছিল এবং এই সময়ই মুসলমানদের প্রতি পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়।
আবু তালিবের মৃত্যু গিরিসঙ্কটের কারাগার হতে মুক্তি লাভের পর রাসূল (সাঃ) কয়েকদিন বেশ শান্তিতেই কাটালেন। নিজেদের সর্ববিধ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে দেখে কুরায়শগণ সাময়িকভাবে কতকটা বিমর্ষ ও অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তীব্র অভিমান ও উৎকট বিদ্বেষের দরুন তারা সত্যকেও বরণ করে নিতে পারল না।
কুরায়শগণ পূর্বেই বুঝতে পেরেছিল যে, কোন প্রকার অত্যাচার দ্বারাই মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-কে পরাস্ত করা বা ইসলামের অগ্রগতিকে বাঁধা দেয়া সম্ভবপর হবে না। এই বার তারা এটাও বুঝতে পারল যে, আবূ তালিব এবং তাঁর বংশধরগণ কোন ক্রমেই মুহাম্মদ (সাঃ)-কে তাদের হাতে সমর্পণ করবেন না। মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-কে হত্যা করে নিজেদের ধর্ম ও মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া উপায়ান্তর নেই। সর্বপ্রকার উৎপাত বন্ধ করে দিয়ে তারা এসব চিন্তায়ই ব্যাপৃত ছিল।
কুরায়শগণ ভাবতে লাগল, খাদীজার ন্যায় বুদ্ধিমতী ও ধনাঢ্য রমণীর সহায়তা এবং খাজা আবু তালিবের পক্ষ সমর্থন না থাকলে, আমরা হয়ত কবেই মুহাম্মদ (সাঃ) কে মৃত্যুর ঘাটে পৌছায়ে দিতাম, তৎসঙ্গে তাঁর ধর্মেরও রফা হয়ে যেত। আমাদের পাঠক পাঠিকাদের মনেও হয়ত এরূপ ধারণা এসে থাকতে পারে। বস্তুত এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কুরআনের প্রথমাবতীর্ণ আয়াতে উচ্চারণ শব্দের ব্যাখ্যাতে বর্ণিত হয়েছে যে, মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-কে এবং তাঁর নবুওয়ত ও ধর্মকে রক্ষা করার এবং তাঁকে নুবওয়তের মর্যাদার চরম সোপানে পৌঁছে দেয়ার ভার স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলা গ্রহণ করেছেন। সুতরাং তাঁর কৃতকার্যতা কোন মানুষকে বা কোন কারণ উপকরণের মুখাপেক্ষী নয়।
কুরায়শদের ধারণা যে সম্পূর্ণ ভুল, তা বুঝিয়ে দেওয়ার সময় নিকবর্তী হয়ে আসছে। তাই আবূ তালিব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রাসূল (সাঃ) মনে মনে আশঙ্কা করতে লাগলেনঃ না জানি, পার্থিক জীবনের এই মুল্যবান অবলম্বনটুকু এবার হারায়ে বসি।
কাফিরগণ ভাবল, "মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে বাড়াবাড়ি করে কোন দিনই আমাদের কোন সুফল হয় নি। অন্তিমকালে আবু তালিবের দ্বারা একটা মীমাংসা করায়ে নিতে পারলেই ভাল হয়। সুতরাং 'উতবা শায়বা, উমাইয়া, আবু জাহল, আবূ সুফইয়ান প্রমুখ সরদারগণ আবু তালিবের খিদমতে হাজির হয়ে বলল- জনাব আপনি এখন অন্তিম অবস্থায় উপস্থি হয়েছেন। আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে দীর্ঘকাল হতে আপনার মনোমালিন্য চলে আসছে তা ও আপনি অবগত আছেন। এখন আপনি তার একটি মীমাংসা করে দিয়ে যান। আমরা আপনার ভ্রাতুপুত্রের সঙ্গে কোন প্রকার অত্যাচার না করার প্রতিশ্রুতি দিব। তিনি আপনার সম্মুখে আমাদেরকে এই প্রতিশ্রুতি যেন দেন যে, তিনি আমাদের এবং আমাদের ধর্মের নিন্দা করবেন না।
আবু তালিব এ বিষয়ে রাসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন- "কুরায়শগণ শুধু একটি কথা মেনে নিলেই তাদের সাথে আমার কোন ঝগড়া থাকে না।" আবু জাহল বলল, "একটি কেন আমরা আপনার দশটি কথা মেনে নিতে প্রস্তুত আছি।" রাসূল (সাঃ) বললেন- আচ্ছা, বেশ তোমরা স্বীকার কর-আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কেউ 'ইবাদতের যোগ্য নেই। এবং স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্যের 'ইবাদত পরিত্যাগ কর।
তাঁর উত্তর শুনে সরদারগণ পরস্পর বলাবলি করতে লাগল যে, তিনি তোমাদের কথায় আসবেন না। তৎপর তারা নিরাশ মনে ফিরে গেল।
যখন আবু তালিবের মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হয়ে আসল তখন তাঁকে দেখার জন্য আবু জাহল 'আবদুল্লাহ বিন উবায়, উমাইয়া প্রমুখ সরদারগণ তাঁর নিকটে সমবেত হল।। রাসূল (সাঃ) ও তাঁর নিকটে তশরীফ আনলেন। তিনি বললেন, "চাচা জান, মৃত্যুকালে একবার লাইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করুন। আমি আল্লাহ তা'আলার দরবারে আপনার ঈমান আনয়নের সাক্ষা দিব।" আবূ জাহল ও 'আবদুল্লাহ বিন উবায় বলল, "আপনি কি আপনার পিতা 'আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম পরিত্যাগ করে ভ্রাতুষ্পুত্রের ধর্ম গ্রহণ করবেন।" আবু তালিব বললেন,." আমি 'আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপর থেকেই মৃত্যু বরণ করতেছি।" তৎপর তিনি রাসূল (সাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললেন, "ভ্রাতুষ্পুত্র, আমি 'কালিমা তায়্যিবা' পাঠ করতাম; কিন্তু এরূপ করলে কুরায়শগণ বলবে যে, আবু তালিব মৃত্যুর ভয়ে 'কালিমা তায়্যিবা; পড়ছে। (এটা আমার জন্য অপমানে বিষয়)" তখন রাসূল (সাঃ) বললেন-"যে পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা আমাকে নিষেধ না করবেন সে পর্যন্ত আমি আপনার মাগফিরাতের (ক্ষমা প্রাপ্ত হওয়ার) জন্য দুআ করতে থাকব। মুসলমান হওয়া আবু তালিবের অদৃষ্টে ঘটল না। ইসলাম গ্রহণ করলে জনগণ তাঁকে নিন্দা করবে, এই ভয়ে তিনি কুফরের অবস্থায়ই পরলোক গমণ করলেন। আবু তালিব রাসূল (সাঃ) অপেক্ষা পয়ত্রিশ বৎসরের বড় ছিলেন। পঁচাশি বৎসর বয়সে তাঁর মৃত্যু হল।
একদিন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রাঃ) রাসূল (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহ্ তা'আলার রাসূল, আপনার চাচা (আবু তালিব) আপনার রক্ষণাবেক্ষণ করতেন, আপনার জন্য আপনার শত্রুদের সঙ্গে প্রকাশ্য সংগ্রাম করতেন; আপনার দ্বারা তাঁর কি উপকার হল?"
রাসূল (সাঃ) বললেন, "দোযখের আগুন তাঁর হাটু পর্যন্ত থাকবে। কিন্তু তার (দাহনের) প্রতিক্রিয়া তাঁর মস্তক পর্যন্ত পৌঁছবে (মাথার মগজ উথলিতে থাকবে।) যদি না আমি থাকতাম তবে তিনি দোযখের সর্বনিম্নস্তরে স্থানপ্রাপ্ত হতেন।
এই রিওয়ায়ত হতে সম্পূর্ণরূপে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, ঈমানের উপর আবূ তালিবের মৃত্যু হয় নি। হযরত আবু সা'ঈদ খুদরী (রাঃ) হতেও অনুরূপ একটি রিওয়ায়ত বর্ণিত আছে।
আবু তালিব যদিও ঈমান আনতে পারেন নি, তথাপি তিনি রাসূল (সাঃ)-কে যে মমতা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করে গেছেন এবং সর্বদা রাসূল (সাঃ)-এর সহায় হয়ে কুরায়শদের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যেভাবে উদারতা ও মহত্ত্বের পরিচয় দিয়ে গেছেন। তজ্জন্য বাস্তবিকই তিনি ধন্যবাদার্হ। তাতে রাসূল (সাঃ)-এর চরিত্রের নিশ্চুপুষতা এবং উদ্দেশ্যের সততাও ফুটে বের হচ্ছে।
রাসূল (সাঃ)-এর কার্যকলাপে যদি কপটতা বা অন্য কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ থাকত, তবে আবু তালিব তাঁর প্রতি এত অনুরক্ত থাকতে পারতেন না।
আবু তালিব যে একজন ধৈর্য্যশীল বিচক্ষণ লোক ছিলেন, এতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই কিন্তু সমাজ-ভীতিকে উপেক্ষা করার মত সৎসাহসের অভাবেই তিনি সফলতা লাভ করতে পারেন নি। একমাত্র এটাই ছিল তাঁর চরিত্রের দুর্বলতা। যদিও হযরতের পরগয়ম্বর জীবনের সফলতা কারও সাহায্যের মুখাপেক্ষী ছিল না। তথাপি এ-বিষয়ে আবূ তালিবের দান তুচ্ছ নয়। এত করেও তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে পারলেন না। সত্যই মানুষ সর্বতোভাবে অক্ষম, আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ব্যতিরেকে সে কিছুই করতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
"(হে রাসূল,) আপনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকেই হিদায়ত করতে পারবেন না; বরং আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা করেন তাকেই হিদায়ত করেন।"
আবূ তালিবের অবস্থা চিন্তা করলে মনে হয়, তিনি যেন প্রদীপের নিম্নস্থ অন্ধকারে লুকায়ে থেকে প্রদীপে তৈল ঢেলে তার দীপ্তিকে অধিকতর উজ্জ্বল করে দিলেন; অথচ তিনি নিজে চির অন্ধকারেই নিমজ্জিত হয়ে রইলেন।
চিরদিনের অকৃত্তিম সহায় চাচাকে হারিয়ে রাসূল (সাঃ) যারপর নাই ব্যথিত হলেন। ছায়াদাতা বৃক্ষ যেন তাঁর মাথার উপর হতে সরে পড়ল।
হযরত খাদীজার পরলোকগমন
বিপদ বুঝি একা আসে না। চাচার শোক ভুলতে না ভুলতেই তাঁর পত্নী হযরত খাদীজা (রাঃ) ও পীড়িত হয়ে পড়লেন। হযরত ভাবতে লাগলেন আমার সুখ-দুঃখের সাথী সহধর্মিনী ও বুঝি এবার আমাকে ছেড়ে যাচ্ছেন।
হলও তাই। আবূ তালিবের মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন পরেই হযরত খাদীজাও চির নিদ্রায় নিদ্রিত হলেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন)
আহত হৃদয়ে আবার নূতন আঘাত। এই ব্যথা যে কত উৎকট, কত ভীষণ তা কে বলবে? অতীত জীবনের দীর্ঘ পঁচিশ বৎসরের দাম্পত্য জীবনের সমস্ত স্মৃতি আজ মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর মানসপটে ভেসে উঠল। এই পুণ্যবতী মহিলা যে রাসুল-হৃদয়ে কত বড় স্থান অধিকার করেছিলেন তাঁর দান যে কত অপরিসীম আজ তিনি তা মর্মে মর্মে অনুভব করতে লাগলেন। যখন সংসার ক্ষেত্রে আত্মপ্রতিষ্ঠার উপায় পেতেছিলেন না, তখন এই মহীয়সী মহিলাই তাঁকে স্বেচ্ছায় স্বামীরূপে গ্রহণ করে নিজের ধন-প্রাণ সর্বস্ব তাঁর চরণতলে লুটে দিয়ে অনুপম নারী ভক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন।
তিনি যখন 'হেরা' গুহায় ধ্যান মগ্ন থাকতেন, তখন এই মহীয়সী পত্নীই তাঁর পূর্ণ তত্ত্বাবধান করতেন। প্রথম ওহীর গুরুভারে যখন তিনি ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছিলেন, তখন এই খাদীজাই তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এবং নবী বলে চিনতে পেরে সবার আগে তিনিই তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করেছিলেন। চতুর্দিক যখন নিরাশার ঘন অন্ধকারে আবৃত, অবিশ্বাস, ব্যঙ্ক-বিদ্রূপ, লাঞ্ছনা উৎপীড়নের বিষাক্ত বায়ু যখন মক্কার আকাশ-বাতাস আচ্ছন্ন হয়ে উঠছিল, তখনই এই সাধ্বী রমণীই তাঁর পার্শ্বে দাঁড়িয়ে তাঁকে সান্ত্বনা ও উৎসাহ প্রদান করতেন। এই বুদ্ধিমতী পবিত্র মহিলার প্রবোধ বাক্যে সমস্ত দুঃখ-কষ্ট ভুলে রাসূল (সাঃ) প্রতিদিন নব চেতনা লাভ করে আবার দ্বিগুণ উৎসাহে সত্য প্রচারে ঝাপিয়ে পড়তেন। এহেন সহধর্মীনীর বিচ্ছেদে হযরতের অন্তরে যে কি দারুন শোকের উদ্ভব হয়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়।
আবু তালিব এবং হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর মৃত্যুতে রাসূল (সাঃ) শোক সাগরে ভাসতে লাগলেন। এজন্য রাসূল (সাঃ) এই বৎসরটিকে শোক-বর্ষ বলে অভিহিত করেছেন। আবার অত্যাচার আরম্ভ হল আবূ তালিব ও হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর কুরায়শদের ঘাড়ে আবার ভুত চেপে বসল। তারা মনে করল, এখন অত্যাচারের পথ পরিষ্কার; যত ইচ্ছা, অত্যাচার কর, সারা জীবনের সাদ মিটিয়ে লও। হাদীস, তফসীরের ৮০ কিতাবসমূহের এইসব আত্যাচারের কথা পাঠ করলে, একদিকে কুরায়শদের নৃশংসতা দেখে যেমন শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে, অপর দিকে তেমনই রাসূল (সাঃ)-এর অসাধারণ ধৈর্য ও অটল সংকল্প দর্শনে অবাক হয়ে থাকতে হয়।
রাত্রিকালে তাঁর ঘরের দরজায় এবং মসজিদে যাওয়ার পথে তারা কাঁটা বিছিয়ে রাখত, তাঁর বাড়ীতে অপবিত্র ও দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু নিক্ষেপ করত নামাযের সময় উটের নাড়ীভুঁড়ি এবং সদ্য প্রসূতা ছাগীর 'ফুল' প্রকৃতি আবর্জনা ও গুরুভার বস্তু তাঁর উপর নিক্ষেপ করত। এসব ঘটনা বহুবার সংঘটিত হয়েছে। তিনি রাস্তায় বের হলে দুরাচারগণ তাঁর পিছনে পিছনে হৈ হৈ করে ঘুরে বেড়াত। নানা প্রকার ব্যঙ্গবিদ্রূপ করত; ঢিলা এবং ধুলাবালি নিক্ষেপ করত।
একদা রাসূল (সাঃ) রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক দুর্বৃত্ত এসে আবর্জনাপূর্ণ কতগুলো ধুলা মাটি তার মাথার উপর ফেলে দিল। এই অবস্থায়ই তিনি বাড়ী পৌছলেন। তাঁর প্রিয়তমা কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ) পানি নিয়ে এসে তাঁর মাথা ধুতে লাগলেন এবং আব্বাজানের এই লাঞ্ছনা ও দুর্গতি দেখে কাঁদতে কাঁদতে আকুল হয়ে পড়লেন। তখন তিনি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতে লাগলেন, কাঁদও না মা, ধৈর্য ধর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তোমার আব্বাজানকে জয়যুক্ত করবেন।
প্রতিদিন এইরূপ লাঞ্ছনা ও নিগ্রহ চলতে লাগল। ক্রমে ক্রমে অবস্থা এইরূপ জটিল হয়ে দাঁড়াল যে, মক্কায় অবস্থান করা তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ল। তা'য়িফ গমন আপাতত মক্কায় ইসলাম প্রচার করা একেবারেই নিষ্ফল বলে তিনি মনে করতে লাগলেন। অতএব মক্কার বাইরে তবলীগী কাজ পরিচালনার মনস্থ করলেন। যায়দ ইবন হারিসাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নবুওয়তের দশম বছরের শাওয়া মাসে (৬১৯ খৃষ্টাব্দের মে মাসের শেষ দিকে অথবা জুন মাসের শুরুতে) 'তা'য়িফ' অভিমুখে যাত্রা করলেন। 'তা'য়িফ' মক্কা হতে প্রায় ষাট মাইল দূরে একটি সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা দেশ। বনু সকীফই এই দেশের সম্ভ্রান্ত বংশ। এই বংশে ধন-সম্পদে ও মান-মর্যাদায় আমর বিন 'উমায়র আস্সাকাফীর পুত্র আবদে য়্যালীল, মাস'উদ এবং হাবীবই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। সুতাং রাসূল (সাঃ) দুর্গম গিরি-কাস্তার পদব্রজে অতিক্রম করে সর্বপ্রথম এই সরদারত্রয়ের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। কুরায়শদের একটি মেয়েও এই বাড়ীতে বিবাহিতা হয়েছিল।
রাসূল (সাঃ) তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদেরকে সত্য ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানালেন। তারা সমস্ত বিষয় অবগত হয়ে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে অত্যন্ত অসদ্ব্যবহার আরম্ভ করল। তাদের একজন বলল-"যদি আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে নবীরূপে প্রেরণ করে থাকেন তবে তিনি কা'বা গৃহের গেলাফ ছিন্ন করতে বসেছেন।" দ্বিতীয় ভ্রাতা বলে উঠল-"আল্লাহ্ বুঝি খুঁজে আর লোক পেলেন না। আপনাকেই পয়গম্বর বানালেন। পয়গম্বর কি কখনও পায়ে হেটে আসে? পয়গম্বর যদি বানাতেই হত তবে কোন সরদার বা কোন বড় লোককে বানালেন না কেন?" তৃতীয় সরদার ব্যঙ্গস্বরে বলল-"আমি আপনার সাথে কোন কথা বলতে চাই না। সত্যই যদি আপনি পয়গম্বর হয়ে থাকেন, তবে আপনার সাথে আলাপ করা বেআদবী হবে; অন্যথায় এমন ভন্ড মিথ্যাবাদীর সাথে কথা বলা অসঙ্গত।"
তা'য়িফবাসীর অত্যাচার
বন্ সকীফের নেতৃবৃন্দকে নিজেদের অভিমত প্রকাশ করে সত্য প্রচরের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য রাসূল (সাঃ) তাদেরকে অনুরোধ জানালেন এবং তথা হতে তিনি বের হয়ে পড়লেন। পথে পথে ঘরে ঘরে তিনি আল্লাহর বাণী, তওহীদের মহিমা প্রচার করতে লাগলেন। কিন্তু সরদারগণ নিরপেক্ষ হয়ে বসে থাকতে পারল না। তারা ছেলে-পিলে, গুণ্ডা বদমাশ, অজ্ঞ-গোলাম ও দুষ্ট লোকদেরকে হযরতের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিল। দুষ্টেরা সমবেত হয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও গালাগালি করতে করতে রাসূল (সাঃ)-এর পিছনে পিছনে ছুটল। রাসূল (সাঃ)-এর দুই ধারে সারি বেঁধে তারা তাঁর পিছনে পিছনে চলতে থাকে, আর ইট-পাটকেল মারতে থাকে। প্রত্যেক পদক্ষেপে হযরতের পবিত্র চরণযুগলের উপর দুই দিক হতে বৃষ্টির ন্যায় পাথর বর্ষিত হতে লাগল। পবিত্র চরণযুগল হতে দরদর করে রক্ত ধারা প্রবাহিত হতে আরম্ভ করল। শয়তানদের হাতের তালি, হৈ হৈ, রৈ, বৈ, বিকট হাঁসি অট্টলিলাতে সারা পথ মুখরিত হয়ে উঠল।
হযরত যায়দ (রাঃ) আত্মবিস্তৃত হয়ে প্রাণপণে হযরতকে রক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু শত শত শয়তানের বিরুদ্ধে এক যায়দ (রাঃ) কিইবা করবেন? যায়দও ভীষণভাবে আহত হয়ে পড়লেন। হযরত ক্রমশ অবসন্ন ও বিহ্বল হয়ে পড়তে লাগলেন। তিনি যখন অবসন্ন হয়ে বসে পড়তেন তখন দুর্বৃত্তগণ দুই বাহু ধরে তাঁকে উঠিয়ে দিত। আবার যখন চলতে আরম্ব করতেন, তখন তারা আবার প্রস্তর নিক্ষেপ করা আরম্ভ করত। রক্তধারা গড়িয়ে পড়ে পাদুকা মুবারক পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে যায়দ কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে পড়লেন। হায়। যে চরণ বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ চরণ, আজ সেই পবিত্র চরণ মুবারক আল্লাহর শত্রুদের হাতে এভাবে আহত।
