ওযু কাকে বলে? ওযুর ফরজ, সুন্নত, আদব এবং ওযু করার পদ্ধতি
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওবারাকাতুহু। প্রিয় পাঠক "বেসিক ইসলাম এডুকেশন" এর পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগতম। প্রিয় পাঠক আজ আমি আপনাদের সাথে আলোচনা করবো ওযু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে। যেমন- ওযু কি? ওযুর ফরজ কয়টি ও কি কি? ওযু কেন ফরজ হয়েছে? ওযুর সুন্নত কয়টি ও কি কি? ওযু ভংগের কারন কয়টি ও কি কি? ওযু করার পদ্ধতি কি? ওযু করার আদব ও শিষ্টাচার গুলো কি কি? প্রিয় পাঠক আশা করছি আজকের আর্টিকেলটি যদি আপনি মনোযোগ সহকারে পড়েন তাহলে ওযু সম্পর্কে আপনি বিস্তারিত ধারণা লাভ করতে পারবেন। তাহলে চলুন শুরু করা যাক-
ওযু কাকে বলে?
ওযু শব্দের শাব্দিক অর্থ ধৌত করা। শরিয়তের পরিভাষায় পবিত্রতা অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত পন্থায় শরীরের কতিপয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করাকে ওযু বলে। নামায আদায়, কুরআন তিলাওয়াত ও কাবা ঘর যিয়ারত করার জন্য ওযু করা আবশ্যক। এজন্য ওযুর মাসয়ালাগুলো সকলের জানা অতিজরুরী। নিম্নে ওযুর কতিপয় মাসয়ালা উল্লেখ করা হলো-
![]() |
| ওযু সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা |
ওযু ছুটে যাওয়ার কারণগুলো কি কি?
ওযু ছুটে যাওয়ার কারণ ৭টি। যথা-
১। পেশাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বের হওয়া।
২। মুখ ভরে বমি হওয়া।
৩। শরীরের কোন স্থান হতে রক্ত, পুঁজ বা পানি বের হয়ে গড়িয়ে পড়া।
৪। থুতুর সাথে রক্তের ভাগ সমান বা বেশি হওয়া।
৫। চিত বা কাত হয়ে হেলান দিয়ে ঘুম যাওয়া।
৬। পাগল, মাতাল বা অচেতন হওয়া।
৭। নামাযে উচ্চস্বরে হাসা।
ওযুর ফরয কয়টি ও কি কি?
ওযুর ফরয- ৪টি। যথা-
১। সমস্ত মুখ ধোয়া।
২। দু'হাতের কনুইসহ ধোয়া।
৩। একচতুর্থাংশ মাথা মাসেহ করা।
৪। দু'পায়ের টাকনুসহ ধোয়া।
ওযু ফরয হওয়ার কারনগুলো কি?
১। প্রত্যেক নামাযের জন্য (ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত, নফল)।
২। জানাযার নামাযের জন্য।
৩। তিলাওয়াতে সিজদার জন্য।
৪। কাবা ঘর যিয়ারতের জন্য।
ওযুর সুন্নাত কয়টি ও কি কি?
১। আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা।
২। অযুর শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলা।
৩। দুই হাতের কব্জিসহ ধোয়া।
৪। মিসওয়াক করা।
৫। কুলি করা।
৬। নাকে পানি দেয়া।
৭। আঙুল খিলাল করা।
৮। দাঁড়ি খিলাল করা।
৯। সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা।
১০। উভয় কান মাসেহ করা।
১১। অঙ্গসমূহ ধোয়ার ধারাবাহিকতা ঠিক রাখা।
১২। ডান দিক থেকে সকল কাজ শুরু করা।
১৩। এক অঙ্গ ধোয়ার সাথে সাথেই অন্য অঙ্গ ধোয়া।
১৪। প্রত্যেক অঙ্গ তিনবার করে ধোয়া
১৫। ওযুর শেষে মাসনুন দোয়া পড়া।
ওযু করার পদ্ধতি
ওযু করার সুন্নাত তরিকা হলো- পবিত্রতা অর্জনের নিয়ত করে কিবলামুখী হয়ে 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম' বলে ওযু শুরু করবে। প্রথমে ডান হাত পরে বাম হাতের কব্জি তিনবার ধৌত করবে। অতঃপর মিসওয়াক করবে এবং তিনবার কুলি করবে। রোযাদার না হলে গড়গড়া করবে। তিনবার নাকে পানি দিয়ে বাম হাতের আঙ্গুল দিয়ে নাক পরিস্কার করবে। এরপর সম্পূর্ণ মুখমন্ডল তিনবার ভালভাবে ধৌত করবে। দাঁড়ি থাকলে খিলাল করতে হবে। এরপর প্রথমে ডান হাত এবং পরে বাম হাতের কনুইসহ তিনবার ধৌত করবে। তারপর দু'হাত ভিজিয়ে সম্পূর্ণ মাথা ও কান মাসেহ করবে। অতঃপর প্রথমে ডান পা এবং পরে বাম পায়ের টাকনুসহ তিনবার ধৌত করবে। পায়ের আঙ্গুলগুলো খিলাল করবে। ওযুর শেষে মাসনুন দোয়া পড়বে।
ওযুর আদব ও শিষ্টাচার
১. যে সত্তার সামনে অবনত হওয়ার জন্য পবিত্রতা অর্জন করা হচ্ছে, মনে মনে তাঁর ভয় সৃষ্টি করা।
২. যথাসাধ্য অজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করা। নবি (সা.) বলেছেন- 'মুমিন ছাড়া কেউ সর্বদা অজু অবস্থায় থাকে না।'
৩. অজুতে পানি ব্যবহারে অপচয় না করা। 'সাদ (রা.) অজু করার সময় নবি (সা.) তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, হে সাদ! এটা কী ধরনের অপচয়? সাদ বললেন, অজুতেও পানি অপচয় হয় নাকি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, যদিও তুমি প্রবাহিত নদীতে অজু করো না কেন।'
৪. উঁচু স্থানে বসে কিবলামুখী হয়ে অজু করা।
৫. অজুর শুরুতে নিয়ত করা। নবি (সা.) বলেছেন-'প্রত্যেক আমলই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।'"
৬. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন স্থানে বসে অজু করা।
৭. অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহ বলেনি, তার অজুই হয়নি।'
৮. অজুর অঙ্গগুলো ডান দিক থেকে ধোয়া। নবি (সা.) বলেছেন-'তোমরা অজুর সময় অঙ্গগুলোকে ডান দিক থেকে ধৌত করো।'
৯. অজুতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।
১০. এক অঙ্গ শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বে অন্য অঙ্গ ধোয়া।
১১. অজুর অঙ্গগুলোকে ঘষে ঘষে ধোয়া।
১২. উত্তম পন্থায় অজু করা। নবি (সা.) বলেছেন- 'যখন নামাজের ইচ্ছে করবে, তখন ভালোভাবে অজু করবে।
১৩. অজু করার সময় অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা না বলা।
১৪. অজুর আগে তিনবার হাতের কবজি পর্যন্ত ধোয়া।
উসমান (রা.) অজুর পানি আনতে বললেন। পানি আনা হলে তিনি দুই হাতের কবজি তিনবার ধৌত করে বললেন-'আমি নবি (সা.)-কে এভাবে অজু করতে দেখেছি।'
১৫. অজুর সময় হাদিসে বর্ণিত দুআ পড়া। আবু মুসা (রা.) বলেন-'নবি (সা.) অজু করছিলেন। আমি কাছে এসে শুনলাম, তিনি এই দুআ পড়ছেন-اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي وَوَسِعُ لِي دَارِي وَبَارِكْ لِي فِي رِزْقِي
"হে আল্লাহ! আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দাও। আমার ঘরকে প্রশস্ত করে দাও এবং আমার রিজিকে বরকত দান করো।""
১৬. মিসওয়াক করা। নবি (সা.) বলেছেন- 'আমার উম্মতের জন্য যদি কষ্টকর না হতো, তাহলে প্রত্যেকবার অজুর সময় মিসওয়াক করা আমি তাদের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিতাম।'
১৭. তিনবার কুলি করা।
১৮. তিনবার নাকে পানি দেওয়া। ইয়াহইয়া বলেন- 'আমর ইবনে আবু হাসান আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদকে নবিজির অজু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, একটি পাত্রে পানি নিয়ে এসো। পানি আনা হলে তিনি অজু করে দেখালেন। প্রথমে তিনি দুই হাতে তিনবার পানি ঢাললেন। এরপর পাত্রে হাত ঢুকিয়ে তিনবার কুলি করলেন এবং তিনবার নাকে পানি দিলেন ও নাক পরিষ্কার করলেন। '
১৯. ডান হাতে পানি নিয়ে কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়া। আর বাম হাতে নাক পরিষ্কার করা।
২০. রোজাদার না হলে ভালোভাবে কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া। নবি (সা.) বলেছেন-'তোমরা পূর্ণভাবে অজু করো। আঙুলের মধ্যস্থান খিলাল করো। আর রোজাদার না হলে ভালোভাবে নাকি পানি দাও।'
২১. চেহারা ও হাত ধোয়ার সময় অঞ্জলি দ্বারা পানি নেওয়া। আতা ইবনে ইয়াসার (রহ.) বলেন- 'ইবনে আব্বাস (রা.) অজুর সময় চেহারা ধৌত করলেন। তিনি এক অঞ্জলি পানি নিয়ে তা দিয়েই কুলি করলেন ও নাকে পানি দিলেন। এরপর আরেক অঞ্জলি পানি নিয়ে চেহারা ধৌত করলেন। '
২২. কপাল থেকে চেহারা ধোয়া শুরু করা।
২৩. চেহারায় পানি জোরে না মারা। কেননা, চেহারায় পানি জোরে মারা মাকরুহে তানজিহি।
২৪. চোখের কোণ মাসেহ করা। আবু উমামা (রা.) বলেন-'নবি (সা.) অজু করার সময় চোখের কোণ মাসেহ করতেন।
২৫. দাড়ি খিলাল করা। আনাস (রা.) বলেন-'অজুর সময় নবি (সা.) এক অঞ্জলি পানি নিয়ে নিচ থেকে থুতনিতে প্রবেশ করাতেন এবং দাড়ি খিলাল করতেন।'
২৬. হাত ও পায়ের আঙুলের মাথা থেকে ধোয়া সুন্নত।
২৭. কনুই ও গোড়ালিতে পানি পৌছানো। জাবির (রা.) বলেন-'নবি (সা.) অজুর সময় পানি দিয়ে দুই কনুই ভালোভাবে ভেজাতেন।'
নবি (সা.) বলেছেন-'অজুর সময় শুষ্ক থেকে যাওয়া গোড়ালির জন্য রয়েছে জাহান্নামের ভীতি। '
২৮. আঙুলগুলো খিলাল করা। নবি (সা.) বলেছেন- 'হাত ও পায়ের আঙুলগুলো খিলাল করো।'
২৯. বাম হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলি দ্বারা পায়ের আঙুল খিলাল করা। মুস্তাওরিদ ইবনে শাদ্দাদ (রা.) বলেন- 'রাসূল (সা.) অজুর সময় কনিষ্ঠাঙ্গুলি দ্বারা পায়ের আঙুলগুলো মাসেহ করতেন। '
৩০. অজুর অঙ্গগুলো তিনবার করে ধৌত করা।
৩১. অজুর অঙ্গগুলো তিনবারের বেশি না ধোয়া। 'একদিন অজু করার সময় নবি (সা.) অঙ্গগুলো তিন তিনবার করে ধৌত করলেন। এরপর বললেন, যে এর থেকে বাড়াল বা কমাল, সে অন্যায় করল এবং জুলুম করল। '
৩২. সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা। রাসূল (সা.) অজু করার সময় দুই হাত দিয়ে মাথার সম্মুখ ভাগ এবং পেছনভাগ মাসেহ করতেন।
৩৩. কপাল থেকে মাসেহ শুরু করা এবং দুই হাতে মাসেহ করা। দুই হাতের তালু ও আঙুল মাথার সম্মুখাংশে রেখে এমনভাবে পেছনের দিকে টেনে নেবে, যাতে সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ হয়ে যায়।
৩৪. কানের ভেতর-বাইর উভয় অংশই মাসেহ করা। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন-'নবি (সা.) কানের ভেতরের অংশ শাহাদাত আঙুল দিয়ে এবং বাইরের অংশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মাসেহ করতেন।
৩৫. কান মাসেহ করার সময় কানের ছিদ্রে কনিষ্ঠাঙ্গুলি ঢোকানো।
৩৬. গোপনাঙ্গের সাথে মিলিত কাপড়ে পানি ছেটানো। বিশেষত যাদের ওয়াসওয়াসার রোগ রয়েছে, তাদের জন্য এ কাজটি করা উত্তম। হাকাম (রা.) বলেন- 'রাসূল (সা.) প্রস্রাব করে অজু করলেন এবং গোপনাঙ্গের স্থানে পানি ছেটালেন।
৩৭. অজু শেষে পাত্রে অবশিষ্ট পানি দাঁড়িয়ে পান করা। আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার তিনি অজু করলেন এবং অজু শেষে পাত্রে অবশিষ্ট পানি দাঁড়িয়ে পান করলেন।
৩৮. অজু শেষে হাদিসে বর্ণিত দুআ পড়া। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি ভালোভাবে অজু করার পর আকাশের দিকে তাকিয়ে এই দুআ পড়বে-أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি-আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তার কোনো শরিক নেই, নেই অংশীদারও। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি- মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! আমাকে তওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও। তার জন্য জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হবে। যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে সে দরজা দিয়েই সে প্রবেশ করতে পারবে।'
৩৯. অজুর পর অঙ্গগুলো কোনো কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে মোছা। আয়িশা (রা.) বলেন-'নবি (সা.)-এর একটি কাপড়ের টুকরো ছিল, অজু করার পর যা দিয়ে তিনি অঙ্গগুলো মুছতেন।
৪০. অজুর পর নামাজের আগপর্যন্ত নীরব ও প্রশান্ত থাকা।
৪১. তাহিয়্যাতুল অজু দুই রাকাত নামাজ পড়া। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি ভালোভাবে অজু করার পর দুই রাকাত নামাজ পড়বে, আল্লাহ তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।
পরিশেষেঃ প্রিয় পাঠক, আজ আমি আপনাদের সাথে উপরোক্ত আলোচনায় নিম্নোক্ত প্রশ্নসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আশা করছি ওযু সম্পর্কে আর কোন ভ্রান্ত ধারণা থাকবে না।
ওযু কি? ওযুর ফরজ কয়টি ও কি কি? ওযু কেন ফরজ হয়েছে? ওযুর সুন্নত কয়টি ও কি কি? ওযু ভংগের কারন কয়টি ও কি কি? ওযু করার পদ্ধতি কি? ওযু করার আদব ও শিষ্টাচার গুলো কি কি?
