বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনী। আদ্দাসের ইসলাম গ্রহণ

শেষ পর্যন্ত তাঁরা 'তায়িফ' হতে তিন মাইল দূরে অবস্থিত পথের পার্শ্বে একটা আঙ্গুরের বাগানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন। এই বাগানের মালিক ছিল 'বরী'আর' পুত্র 'উৎবা ও শায়বা। তাঁরা কাফির হওয়া সত্ত্বেও বড় উদার স্বভাবের লোক ছিলেন। রাসূল (সাঃ) কে এরূপ বিপদগ্রস্ত দেখে তাঁদের ক্রীতদাস 'আদ্দাসকে নির্দেশ দিলেন, "তাদেরকে একটি রেকাবী ভরে আঙ্গুর দাও।" আদ্দাস স্বীয় প্রভুর নির্দেশানুযায়ী আঙ্গুর ভরা রেকাবী রাসূল (সাঃ)-এর সম্মুখে রেখে দিল। রাসুল (সাঃ) আঙ্গুর হাতে নিয়ে 'বিস্মিল্লাহ' বলে খেতে আরম্ভ করলেন।

'আদ্দাস আশ্চর্যন্বিত হয়ে বলল-"হুযুর, খাওয়ার সময় আপনি যা পড়লেন এ দেশের লোকেরা তা তা পড়ে না।"

রাসূল (সাঃ) বললেন-"তুমি কোন দেশের লোক, আর তোমার ধর্ম কি?"

'আদ্দাস বলল-"আমি খৃষ্টান, 'নিনুয়া' দেশে আমার বাড়ী।"

রাসূল (সাঃ) বললেন-"তুমি বুঝি হযরত ইউনুস পয়গম্বর (আঃ)-এর দেশের লোক?"

'আদ্দাস বলল-"তা আপনি কিরূপে জানলেন?"

রাসূল (সাঃ) বললেন-"তিনিও পয়গম্বর ছিলেন, আমিও পয়গম্বর, সুতরাং আমরা ভাই ভাই।"

একথা শুনামাত্র 'আদ্দাস রাসূল (সাঃ)-এর হস্তপদ চুম্বন করতে আরম্ব করল এবং স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করলেন।

'আদ্দাসের প্রভু 'উৎবা তাঁকে জিজ্ঞেস করল- "তুই এমন করলি কেন?"

'আদ্দাস' বললেন-"আপনি জানেন না, এই সময় ধরাপৃষ্ঠে ইনিই শ্রেষ্ঠতম মানব। তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রেরিত পয়গম্বর (সাঃ)।"

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনী। আদ্দাসের ইসলাম গ্রহণ
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনী। আদ্দাসের ইসলাম গ্রহণ

"ইট-পাটকেল ও পাথরের আঘাতে আহত হয়ে রাসূল (সাঃ) অত্যন্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তিনি তা'য়িফবাসী যালিমদের হাতে যেভাবে অত্যাচারিত হয়েছিলেন, এরূপ কঠোর অগ্নি পরীক্ষায় জীবনে আর কখনও পতিত হন নি। হযরত 'আয়িশা (রাঃ) বললেন-"একদা আমি হযরতকে জিজ্ঞেস করলাম, ওহুদযুদ্ধ অপেক্ষা কঠোরতম বিপদ আপনার জীবনে কি আর কখনও উপস্থিত হয়েছিল?" তখন তিনি তা'য়িফবাসীদের অত্যাচারের উল্লেখ করে বললেন-"এটাই ছিল আমার জীবনের ভীষর্ণতম বিপদ।"

 মযলুম রাসূলের করুণ প্রার্থনা 

'উত্তা ও শায়বার এই দ্রাক্ষা কাননেই তিনি অবসন্ন দেহে ব্যথিত হৃদয়ে করুণ সুরে দুই হাত উঠিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছিলেন, পাঠক হয়ত মনে মনে ভাবতেছেন যে, তিনি হয়ত তাদের অত্যাচারে অধৈর্য হয়ে তাদের ধ্বংস কামনা করেই এই প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু তা নয়; বরং তাঁর এই প্রার্থনা ছিল তাঁর আবেগপূর্ণ আত্মনিবেদন এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমপূর্ণ। এই প্রার্থনার অবিকল বঙ্গানুবাদ নিম্নে দেওয়া হল-

"হে আল্লাহ। আমি নিজের দুর্বলতা উপায়হীনতা এবং লোকচক্ষে নিজের অকিঞ্চিৎকরতা সম্বন্ধে তোমারই দরবারে ফরিয়াদ করছি। হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াময় তুমিই অবসাদগ্রস্ত, অক্ষম ও দুর্বলের মালিক, আমার মালিকও তুমিই; তোমা ব্যতীত আমার ত আর কেউ নেই। তুমি আমাকে কার হাতে সমর্পণ করছ? যারা রুক্ষ, কর্কশ ভাষায় আমাকে জর্জরিত করবে, তাদের হাতে? না, যারা আমার সাধনাকে বিপর্যস্ত করার ক্ষমতা রাখে, তাদের হাতে। যদি আমার প্রতি তোমার ক্রোধ পতিত না হয় অর্থাৎ তুমি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়ে থাক তবে আমি (এই সকল বিপদ-আপদ) কোন কিছুরই পরওয়া করি না। তোমার মঙ্গল আশীর্বাদই আমার জন্য সবচাইতে প্রশস্ততম সম্বল। তোমার যে পুণ্য জ্যোতির প্রভাবে সকল অন্ধকারই আলোকিত হয়ে উঠে এবং দীন-দুনিয়ার সমস্ত কাজই সুবিন্যস্ত হয়-আমি সেই পুণ্য জ্যোতির আশ্রয় গ্রহণ করে, আমার প্রতি তোমার ক্রোধ অবভীর্ণ না হওয়ার এবং তোমার অসন্তুষ্টি পতিত না হওয়ার প্রার্থনা জানাতেছি, তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্যই তোমার দরবারে আর্তনাদ করতেছি। (হে প্রভু) তুমি শক্তি দান না করলে সৎ কাজ করার এবং পাপ কাজ হতে বেঁচে থাকার ক্ষমতা আমার নেই।"

কি আবেগভরা আত্মনিবেদন। আল্লাহর প্রতি কি গভীর নির্ভর। সত্যের প্রতি কি উদ্বেগহীন নিষ্ঠা। মহাপুরুষগণ বুঝি এমনই হয়ে থাকেন।

প্রার্থনার পর আল্লাহ তা'আলা মালাকুলজিবাল (পাহাড়ের অধিকর্তা ফেরেশতা)-কে তাঁর খিদমতে পাঠিয়ে দিলেন। ফেরেশতা এসে বললেন, "আপনার অনুমতি পেলে (এ দেশের দুই পার্শ্বে) "আশবায়ন' নামক যে দুটি পাহাড় আছে, সেই পাহাড় দুটিকে পরস্পর সম্পৃষ্ট করে কাফিরদেরকে নিষ্পেষিত করে দেই। তিনি বললেন-"না, না, তারা বেঁচে থাকুক। হয়ত তাদের ঔরষ হতে এমন সৎ ও মহৎ লোক জন্মগ্রহন করতে পারে, যারা সত্য ধর্ম গ্রহণ করবে এবং আল্লাহর 'ইবাদত করবে।"

মূর্ত রহমত আল্লাহর প্রেরিত পয়গম্বর মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর দরবারে যে প্রার্থনা করলেন এবং আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতাকে যে উত্তর দিলেন, তা হতেই তাঁর মহত্ত্ব, ধৈর্য, উদারতা, আন্তরিকতা আল্লাহর প্রতি নির্ভলশীলতার পূর্ণতম ও পূণ্যতম আদর্শ পরিস্ফুট হতেছে। যারা ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু, চিরদিন যাদের হৃদয় নানা প্রকার দুরভিসন্ধির কলঙ্কে কলঙ্কিত হয়ে আছে, এসম্বন্ধে তারা একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলতে বাধ্য হয়েছে-

"It sheds a strong light on the intensity of his belief in the divine origin of his calling" "এই প্রার্থনা আল্লাহর আহ্বানের উপর তাঁর বিশ্বাসের পূর্ণ গভীরতার প্রতি সুস্পষ্ট আন্তরিকতা জ্ঞাপন করে।"

 মহানবী সাঃ এর মক্কায় প্রত্যাবর্তন 

তৎপর রাসূল (সাঃ) পুনরায় পদব্রজে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন। পথে 'নখলা' নামক স্থানে আগমন করে কিছু দিনের জন্য সেখানে বিশ্রাম করতে লাগলেন। নখলায় অবস্থানকালে একদা রাতের বেলায় তিনি নামায পড়তেছিলেন। এমন সময় 'নসীবায়ন' নামক স্থানের সাতজন মতান্তরে নয় জন জিন তাঁর খিদমতে হাযির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। পবিত্র কুর'আন মজীদের সূরা আহকাপের শেষ রুকু'তে এবং সূরা জিনে এর বর্ণনা আছে।

অতঃপর না হতে 'হিরা'য় তশরীফ আনলেন। শান্তির রক্ষার কোন একটি প্রতিবিধান না করে এই সময় মক্কায় প্রবেশ করা তিনি সমীচীন মনে করলেন না। আরবের চিরাচরিত প্রথা ছিল যে, যদি কোন শত্রুও কারও নিকট আশয় প্রার্থনা করত তবে সে তাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হত। অন্যথায় সমাজে সে হৃদয়হীন সঙ্কীর্ণমনা বলে তিরস্কৃত হত। মুত্ইম বিন 'আদী ছিলেন অত্যন্ত উদারচেতা মহান ব্যক্তি। সুতরাং রাসূল (সাঃ) বাহক মারফত মুত 'ইমকে জানালেন যে, আপনি নিজ দায়িত্বে শান্তি রক্ষার ভার গ্রহণ করে আমাকে মক্কায় প্রবেশের সুযোগ করে দিতে পারেন কি?

মুত'ইম প্রশান্ত হৃদয়ে এই কথার প্রতি সম্মতি দান করলেন। তৎপর তিনি স্বীয় পুত্রদেরকে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে কা'বা প্রাঙ্গনে যেতে নির্দেশ দিলেন এবং স্বয়ং উষ্ট্রপৃষ্ঠে আরোহন করে রাসূল (সাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে কা'বা প্রাঙ্গনে উপস্থিত হলেন। তথায় যেয়ে সমবেত কুরায়শদেরকে সম্বোধন করে উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, আমি মুহাম্মদ (সাঃ)-কে আশ্রয় দান করলাম। রাসূল (সাঃ) কা'বা গৃহে প্রবেশ করে নামায পড়লেন। তৎপর তিনি নিজ বাড়ীতে গমন করলেন। মুত' ইম এবং তাঁর পুত্রগণ উলঙ্গ তরবারি হাতে নিয়ে হযরত (সাঃ)-এর পিছনে পিছনে তাঁকে বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন।

মুম মুসলমান হন নি। কাফির থাকা অবস্থায়ই বদর যুদ্ধের পূর্বে তাঁর মৃত্যু হয়। রাসূল (সাঃ)-এর কবি হযরত হাসান (রাঃ) মুত'ইমের মৃত্যু সংবাদ শুনে শোকগাধা কবিতা লিখেছিলেন।

মুত ইমের এই সমস্ত উপকারের কথা চিরকালই রাসূল (সাঃ) কৃতজ্ঞতার সাথে উল্লেখ করতেন। বদর যুদ্ধের বন্দীদের সম্বন্ধে বলেছিলেন, আজ যদি মুইম জীবিত থাকতেন এবং এই অপদার্থদেরকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করতেন, তবে আমি তাদেরকে মুক্তি দিয়ে দিতাম।

মুইম বাসূল (সাঃ)-এর নিরাপত্তার ভার গ্রহণ করায় কুরায়শদের প্রকাশ্য অত্যাচার কতকটা হ্রাস পেল। কিন্তু কেউ যেন তাঁর বক্তব্য না শুনে এবং তিনি যেন কৃতকার্য হতে না পারেন, তজ্জন্য ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ কুরায়শ নানা প্রকার ব্যবস্থা অবলম্বন করল।

কুরায়শগণ এখন আর রাসূল (সাঃ)-এর ও'আয নসীহতের দিকে কর্ণপাতও করে না। অপত্য রাসূল (সাঃ) বাণিজ্য ও হজ্জ উপলক্ষে বিদেশ হতে আগত বিভিন্ন গোত্রের লোকদের নিকট ধর্ম প্রচার করতে আরম্ভ করলেন।

 বিভিন্ন গোত্রের ইসলাম প্রচার 

তীর্থযাত্রী ও বণিকগণ মক্কায় এসে সমবেত হত। এতদ্ভিন্ন প্রতি বৎসর নির্দিষ্ট সময়ে 'উকায, মাজিন্না এবং যুলমাজায প্রভৃতি স্থানে বড় বড় মেলা বসত। এই সমস্ত মেলায়ও আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা আগমন করত। তখন রাসূল (সাঃ) বিভিন্ন গোত্রের লোকদের নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম প্রচার করতেন, কুরআন পাঠ করে শুনাতেন এবং তাদের মধ্যে প্রচলিত কুসংস্কারের অনিষ্ঠকারিতা বুঝিয়ে দিতেন।

কিন্তু কুরায়শগণ এই বিদেশী সরলপ্রাণ লোকদেরকে বলত, তোমরা তাঁর কথা শুনও না, তিনি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে চান। লাৎ ও 'উয্যার কূপে নিক্ষেপ করে তোমাদের সর্বনাশ সাধন করাই তাঁর ইচ্ছা, ভাই ভাই ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করাই তাঁর কাজ। বিদেশী লোকেরা সহজেই তাদের কথা বিশ্বাস করতে লাগল। এজন্য প্রচার কার্যের বিশেষ অসুবিধা হয়ে পড়ল।

কিন্তু রাসূল (সাঃ) এতটুকুও নিরুৎসাহ হলেন না। তিনি বিভিন্ন গোত্রের যাত্রীদের আড্ডায় গমন করে যথারীতি প্রচার কার্য চালাতে রইলেন। পাপিষ্ট আবু লহব সতই তাঁর পিছনে পিছনে ঘুরতে থাকত এবং যেখানেই তিনি ও'আয আরম্ভ করতেন সেখানেই সে লোকদের নিকট তাঁর নানাবিধ মিছামিছি কুৎসা বর্ণনা করে তাঁর কথা শুনতে নিষেধ করত। আবু লহবের প্ররোচনায় অনেক সময় তাঁর সঙ্গে অসদ্ব্যবহারও করত। এতে রাসূল (সাঃ) বিন্দুমাত্র বিচলিত হতেন না। তিনি প্রচার কার্য চালিয়ে যেতে লাগলেন।

একবার রাসুল (সাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ) কে সঙ্গে নিয়ে যুহল গোত্রে প্রচার করতে গেলেন। হযরত আবু বকর পয়গম্বরের কথা শুনেছে কি? ইনিই ত সেই পয়গম্বর।" মন্ত্রক হযরত (সাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলল, আপনি কি শিক্ষা দেন? তিনি বললেন, আল্লাহ্ এক এবং আমি তাঁর প্রেরিত রাসুল। তৎপর কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। তখন মফরুক এবং সেই গোত্রের উপস্থিত সরদারগণ বলল, "আপনি যা শুনালেন, বাস্তবিক তা ভাল কথা; কিন্তু এত তড়িঘড়ি করে ধর্ম পরিবর্তন করা ঠিক নয়। অপরদিকে আমরা পারস্য সম্রাটের সাথে এই চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও শরণাপন্ন হব না। এজন্য এখন আমরা আপনার ধর্ম গ্রহণ করতে পারব না। তাদের উক্তি শুনে রাসূল (সাঃ) বললেন, আল্লাহই স্বীয় ধর্মের সাহায্য করবেন।

একবার মুহাম্মদ (সাঃ) বনু 'আমির গোত্রে প্রচার করতে গেলেন। বায়হারা ইবন ফিরাস নামক সেই গোত্রের একটি পূর্ত লোক রাসূল (সাঃ)-এর ভাষায় মাধুর্য এবং অনুপম বর্ণনা-ভঙ্গি দেখায়ে বলতে লাগল, এই লোকটিকে হাত করতে পারলে অচিরেই সমগ্র আরবের উপর অধিকার বিস্তার করা সম্ভব হবে। তৎপর সে হুযুর (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করল, "আমরা যদি আপনার কর্ম গ্রহণ করি, তবে আপনি জয়যুক্ত হলে আরবের রাজত্বটা আমাদেরকে দিয়ে যাবেন।, এতে আপনি সম্মত আছেন কি? "তিনি উত্তর করলেন, "রাজ্য বা রাজত্বের উপর আমার কোন অধিকার নেই; তা হলো আল্লাহর হাতে।" সে বলল, "রাজত্ব না পেলে অনর্থক ইসলাম গ্রহণ করে লাভ কি?"

এরূপে রাসূল (সাঃ) সকল গোত্রের যাত্রীদের নিকটই উপস্থিত হতে থাকলেন। প্রত্যেকের কর্ণকুহরেই সত্যের আহ্বান পৌছায়ে দিতে লাগলেন; কিন্তু কুরায়শদের বিরুদ্ধে প্রচারের ফলে একটি লোকও তাঁর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না। পাঠক, হয়ত মনে মনে ভাতেছেন যে, তাঁর সমস্ত চেষ্টা বুঝি বিফলেই যাচ্ছে। বস্তুত একথা ঠিক নয়। কারণ, কর্তব্য পালনই মানুষের বৃহত্তর সফলতা; ফলাফল মানুসের হাতে নয়, তা হল আল্লাহর হাতে। সত্যের আহ্বান মানুষের কর্ণকুহরে গচ্ছিত রেখে দেয়াই হল পয়গম্বরের কর্তব্য। অন্তরে প্রবেশ করিয়ে দেয়া তাঁর কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-"

আর যদি তারা (কাফিররা সত্য গ্রহণ করতে) বিমুখ থাকে; তবে আপনার কর্তব্য হল শুধু ( সত্যের আহ্বান) পৌছিয়ে দেয়া।"

সত্য যখন কর্ণকুহরে প্রবেশ করবে, তখন সে নিষ্ক্রিয় থাকবে না; বরং রক্ত প্রবাহের ন্যায় শ্রোতার শিরায় শিরায় প্রবাহিত হয়ে তার উপর স্বীয় প্রভাব বিস্তার করবে এবং একদিন না এক দিন হঠকারিতা, ঈর্ষা, শত্রুতা প্রভৃতির কাল যবনিকা ছিন্ন করে তার অন্তরে প্রবেশ করবেই। এটা হল সত্যের স্বাভাবিক ধর্ম। সুতরাং সত্যের সাধক কোন অবস্থাতেই নিরুৎসাহ হতে পারে না এবং তাঁর কোন প্রচেষ্টাই বিফলে যায় না।

রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি এত দীর্ঘকাল যাবত কুরায়শদের এই অমানুষিক অত্যাচার এবং আরবের গোত্রসমূহের এমন অবহেলা বাস্তবিকই দুঃখের বিষয়: কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় মোটেই নয়। কারণ অশ্রুত পূর্ব বিষয় মানব সমাজ বিনা দ্বিধায় সাদরে গ্রহণ করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে এরূপ দৃষ্টান্ত কুত্রাপিও দৃষ্টিগোচর হয় না। হযরত নূহ (আঃ)-কে শত শত বৎসর পর্যন্ত স্বজাতীয়দের অত্যাচার ও উৎপীড়ন ভোগ করতে হয়েছে। দর্শন ও বিজ্ঞানের জন্মস্থান এবং প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি গ্রীসেও সক্রেটিসকে বিষ পান করিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে। হযরত 'ঈসা (আঃ)-কে ফাঁসি কাষ্টে ঝুলাবার চেষ্টা করা হয়েছে, যদিও এতে শত্রুগণ কৃতকার্য হতে পারে নি। সুতরাং আরব ও কুরায়শদের অসদ্ব্যবহার অভূতপূর্ব বা আশ্চর্যের কিছুই নয়; কিন্তু শত্রুদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা অবলম্বন করা হল, তাই চিন্তা করে দেখার বিষয়।

সক্রেটিস বিষ পান করে নিজেই ধ্বংস হয়ে গেলেন। হযরত নূহ (আঃ) শত্রুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রলয়ঙ্কর তুফানের প্রার্থনা করলেন এবং এতে দুনিয়ার বৃহত্তাংশ ধ্বংস হয়ে গেল। হযরত ঈসা (আঃ) ত্রিশ চল্লিশ জন লোকের ছোট একটি দলকে হিদায়ত করে ধরাপৃষ্ঠ হতে ঊর্ধ্ব জগতে প্রস্থান করলেন। কিন্তু সৃষ্টসেরা মহামানব হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর কর্তব্য তাদের অপেক্ষা অনেক উচ্চ ছিল। এজন্যই যখন হযরত খাব্বাব (রাঃ) কুরায়শদের উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল (সাঃ)-এর খিদমতে আরয করলেন, আপনি কাফিরদের জন্য বদ দু'আ করুন তখন ক্রোধে তাঁর পবিত্র মুখমন্ডল রক্তবর্ণ হয়ে উঠল এবং তিনি বললেন, "তোমাদের পূর্বে এমন লোকও অতীত হয়ে গিয়েছে, যাঁদের মাথায় করাত রেখে ছিড়ে ফেলা হয়েছে, তথাপি তাঁরা নিজেদের কর্তব্য পালনে বিরত হয় নি। আল্লাহ তা'আলা এই (ইসলাম প্রচারের) কাজকে নিশ্চয়ই পূর্ণ করবেন। এমন একদিন আসবে যে, একা একজন উস্ট্রারোহী 'সান'আ' হতে 'হাফ্রামওত' পর্যন্ত (নিঃসঙ্কোচে) ভ্রমন করবে এবং এক আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারও ভয় থাকবে না।"

 কয়েকজন বিশিষ্ট লোকের ইসলাম গ্রহণ 

অনাবিল সত্যকে গোপন রাখায় চেষ্টা করা, আর মেঘশূন্য আকাশের উজ্জ্বল দিনমণিকে গোপন রাখার চেষ্টা করা একই কথা। কারণ নিবিড় অন্ধকারের হাজার হাজার স্তর ভেদ করেও সত্যের আলো প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

 হযরত তুফায়ল 

তুফায়ল ছিলেন দওস্ গোত্রের একজন্য সরদার এবং প্রসিদ্ধ কবি। এজন্য আরবদেশে তাঁর বেশ সুখ্যাতি ছিল। তিনি স্বয়ং বলেন, আমি একবার মক্কায় আগমন করলাম। আমার আগমনবার্তা পেয়ে কয়েকজন কুরায়শ-সরদার আমার নিকট উপস্থিত হয় এবং বিশেষ সম্মানের সাথে আমার অভ্যর্থনা করে। কথা প্রসঙ্গে তারা আমাকে বলে, ইদানিং আমাদের এখানে একজন যাদুকরের আবির্ভাব হয়েছে। তাঁর নাম মুহাম্মদ (সাঃ)। ইনি বড় ভয়ঙ্কর লোক। তাঁর কথা কানে পড়ামাত্রই জাদুর প্রভাবে মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তিনি চক্ষের পলকে পিতা পুত্র স্বামীস্ত্রী এবং ভাই ভাইয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ও শত্রুতার সৃষ্টি করে দেন। ইনি জাদুর বলে আমাদের দল ভেঙ্গে, লোকদেরকে ধর্মচ্যুত করে এবং আরও নানা প্রকারের অশান্তি সৃষ্টি করে আমাদেরকে সর্বস্বান্ত করে ফেলতেছেন। আপনি সম্ভ্রান্ত বংশের লোক এবং আমাদের অভ্যাগত অতিথি। তাই আপনাকে সর্তক করে দেয়া সমীচীন বলে মনে করলাম। অন্যথায় আপনার বিভ্রান্ত ও বিপদগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা আছে।

হযরত তুফায়ল (রাঃ) বলেন, আমি তাদের কথায় এত ভীত হয়ে পড়লাম যে, অজ্ঞাতসারে যেন মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কথা আমার কানে পড়ে না যায়, তজ্জন্য আমি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করলাম। একদিন প্রাতঃকালে কা'বা গৃহে গমন করে দেখলাম যে, মুহাম্মদ (সাঃ) নামায পড়তেছেন। আল্লাহর কি অপার মহিমা। এত সাবধানতা সত্ত্বেও তাঁর মুখ নিঃসৃত কুরআন আমার কর্ণগোচর হয়ে গেল। যে কয়টি শব্দ আমার কানে পড়ল, তা অত্যন্ত মধুর মনে হতে লাগল। তখন আমি মনে মনে ভাবলাম, এত ভয়ের কারণ কি? আমি ত বোকা নই। ভাল-মন্দ সবই বুঝি, আমি একজন প্রসিদ্ধ কবি ও সাহিত্যিক। আচ্ছা, তাঁর কথাগুলো শুনলে দোষ কি? যদি ভাল না হয় তবে তা না মানলেই ত চলে। রাসূল (সাঃ) নামায শেষ করে স্বগৃহে রওয়ানা হলেন। আমিও তাঁর পিছনে পিছনে চললাম।

যখন গৃহে পৌঁছলেন তখন তাঁর নিকট সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম এবং তাঁর পবিত্র বাণী আরও শুনাবার প্রার্থনা জানালাম। তিনি আমাকে আরও কুর'আন পাঠ করে শুনালেন। আল্লাহর কসম, এমন পবিত্র বাণী আমি আর কখনও শুনি নি। রাসূল (সাঃ) আমার নিকট ইসলাম পেশ করলেন। আমি তৎক্ষণাৎ সন্তুষ্টচিত্তে ইসলাম গ্রহণ করলাম।

হযরত তুফায়ল (রাঃ) খাঁটি মুসলমান ছিলেন। দেশে ফিরার পর তিনি নিজ গোত্রে ইসলাম প্রচার করেন। প্রথমে তাঁর পিতা ও স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী তাঁকে বলেছিলেন, আমরা যে ঠাকুর দেবতার পূজা ছেড়ে আল্লাহর পূজা আরম্ভ করলাম, এতে যদি আমাদের পূর্ব উপাস্য ঠাকুর দেবতা অসন্তুষ্ট হয়ে আমার কোলের মেয়েটির সর্বনার করে? হযরত তুফায়ল (রাঃ) বললেন, এগুলো পাথরের মূর্তি। এদের ভাল বা মন্দ করার কোনই ক্ষমতা নেই।

স্বনামধন্য সাহাবী এবং হাদীসের সুবিখ্যাত রাবী হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) ও এই দওস বংশের লোক ছিলেন।

 হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) 

হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) য়‍্যাসূরিব শহরের বাসিন্দা ছিলেন। আমরা তাঁর সম্বন্ধে পূর্বে বর্ণনা করে এসেছি যে, তিনি অত্যন্ত ধর্মভীরু লোক ছিলেন এবং সত্য ধর্মের অন্বেষণে খুব ব্যস্ত ছিলেন। ঞ্জরাসূল (সাঃ)-এর সংবাদ পেয়ে তাঁর ভাইকে পাঠিয়ে দিয়ে তাঁর খোঁজ নিলেন; কিন্তু এতে তিনি পরিতৃপ্ত হলেন না। সুতরাং তিনি নিজেই মক্কা যাত্রা করলেন।

তিনি মক্কায়, পৌঁছিয়ে যমযম কূপের পানি পান করে কা'বা প্রাঙ্গনেই রাত্রি যাপন করলেন। কারণ, তিনি রাসূল (সাঃ)-কে চিনেন না। আর কারও নিকট তাঁর পরিচয় অবগত হতে চাইলে যে মহাবিপদ ঘটে, সে কথাও তিনি স্বীয় ভ্রাতার নিকট জানতে পেরেছিলেন। হযরত 'আলী (রাঃ) তাঁকে এই অবস্থায় দেখতে পেয়ে বললেন, আপনি কি বিদেশী লোক? হযরত আবু যর বললেন, জি হাঁ। তখন হযরত আলী (রাঃ) তাঁকে মেহমানরূপে সাথে করে নিজ বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। সেইখানে তিনি রাত্রি যাপন করলেন। কিন্তু উভয়ের মধ্যে কোন কথাবার্তাই হল না। সকালে উঠে হযরত আবু যর আবার কা'বা গৃহে চলে আসলেন। গোপনে গোপনে তিনি রাসূল (সাঃ)-কে অনুসন্ধান করছিলেন।

আবার হযরত 'আলী (রাঃ) এসে তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন যে, বোধ হয় আপনি গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারতেছেন না। হযরত আবু যর বললেন-জি হাঁ। আজও তিনি তাঁকে মেহমানরূপে বাড়ী নিয়ে গেলেন।

আজ হযরত 'আলী (রাঃ) বললেন, "জনাব, আপনি কে? কি উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছেন?" হযরত আবু যর বললেন, "আমার একটা গোপনীয় কাজ আছে। আপনি যদি আমার কথা গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দেন, তবে আমি বলতে পারি।"

 হযরত আলী (রাঃ) যখন প্রতিশ্রুতি দিলেন তখন তিনি বললেন- "আমি লোকমুখে শুনতে পেলাম যে, এই শহরের জনৈক ব্যক্তি নবী বলে দাবী করেন। তাঁর তথ্য সংগ্রহের জন্য আমার ভাইকে পাঠিয়েছিলাম; কিন্তু সে এমন কোন তথ্য নিয়ে যেতে পারে নি যাতে আমার তৃপ্তি হতে পারে। তাই আমি স্বয়ং এসেছি।"

হযরত আলী (রাঃ) বললেন- "বেশ, আমার সাথে যে আপনার সাক্ষাৎ হয়েছে, তা অতি মঙ্গলময়। আমার সাথে চলুন। আমি নবী (সাঃ)-এর খিদমতেই' যাচ্ছি।" কুরায়শগণ বিষয়টি জেনে ফেলার আশঙ্কা দেখলে কিরূপ সঙ্কেত করে তাঁকে সতর্ক করবেন, হযরত 'আলী তাঁকে তাও বলে দিলেন।

হযরত 'আলী (রাঃ)-এর সাথে তিনি রাসূল (সাঃ) -এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললেন- হুযুর, ইসলাম কি? তা আমাকে বুঝিয়ে দিন। আবু যর তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করলেন

রাসূল (সাঃ) তাঁকে বললেন-"তুমি এখন ইসলামের কথা গোপন রাখ এবং দেশে চলে যাও। যখন আল্লাহ্ তা'আলা ইসলামকে জয়যুক্ত করেন তখন আমার নিকট এসো। আবূ যর নতস্বরে উত্তর করলেন- হুযূর, আমি শত্রুদের নিকট সত্য প্রচার না করে যাব না।

তওহীদের 'কালিমা' পাঠ করার সাথে সাথে হযরত আবু যর এক অপূর্ব দুর্দমনীয় শক্তি হৃদয়ে অনুভব করতে লাগলেন। এক মুহূর্ত পূর্বেই তিনি কুরায়শদের ভয়ে সন্ত্রস্ত ছিলেন। আর 'কালিমা; পড়ার সাথে সাথেই তিনি অনুভব করতে লাগলেন যে, একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া আর এমন কোন কিছু নেই, যাকে ভয় করা যেতে পারে। এটা কামিল ঈমানের প্রতিক্রিয়া।

হযরত আবু যর কা'বা গৃহে আসলেন এবং সমবেত কুরায়শদের সম্মুখে দাঁড়ায়ে উচ্চকণ্ঠে 'কালিমা-ই-শাহাদাত' পড়তে লাগলেন। আর কথা কি? চার দিক হতে মার মার করে আক্রমণ করে বসল এবং বেদম মারপিট আরম্ভ করল। কিন্তু হযরত আবু যর আরও উচ্চ কন্ঠে 'কালিমা' পড়তে লাগলেন। দুর্বৃত্তগণ ক্রোধান্বিত হয়ে তাঁকে হত্যা করার সংকল্প করল। তিনি আরও উচ্চৈঃস্বরে 'কালিমা তওহীদ' পড়তে লাগলেন। এমন সময় হযরত 'আব্বাস এসে বললেন, "আরে। তোমরা কর কি? এ যে গিফার বংশের লোক। তাদের দেশে তোমরা বাণিজ্য করতে যাও, সে স্থান হতে তোমরা খেজুর ক্রয় করে থাক। তোমরা করতেছ কি? তখন তারা হযরত 'আব্বাসের কথা শুনে তাঁকে ছেড়ে দিল। তিনি কয়েক দিন যাবত এখানে থেকে সত্য প্রচার করতে থাকেন। তৎপর তিনি স্বদেশে চলে যান। মক্কায় তিনি শুধু যমযম কূপের পানি পান করে এক মাস অবস্থান করেন। এই পবিত্র পানি ানীয় ও খাদ্য উভয়ের কাজই করত।

 মন্ত্রতন্ত্রজ্ঞ যিমাদ 

'যিমাদ' য়‍্যামন দেশের আয়দ বংশীয় লোক। তিনি ছিলেন তন্ত্রমন্ত্রবিদ একজন বড় গুনিন। এজন্য আরবময় তাঁর বেশ সুখ্যাতি ছিল। একবার তিনি মক্কায় এসে কুরাশয়দের নিকট শুনতে পেলেন যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ভয়ঙ্কর রকমে ভূতগ্রস্ত হয়েছেন। তখন তিনি কুরায়শ সরদারদেকে বললেন, আমি র্ভূত ছাড়াতে জানি। তাদের সাথে এবিষয়ে আলোচনা করে ভূত ছাড়াবার জন্য তিনি রাসূল (সাঃ)-এর নিকট আসলেন এবং তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, "মুহাম্মদ (সাঃ) এখনই আমি মন্ত্র পড়ে আপনার ভূত ছাড়ায়ে দিচ্ছি। রাসূল (সাঃ) বললেন, "আচ্ছা, বেশ, ভাল কথা; কিন্তু তুমি আমার কথা শুনে লও।" এ বলে তিনি বক্তব্য আরম্ভ করার উদ্দেশ্যে স্বীয় অভ্যাস অনুযাযী খুতবা (ভূমিকা) স্বরূপ হামদ ও না'ত পড়লেন-

"যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, তাঁর নেয়ামতসমূহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেছি। আমরা প্রত্যেক কাজে তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ্ তা'আলা যাকে হিদায়ত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারেন না। আর আল্লাহ যাকে হিদায়ত না করেন তাকে কেউ হিদায়ত করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কেউ 'ইবাদতের যোগ্য নই, তিনি এক, তাঁর কোন অংশী নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত মহাপুরুষ। তৎপর.....

ভূমিকা শেষ করে বক্তব্য আরম্ভ করার জন্য ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন- হুযূর, এই ভূমিকাটি আবার পাঠ করুন। যিমাদের অনুরোধে রাসূল (সাঃ) ভূমিকাটা কয়েকবার আবৃত্তি করলেন। কোথায় মন্ত্রতন্ত্র পড়া? ভাষার মাধুর্যে অভিভুক্ত হয়ে যিমাদ প্রকম্পিত হৃদয় উচ্ছসিত স্বরে বলতে লাগলেন, কবিতা শুনেছি। কিন্তু এমন গভীর তথ্যপূর্ণ মধুর ভাষা ও আর কখনও শুনি নি। এ যে মহাসমুদ্রের ন্যায় বিশাল ও গভীর। অসংখ্য মণিমুক্তার আকর। হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আপনার পবিত্র হস্ত প্রসারিত করুন, আমি পবিত্র ইসলাম গ্রহণ করলাম, আমি মুসলমান হলাম।

সুয়ায়প 'সুয়ায়দ' নিজ গোত্রে কামিল নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর সাথে একবার রাসূল (সাঃ)-এর সাক্ষাৎ হল। তখন রাসূল (সাঃ) তাঁকে ইসলামের মূলনীতিসমূহ বুঝায়ে ইসলামের দিকে আহবান করলেন।

সুয়ায়দ বললেনঃ "হাঁ বুঝতে পেরেছি, আমি যা জানি, আপনিও বুঝি তাই জানেন।"

রাসূল (সাঃ) বললেন: তুমি কি জান?

সুয়ায়দ বলল: আমি লুকমানের হিকমত জানি।

রাসূল (সাঃ) বললেনঃ আচ্ছা, শুনাও ত দেখি?

সুয়ায়দ নিজ রচিত ভাবপূর্ণ অতি মূল্যবান কয়েকটি কবিতা পড়ে শুনালেন। রাসূল (সাঃ) বললেন- "তোমার কবিতাগুলো বাস্তবিকই অতি উত্তম। কিন্তু আমার নিকট যে বাণী আছে, তা এটা অপেক্ষা সহস্র গুণে উৎকৃষ্ট এবং হিদায়ত ও নূর। তার সাথে তোমার এই কবিতার কোন তুলনাই হয় না।" তৎপর রাসূল (সাঃ) পবিত্র কুর'আনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনালেন। কুর'আন শুনে সুয়ায়দ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন এবং বিনা দ্বিধায় অতি আগ্রহের সাথে তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করেন।

 একদল খৃস্টান 

একদিন কুরায়শ সরদারগণ, 'দারুন্নন্দওয়া' বা পরামর্শ গৃহে চলে গেল। শুধু একা রাসূল (সাঃ) পবিত্র কা'বা গৃহে বসে ইবাদতে মশগুল আছেন। এমন সময় হাবশার মতান্তরে নজরানের একদল খৃষ্টান এসে তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলেন। এই দলে তাঁরা বিশ জন ছিলেন। তাঁরা রাসূল (সাঃ)-এর মুখে সত্য ধর্মের সমস্ত তথ্য অবগত হয়ে কুরআন শুনলেন এবং নিজেদের ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে যে-সব বিষয় অবগত ছিলেন, সে-সম্মন্ধে রাসূল (সাঃ)-কে অনেক প্রশ্ন করলেন। রাসূল (সাঃ) ও সমস্ত বিষয়ের উত্তর দিলেন। যখন তাঁরা বুঝতে পারলেন যে, তাঁদের ধর্মগ্রন্থ যে শেষ নবীর আবির্ভাগের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, ইনি সেই বিশ্বের ত্রাণকর্তা মহানবী, তখন তাঁরা সকলেই সন্তুষ্টচিত্তে ইসলাম গ্রহণ করলেন।

মুসলমান হওয়ার পর যখন তাঁরা রাসূল (সাঃ)-এর খিদমত হতে প্রত্যাগমন করলেন তখন কয়েকজন কুরায়শ-সরদার সমভিব্যাহারে আবু জাহল তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করে বলল, "তোমরা দেখি বড় বোকা। এতশীঘ্র তোমরা সত্য-মিথ্যার কি বুঝলে? আসা মাত্রই স্বধর্ম বর্জন করে বে-দীন হয়ে গেলে। তোমাদের দেখাদেখি অন্য লোকেরাও তো ধর্মচ্যুত হয়ে পড়বে। তোমরা এত বোকা কেন?"

তাঁরা বললেন-"ভাই, আমাদেরকে ছেড়ে দাও। আমাদের বোকামি নিয়ে আমরা চলে যাই, তোমাদের বুদ্ধি দিয়ে তোমরা কাজ কর।"

অনেকের মতে তারা যে হাবশার অধিবাসী ছিলেন, এই মতই বলবৎ। কারণ, হাবশাবাসিগণ মুসলমানদের চরিত্রে মুগ্ধ হয়েই তাঁরা রাসূল (সাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য এবং ইসলামের পূর্ণ তথ্য অবগত হবার জন্য তাঁর খিদমতে আসছিলেন। হাদীসে ও নবীচরিতের কিতাবসমূহে এই প্রকার আরও বহু ঘটনা দেখতে পাওয়া যায়। আমরা নমুনাস্বরূপ কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করলাম। এতেই পাঠকগণ অনুমান করতে পারবেন যে, আরবের বিভিন্ন গোত্রে ইসলাম কিরূপে বিস্তার ও আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। আর সত্যানুরাগী আল্লাহভক্ত মহাত্মাগণ যে সত্যের প্রেমে প্রমত্ত হয়ে পতঙ্গের ন্যায় কি ভাবে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন, তাও উপলদ্ধি করতে পারবেন।

বাস্তবিক ইসলামের অনুরক্ত, আল্লাহ ও রাসূলের প্রেমে প্রমত্ত ভক্তগণ যে আদর্শ রেখে গিয়েছেন জগতে তার তুলনা নেই। ইসলামের প্রতি দোষারূপ করার প্রচেষ্টায় যাঁরা নিজেদের ধন-সম্পদ এমন কি জীবন পর্যন্তও ওয়াকফ্ করে দিয়েছেন, তাঁরাও এই মহাসত্যকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। জনৈক ইউরোপীয় লেখক বলেন-

"খৃষ্টানদের এ কথা স্মরণ রাখা উচিত যে, মুহাম্মদ (সাঃ)-এর শিক্ষা তাঁর ভক্তদের মধ্যে যে ধর্মানুরাগ সৃষ্টি করেছিল, যীশুখৃস্টের প্রাথমিক ভক্তদের মধ্যে এদের তুলনা তালাশ করা নিষ্ফল। ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য যখন শত্রুগণ যীশুকে ধরতে গেল তখন তাঁর ভক্তদের ধর্মানুরাগ উধাও হয়ে গেল এবং গুরুকে শত্রুদের হাতে পরিত্যাগ করে পলায়ন করল। পক্ষান্তরে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ভক্তগণ তাঁর বিপদকালে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন, গুরুকে রক্ষা করলেন এবং তাঁকে সকল শত্রুর উপর জয়ী করে দিলেন।"

 নবুওয়তের একাদশ বৎসর 

মদীনা ও আনসার: ফুল-কানন হতে বের হবার পরেই মনোমুগ্ধকর আতরের রূপ ধারণ করে; বহু দূরে নিক্ষিপ্ত হবার পরই সূর্যের কিরণে প্রখরতা আসে। দিগদিগন্ত প্রসারী নির্মল কিরণরাশির আধার পবিত্র ইসলামরবি উদিত হল ফারানের (মক্কার) আকাশে; আর তার উজ্জ্বল কিরণের আভায় ঝলসিত ও উদ্ভাসিত হল শত শত মাইল দূরে অবস্থিত সল'আ (মদীনা নগরী)।

পূর্বে মদীনার নাম ছিল য়্যাস্ট্রিব রাসূল (সাঃ) যখন এখানে এসে বাস করতে আরম্ভ করেন তখন এর নাম হয় মদীনাতুন নবী বা নবীর মূনা। পরে এটা'ই সংক্ষিপ্ত হয়ে মদীনা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

এটা একটি প্রাচীন শহর। শহরটি মক্কা হতে প্রায় ২৭০ মাইল উত্তরে অবস্থিত। অতি প্রাচীন কালেই যেরুযালেম হতে বিতাড়িত একদল য়্যাহুদী এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছিল। মদীনায় আসার পর ক্রমশ তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার মদীনার চতুষ্পার্শ্বস্থ অঞ্চলসমূহ অধিকার করতে থাকে। এরূপে মদীনার আশপাশের স্থানগুলো তারাই দখল করে বসে। এ সকল স্থানে তারা ছোট ছোট কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করে এগুলোর ভিতরেই তারা বাস করতে থাকে।

তৎপর 'আরিম প্লাবনে যখন য়‍্যামনের সাবাঈ রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায় তখন আউস ও খযরজ নামক কাহতান বংশীয় দুই ভাই য়‍্যামন হতে মদীনায় এসে বসতি স্থাপন করে। মদীনার আনসারগণ তাদেরই বংশীর। প্রথম প্রথম এই কাহতানী আরবগণ য়‍্যাহুদীদের সঙ্গে কোন প্রকার সম্পর্ক স্থাপন না করে স্বতন্ত্রভাবেই জীবন যাপন করতে থাকে। কিন্তু পরে য়‍্যাহুদীদের প্রভাব প্রতিপত্তি ও ধন-জনের শক্তি দেখায়ে তাদের সাথে মিত্রতার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। বহু দিন যাবত তাদের চুক্তি বলবৎ ছিল; কিন্তু যখন আউস ও খফ্রজনের সংখ্যা বাড়তে লাগল এবং তারা শক্তিশালী হয়ে উঠল তখন য়‍্যাহূদীগন উক্ত চুক্তি নাকচ করে দিল।


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url