মহানবী সাঃ এর জীবনী (বাংলা)

ফইউনের দুষ্কৃতি

ফইউন নামক এক দুর্বৃত্ত য়্যাহুদীদের সরদার হল। লোকটা যেমন ছিল বিলাসী তেমনই ছিল লম্পট। সে নির্দেশ দিল, যখনই কোন মেয়েকে বিবাহ দেয়া হবে তখন সর্বপ্রথম সেই বিবাহিতা মেয়ে আমার সহবাসে থাকবে; তৎপর আমার অনুমতি নিয়ে স্বামীর সহবাসে যাবে। য়্যাহুদীগণ তার এই নির্দেশ মান্য করতে পেরেছিল; কিন্তু যখন আউস ও খয়রজদের পালা আসল তখন তারা এটা মানতে সম্মত হল না। সেই সময় মালিক ইবন 'আজলান নামক এক ব্যক্তি তাদের সরদার ছিল। তার ভগ্নির বিবাহ হল। বিবাহের দিন সেই ভগ্নিটি অতি নির্লজ্জভাবে বেপর্দা হয়ে তার সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করল। মালিক রাগান্বিত হয়ে ভগ্নিকে ধমক দিল। তখন ভগ্নিটি বলল, "কাল ফউনের সাথে যা হবে তা এটা অপেক্ষাও কি অধিক নির্লজ্জতা? এই উত্তরে মালিকের অন্তরে ভয়ানক আঘাত লাগল।

পরদিন যথারীতি মালিকের ভগ্নি প্রসাধিত ও সুসজ্জিত হয়ে ফইউনের ঘরে গেল। মালিকও মেয়েদের পোশাক পরিধান করে ছদ্মবেশে নতুন বিবাহিত কন্যার সাথীরূপে গেল এবং সুযোগ মত পাষণ্ড ফইউনকে হত্যা করে সিরিয়া দেশে পলায়ন করল। তখন সিরিয়া দেশে গাস্স্সারীদের রাজত্ব ছিল। আবু জবল্লা ছিলেন সিরিয়ার রাজা। ফইউনের কুকীর্তি ও তাকে হত্যা করার সমস্ত ঘটনা মালিক তাকে জানাল।

Biography of the Holy Prophet Muhammad (PBUH) in Bengali
মহানবী সঃ এর জীবনী (বাংলা)

আবু জবল্লা এই ঘটনা শুনে রাগান্বিত হয়ে বিরাট সৈন্য বাহিনী নিয়ে মদীনায় এসে উপস্থিত হলেন। তিনি প্রথমে আউস ও খযরজদেরকে নিমন্ত্রন করে এনে অতি মূল্যবান পুরষ্কার দিয়ে তাঁদেরকে সম্মানিত করলেন। পরে য়‍্যাতুদীদেরকে নিমন্ত্রণ করলেন। য়‍্যাচুদী সরদারগণ পুরস্কার পাবার লোভে সকলেই যেয়ে সমবেত হল। সুচতুর আবু জবল্লা তাদেরকে প্রতারিত করে একে একে সমস্তকেই হত্যা করে ফেললেন। এতে য়‍্যাহুদী সম্প্রদায় অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ল এবং আউস ও খযরজগণ শক্তিশালী হয়ে উঠল।

আইস ও খযরজদের গৃহকলহ

ক্রমোন্নত আউস্ ও খয়রজগণ বহু দিন যাবত একতাদ্ধভাবে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে লাগল। মদীনা এবং তার আশপাশে তারা অনেক দুর্গ নির্মাণ করল। কিন্তু নির্বিবাদে আর কত থাকা যায়? শীঘ্রই আউস্ ও খযরজের মধ্যে দলাদলি ও গৃহ-কলহ আরম্ভ হয়ে গেল। বহু যুদ্ধ বিগ্রহ হল। তাদের সর্বশেষ যুদ্ধের নাম কু'আস সমর। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের প্রসিদ্ধ বীর পুরুষগণ সকলেই তরবারিতলে প্রাণ দিল। শেষ পর্যন্ত আউস্লণ পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হল।

আউস্ ও খযরজ এই উভয় গোত্র পৌত্তলিক ছিল। কিন্তু য়‍্যাহ্দীদের সাহচর্যে থাকার কারণে তওহীদ নবুওয়ত ও আসমানী কিতাব তাদের অবিদিত ছিল না। য়‍্যাহুদীদের মধ্যে লেখা-পড়ার চর্চা ছিল। মদীনায় 'বায়তুল মাদারিস' নামে তাদের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠা ছিল। এই শিক্ষাগারে তওরাতের শিক্ষা দেওয়া হত। আর আউস্ ও খযরজদের মধ্যে শিক্ষার কোন চর্চাই ছিল না। সুতরাং শিক্ষার দিক দিয়ে যে য়‍্যাহুদীদের মর্যাদা উচ্চ, তারা চিরদিনই স্বীকার করত। সুতরাং য়্যাচুদীগণ কিতাব দেখে যা বলত, তারা এটা মনোযোগের সাথে শ্রবণ করত এবং এটা নিয়ে পরস্পর আলোচনা করত।

আউস্ ও খযরজগণ য়‍্যাহুদীদের নিকট একথাগুলো চিরদিনই শুনে আসতেছেঃ ফারানে (মক্কায়) একজন নবী আবির্ভূত হবেন। সালু'আ (মদীনা) তাঁর নামের জয়ধ্বনিতে পরিপূর্ণ হবে। ইস্রাঈল বংশে বহু নবী আর্বিভূত হয়ে গিয়েছেন। এখন ইসমাঈল বংশ হতে আর একজন নবী আবির্ভূত হবেন। য়‍্যাহ্দীগণ তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয়ে যুদ্ধ করবে, পৌত্তলিকদেরকে ধ্বংস করবে।

পরাজিত আউসগণ ও খযরজদের নিকট হতে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আবার যুদ্ধ করবে। কুরায়শদের সাথে চুক্তি করে শক্তি সঞ্চয় করার উদ্দেশ্যে তারা এক দল প্রতিনিধি মক্কায় প্রেরণ করল। প্রতিনিধি দল যখন মক্কায় পৌঁছিল তখন রাসূল (সাঃ) তাদের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, "আমার নিকট এমন বস্তু আছে যাতে তোমাদের পরম কল্যাণ সাধিত হবে। তোমরা কি তা গ্রহণ করবে?" তারা বলল, "কি বস্তু?" তিনি বললেন, "আমি আল্লাহর রাসূল, আমার প্রতি আল্লাহর কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে। শিরক্, পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর 'ইবাদত করার জন্য আমি লোকদেরকে আহ্বান করি।" তৎপর তিনি তাদেরকে কুরআন পড়ে শুনালেন এবং ইসলামের সারমর্ম বুঝিয়ে দিলেন।

তখন এ দলের ইয়াস ইব্‌ন মু'আফ নামক একজন সদস্য সাথীদেরকে বললেন, "ভ্রাতাগণ, তোমরা যে উদ্দেশ্যে এসেছ এটা তা অপেক্ষা উত্তম কাজ।" আর এই কথা বলা মাত্রই দলপতি আবুল হায়স্ ইয়াসের মুখে এক মুষ্টি কঙ্কর নিক্ষেপ করে বলল, "বোকা চুপ থাক, আমরা এ কাজের জন্য আসি নি।"

দলপতির অসন্তুষ্টি দেখে ইয়াস এবং তার সাথিগণ কেউ প্রকাশ্যে ঈমান আনল না। কিন্তু কুরায়শদের সাথে চুক্তি করাও হল না। মক্কা হতে প্রত্যাবর্তন করার কিছু দিন পরেই ইয়াস ইহলোক পরিত্যাগ করল। মৃত্যুর সময় তাঁর মুখ হতে তত্ত্বীর ও লা-লাইলা ইল্লাল্লাহু-এর ধ্বনি বের হচ্ছিল।

সুয়ায়দের কথা আমরা পূর্বেই বর্ণনা করেছি। ইসলাম গ্রহণ করে তিনি মদীনায় ফিরার পর বু'আস্ সমরে নিহত হন। মোটকথা সুয়ায়দ, ইয়াস ও তার সাথীদের কারণে ইসলাম ও রাসূল (সাঃ)-এর কথা আনসারদের অবিদিত ছিল না।

মদীনায় ইসলাম প্রচার

প্রতি বৎসরই রাসূল (সাঃ) হজ্জের মৌসুমে বিভিন্ন গোত্রের যাত্রীদের নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম প্রচার করতেন। এবার (নবুওয়াতের একাদশ সনে) ও তিনি যথারীতি প্রচার করতে লাগলেন। মক্কার অনতি দূরে 'হিরা' ও 'মিনা'-এর মধ্যস্থলে অবস্থিত 'আকাবা নামক একটি স্থান আছে। রাসূল (সাঃ) সেস্থানে কয়েকজন লোক দেখতে পেলেন। পরিচয় জিজ্ঞেস করে তিনি জানতে পারলেন যে, এরা মদীনাবাসী খযরজ বংশীয় লোক। রাসূল (সাঃ) তাঁদের নিকট ইসলাম প্রচার করলেন, কুরআন পাঠ করে শুনালেন এবং ইসলাম গ্রহণ করার জন্য তাঁদেরকে আহ্বান জানালেন।

তাঁরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলেন যে, ইনিই ত সেই নবী যাঁর কথা আমরা সর্বদা য়‍্যাহ্দীদের নিকট শুনে আসতেছি। য়‍্যাহুদীদের পূর্বে আমরা তাঁর চরণতলে নিজেদেরকে উৎসর্গ করে যাওয়া বাঞ্ছনীয়। ফলত তাঁরা সকলেই হযরতের নিকট ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁরা মদীনায় ফিরে ইসলাম প্রচার করতে লাগলেন। তাঁদের চেষ্টায় মদীনায় ও তৎপার্শ্ববর্তী পল্লীসমূহে ঘরে ঘরে ইসলামের চর্চা আরম্ভ হয়ে গেল। এই সৌভাগ্যশালী মহাত্মাদের নাম এই-

১. তায়হানের পুত্র আবুল হায়সাম: ইনি আউস বংশোদ্ভূত।

২. যুবারার পুত্র আবু উমামা আস্'আদ: ইনি খযরজ বংশের বনু নজ্জার গোত্রের তরুণ যুবক। সাহাবীদের মধ্যে ইনিই সর্বপ্রথম (১লা হিজরী সনে) পরলোক গমন করেন এবং জান্নাতুল বাকী' নামক কবরস্থানে সমাধিস্থ হন।

৩. হারিসের পূত্র 'আওফঃ ইনি বদর যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।

৪. মালিকের পুত্র রাফি': বিগত দশ বৎসরে যে পরিমাণ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল, রাসূল (সাঃ) তার এক ফর্দ নকল করে তার হাতে সমর্পণ করেছিলেন। মদীনায় কুর'আন প্রচার কালে ইনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন। তজ্জন্য রাসূল (সাঃ) তাঁর প্রতি অতিশয় সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। অবশেষে ইনি ওহুদ যুদ্ধে শাহাদতপ্রাপ্ত হয়ে অমরত্ব লাভ করেন।

৫. 'আমিরের পুত্র কুৎত্বা: ইনি 'আকাবার তিন বয়'অতে (শপথ গ্রহণে) অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

৬. 'আব্দুল্লাহ ইব্‌ন রবারের পুত্র জাবির: ইনি 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমরের পুত্র জাবির নন। ইনিও একনজন প্রসিদ্ধ সাহাবী ছিলেন। বদরযুদ্ধে তিনিও অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

তাঁরা মদীনার লোকদেরকে বলতেন-নিখিল বিশ্ব যে-মহানবীর প্রতীক্ষা করতেছে, আমরা স্বচক্ষে তাঁর চরণ মুবারক দর্শন এবং স্বকর্ণে তাঁর মুখ নিঃসৃত পবিত্র বাণী শ্রবণ করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি আমাদেরকে ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের মালিক, সর্ব শক্তিমান, চিরঞ্জীব আল্লাহর সাথে সংযোগ করে দিয়েছেন। এখন আমাদের নিকট পার্থিব জীবনের কিছুই মূল্য নেই। আমাদের জন্য জীবন মরণ সব সমান।

নবুওয়াতের দ্বাদশ বৎসর

'আকাবার প্রথম বয়'আত নানা প্রতিকূল অবস্থার ভিতর দিয়ে একটি বৎসর অতিবাহিত হয়ে গেল। আবার হজ্জের মৌসুম এসে উপস্থিত হল। প্রচার কার্যের সুযোগ এবং দেশ-বিদেশের বার্তা জানার সময় আসন্ন। তাই রাসূল (সাঃ) সতৃষ্ণ নয়নে হজ্জযাত্রী কাফেলার পথপানে চেয়ে রইলেন। দেশ-দেশান্তর হতে কাফেলা আসতে লাগল। তিনি যথারীতি ইসলামের তবলীগ আরম্ভ করে দিলেন। 

গত বৎসর যাঁরা 'আকাবা নামক স্থানে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এবারও তাঁদের কাফেলা এসে হাযির হল। "ত বৎসরের সমস্ত লোক আসেন নি সত্য; কিন্তু এবার তাঁরা আরও কতজন নতুন লোক নিয়ে আসছেন। এবার যাঁরা নতুন, তাঁরা প্রত্যেকেই মদীনার এক একটি গোত্রের পক্ষ হতে প্রেরিত হয়ে আসছেন। তারা গত বৎসরের ন্যায় এবারও 'আলাধা নামক স্থানে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। রাসূল (সাঃ) ও তাঁদের নিকট হতে প্রতিজ্ঞা গ্রংগ করলেন। এটাই 'আকাবার প্রথম বয়'আত বা প্রতিজ্ঞা বলে প্রসিদ্ধ। এবার যাঁরা বয়'আত বা প্রতিজ্ঞা করলেন তাঁদের মোট সংখ্যা বারজন। কি কি বিষয়ের প্রতিজ্ঞা গ্রহন করা হল তা পরে বর্ণিত হবে।

শপথ গ্রহণের পর যখন তাঁরা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করার সংকল্প করলেন, তখন তাঁরা রাসূল (সাঃ)-এর খিদমতে আরয করলেন, "হুযূর, আমাদেরকে কুরআন পড়াতে পারেন এমন একজন লোক আমাদের সাথে প্রেরণ করলে খুবই ভাল হত।" রাসূল (সাঃ) তখন হযরত মুস'আব ইবন 'উমায়রকে তাঁদের সাথে প্রেরণ করলেন। মুস'আব ছিলেন অতি ভোগ-বিলাসে লালিত পালিত, আদরের দুলাল। তাঁর পিতা ছিলেন অগাধ ধন-সম্পত্তির অধিকারী। শত শত টাকা মূল্যের পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে যখন তিনি মক্কার পথে বের হতেন, তখন তাঁর জাঁকজমক দেখে সকলেই স্তদ্ভিদ হয়ে থাকত।

কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর আজ তিনি পথের কাঙ্গাল। যখন তিনি কুরআনের শিক্ষকরূপে মদীনায় প্রেরিত হন তখন তাঁর মাত্র একখানা ছেঁড়া কাপড়। একবার রাসূল (সাঃ) তাঁকে এই দরিদ্রাবস্থায় দেখে কেঁদে ফেললেন। এই মুস'আব (রাঃ) ওছদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। তাঁর পরিধানের বস্ত্র ব্যতীত কাফনের জন্য অন্য কোন কাপড়ের ব্যবস্থা ছিল না। তাও এত ছোট ছিল যে, মাথার দিক ঢাকলে পা বের হয়ে যেত, আর পায়ের দিকে টানলে মাথা খুলে যেতে। রাসূল (সাঃ) বললেন, "কতগুলো ইযখর ঘাস দ্বারা পদদ্বয় ঢেকে তাঁকে দাফন কর।

মদীনায় যে বারজন লোক এবার 'আকাবায় রাসূল (সাঃ)-এর হাতে বয়'আত করলেন, তাঁদের নাম এইঃ

১ . যুরারার পুত্র আবু উমামা আসআদ: গত বৎসর 'আকাবায় যে ছয়জন ইসলাম গহণ করেছিলেন, ইনি তাঁদের অন্যতম।

২. হারিসের পুত্র 'আওফ ইনিও গত বৎসরের ছয় জনের অন্যতম।

৩. হারিসের পুত্র মু'আয। ৪. মালিকের পুত্র রাফি'ঃ রইনিও ছয়জনের অন্যতম।

৫. 'আবদ কায়েসের পুত্র যকওয়ান: ইনি হযরত মুস'আবের সাথে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেননি। রাসূল (সাঃ) এর খিদমতে মক্কাতেই রইলেন, পরে ১৩ হিজরীতে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে হিজরত করে মদীনায় যান। এজন্য তাঁকে 'মুহাজির আনসারী' বলা হয়

৬. সামিতের পুত্র 'উবাদা। 

৭. 'উবাদার পুত্র 'আব্বাস্। 

৮. সা'লাবা : ইনি বন্ সালিম গোত্রের লোক।

৯. 'আমিরের পুত্র 'উব্বা। 

১০. 'আমিরের পুত্র কুৎবা: ইনিও ছয় জনের অন্যতম।

১১. আবুল হায়সাম: ইনিও ছয়জনের মধ্যে অন্যতম।

১২. সা'ইদার পুত্র 'উয়ায়ম। ইনি বনু 'আমর ইবন 'আওফ গোত্রের লোক।

যে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে রাসূল (সাঃ) তাদেরকে ইসলামের খিদমতে দীক্ষিত করেছিলেন, তা এইঃ

১. আল্লাহর সাথে কাউকেও অংশী সাব্যস্ত করবে না।

২. চুরি করবে না। 

৩. ব্যভিচার করবে না। 

৪. নিজ সন্তানদেরকে কোন অবস্থাতেই হত্যা করবে না।

৫. কারও প্রতি মিথ্যা দোষারোপ কিংবা কারও চরিত্রে কলঙ্ক আরোপ করবে না।

৬. আমি যেই সৎকাজের নির্দেশ দেই তা অমান্য করবে না।

মদীনায় প্রচারক প্রেরণ: যাওয়ান (রাঃ) কে ছাড়া অবশিষ্ট এগারজন ভক্তকে নিয়ে হযরত মুস'আব মদীনাভিমুখে যাত্রা করলেন। পবিত্র কুর'আনে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। তিনি মদীনায় পৌঁছায়ে যুরারার পুত্র আস্' আদের গৃহে অবস্থান করতে লাগলেন। মদীনার লোকেরা তাঁকে 'আল-মুন্ত্রী' বা কুরআনের অধ্যাপক বলে সম্বোধন করত ভক্তগণ পূর্ণভাবেই প্রতিজ্ঞা পালন করে চলতে লাগলেন। মুষ্টিমেয় মুসলমানের চরিত্র প্রভাব আন্সার সম্প্রদায়ের হৃদয়ে ক্রমান্বয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে লাগল। বাস্তবিক মৌখিক ও'আয় অপেক্ষা আদর্শগত আনুষ্ঠানিক প্রচারই সমধিক কার্যকর ও মর্মস্পর্শী হয়ে থাকে। সুতরাং তাঁদের চরিত্রের পবিত্রতা ও মহত্ত্ব দর্শনে মদীনাবাসিগণ অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ল।

হযরত মুস'আব ও আস্'অদের চেষ্টায় আউস ও খযরজ বংশে ইসলামের দ্রুত প্রসার লাভ করতে লাগল। মুস'আব (রাঃ) আস্'আদ এর বাসভবনে মুসলমানদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতেন এবং ইমামত করতেন। আর অবশিষ্ট সময়ে আন্সারদের প্রতি ঘরে ঘরে উপস্থিত হয়ে কুরআন ও ও'আয শুনাতেন। ফলে প্রত্যহ দুই এক জন করে মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে লাগল।

আউস ও খযরজ বংশে প্রসিদ্ধ ও প্রতিপত্তিশালী দুইজন সরদার ছিলেন। এক জনের নাম সা'আদ ইবন মু'আয, অপদ জনের নাম উসায়দ বিন হুযায়র। তাঁরা যখন জানতে পারলেন যে, মক্কা হতে জনৈক ব্যক্তি এলে এখানে নূতন ধর্ম প্রচণ্ড করছে। তখন সা'আদ উসায়দকে বললেন, সমাজের প্রতি একটু লক্ষ্য রাখ; এ উদাসীন থাকলে চলে কিরূপে? এ সেখ, মক্ক হতে জনৈক ব্যক্তি এসে আমার খালাতু 'ভাই আসু'আদকে সাথে নিয়ে সমাজের কি সর্বনাশ করতেছে। তারা এই সমপ্ত সরদ প্রাণ বোকাদেরকে ফুসলিয়ে ধর্মচ্যুত করতেছে এবং সমাজে একটা নূতন বিপ্লবের বীজ বপন করতেছে। ভাই, যাও, তাঁদেরকে একটু ভাল করে শাসিয়ে দিয়ে এসো। তারা যেন আমাদের এখানে আর কখনও না আসে। তাদের সাথে এই নচ্ছার মাসতুতো ভাইটা না থাকলে আমি নিজেই যেতাম।

উসায়দের ইসলাম গ্রহণ

উসায়দ অস্ত্রশস্ত্র সুসজ্জিত হয়ে তৎক্ষণাৎ আস'আদের বাড়ীর দিকে রয়ানা হলেন। তাঁকে আসতে দেখে আস'আদ (রাঃ) হযরত মুস্'আবকে বললেন, এই যে, আমাদের গোত্রের সরদার আসতেছেন। তিনি যদি আপনার কথা মেনে যান তরে বড়ই ভাল হবে। এই কথা বলতে না বলতেই উসায়দ এসে হাযির হলেন। তিনি দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে হযরত মুস'আব (রাঃ)-কে কর্কশ ভাষায় তিরস্কার করতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন- "শীঘ্র মদীনা ছেড়ে চলে যাও, নতুবা ভাল হবে না।"

হযরত মুস'আব (রাঃ) তদুত্তরে ধীরে ধীরে অতি নম্রস্বরে বলতে লাগলেন, "জনাব, আসুন, বসুন। আমাদের বক্তব্য শুনুন, তারপর যদি কোন অন্যায় দেখেন তখন যা ইচ্ছা বলবেন।"

মুস'আবের এরূপ নম্র ও ভদ্র ব্যবহার দেখে উসায়দ খানিকটা অপ্রতিত হয়ে আসন গ্রহণ করলেন। হযরত মুস'আব (রাঃ) ইসলামের মহিমা ব্যাখ্যা করতে লাগলেন এবং মাঝে মাঝে সুললিত কন্ঠে পবিত্র কুরআনের আয়াত পাঠ করে শুনাতে লাগলেন। তাঁর মধুর ও'আযে উসায়দের মন গলে গেল। তিনি পবিত্র ইসলামের মহত্ত্বে ভাব বিহবল হয়ে বলতে লাগলেন, "আচ্ছা, যদি কেউ ইসলাম গ্রহণ করতে চায় তবে তাকে কি করতে হয়?"

হযরত মুসআব (রাঃ) বললেনঃ "অযু ও গোসল করত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাক পোষাক পরিচ্ছদ পরিধান করে। "কালিমাতায়্যিবা' পাঠ পূর্বক দুই রাক'আত নফল নামায পড়তে হয়।" উসায়দ তৎক্ষণাৎ অযু ও গোসল করে কালিমা। তায়্যিবা পড়লেন। তৎপর দুই রাক'আত নামায পড়ে বললেন, "আর একজন লোক আমার পিছনে রয়েছেন। তিনিও যদি ইসলাম গ্রহন করেন তবে মদীনায় হয়ত আর কেউ তোমাদের বিরুদ্ধাচরণ করতে সাহসী হবে না। আমি যেয়ে এখনই তাঁকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।"

এদিকে সরদার সা'আদ উসায়দের পথপানে চেয়ে বসে আছেন। উসায়দ যখন ফিরে আসলেন তখন তাঁর হাবভাব দেখে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, "বিষয় কি? কি হল? উসায়দ আপাতত তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করা সমীচীন মনে করলেন না। তিনি বললেন, "আমি ত যা বলবার, তা বলে আসছি। কিন্তু আপনি না গেলে কাজ হবে না।

সা'আদের ইসলাম গ্রহণ

সা'আদ ক্রুব্ধ হয়ে উঠলেন। অতি উগ্র মূর্তি ধারণ করে তিনি তৎক্ষণাৎ আস'আদের গৃহাভিমুখে ধাবিত হলেন। তথায় পৌঁছিয়ে তিনি বলতে লাগলেন, "সাবধান, তোমরা আমাদের এই সমস্ত নিরীহ প্রজাকে কুপরামর্শ দিয়ে পথভ্রষ্ট করলে ভাল হবে না। অতি শীঘ্র এখান হতে চলে যাও। "তৎপর তিনি তাঁর মাসতুতো ভ্রাতা আস'আদকে লক্ষ্য করে বললেন, "কিহে আস'আদ, এসব কি হচ্ছে? তোমার সাথে যদি আমার রক্তের সম্বন্ধ না থাকত, তবে আমি এখন তোমাকে কঠোর শাস্তি প্রদান করতাম। জুয়া চুরির ফাঁদ পেতে আমাদের বোকা লোকগুলোর সর্বনাশ করতে বসেছো তোমরা।"

হযরত আস'আদ চুপে হযরত মুস'আবকে বললেন, "ইনিই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সরদার। তাঁকে সত্যের মর্ম বুঝিয়ে দিতে পারলে আর কোনই প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।"

হযরত মুস'আব তাঁকে আর অধিক দূর অগ্রসর হতে দিলেন না। তিনি নিজের ন্যায়নিষ্ঠ ও নম্র ব্যবহার দ্বারা তাঁকে অতি শীঘ্রই নরম করে ফেললেন। মুস'আব বললেন, "জনাব, রাগারাগির কোনই প্রয়োজনীয়তা নেই, আপনি তশরীফ রাখুন, আমরা কি বলতেছি, তা শুনুন। আমাদের কথা শুনে যদি আপনার পছন্দ হয় তবে আপনি তা গ্রহণ করবেন। অন্যথায় আপনি যা বলেন, আমরা তাই করব।"

তিনি প্রকৃতিস্থ হয়ে আসন গ্রহণ করলেন। হযরত মুস'আব যথারীতি ইসলামের মর্ম বুঝাতে লাগলেন, সাথে সাথে কুরআন পাঠ করে শুনাতে লাগলেন। ও'আয শুনে সা'আদ ও উসায়দের ন্যায় অযু ও গোসলের পর 'কালিমা তায়্যিবা' পড়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং দুই রাকআত নামায পড়ে গৃহাভিমুখে প্রস্থান করলেন।

আশ্হল গোত্রের ইসলাম গ্রহণ

হযরত সা'আদ বিন মু'আয (রাঃ) গৃহে ফেরে দেখতে পেলেন, "সভাগৃহ লোক লোকারণ্য।" তিনি মুসলমানদের সম্বন্ধে কি মীমাংসা করে আসেন, তা জানার জন্য তাঁর গোত্রের সমস্ত লোক সমবেত হয়ে আছেন। তিনি সভাগৃহে উপস্থিত হয়ে নিজেই সমবেত লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আমার গোত্র, তোমরা সত্য করে বল, আমি কেমন লোক?” এই প্রশ্নের উত্তরে চতুর্দিক হতে সমস্বরে উত্তর আসল, "আপনি আমাদের সরদার এবং ভক্তিভাজন দলপতি। আপনার জানের গভীরতা এবং সিদ্ধান্তের সমীচীনতার প্রতি আমাদের অটল বিশ্বাস আছে। আপনার সদ্ব্যবহার ও ন্যায়নিষ্ঠা সর্বজন বিদিত।" সা'আদ (রাঃ) বললেন, "যদি তাই হয় তবে শুন, পৌত্তলিকতা এবং এই অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের সাথে আজ হতে আমার আর কোন সম্বন্ধ নেই। আমার গোত্রের যে কোন ব্যক্তি অনাদি অনন্ত সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর প্রেরিত মহাপুরুষ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর প্রতি ঈমান না আনবে, তার সাথে কথাবলা আমার জন্য হারাম। সা'আদের এই কঠোর প্রতিজ্ঞার কথা শুনে আশ্হল গোত্রের সমস্ত নর-নারী সেই দিন সুর্যাস্তের পূর্বেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করলেন। হযরত মুস'আবের (রাঃ) চেষ্টায় আনসারদের সকল গোত্রেই এইভাবে ইসলাম দ্রুত প্রসার লাভ করতে লাগল।

নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বৎসর

'আকাবার দ্বিতীয় রয়ঃআতঃ

এভাবে আরও একটি বৎসর চলে গেল। আবার হজ্জের সময় এসে পৌঁছল। হযরত মুস'আব (রাঃ)-এর চেষ্টায় যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই রাসূল (সাঃ)-এর চরণ দর্শনের জন্য উন্মত্ত হয়ে উঠল। রাসূল (সাঃ)-কে কোন প্রকারে যদি মদীনায় নিয়ে আসা যায় তবে সর্বদা আমরা তাঁর সংসর্গে থেকে পূর্ণ মনুষ্যত্ব লাভ করতে সক্ষম হব, এসব চিন্তা করে রাসূল (সাঃ)-কে মদীনায় আগমনের অনুরোধ জানাবার বাসনায় প্রত্যেক গোত্রের প্রধান প্রধান মুসলমানগণ এবার মক্কা যাত্রার আয়োজন করলেন।

মদীনা হতে এক বিরাট কাফেলা হজ্জব্রত পালনার্থ মক্কায় যাত্রা করল। মুসলমানদের মধ্য হতে তেহাত্তর জন পুরুষ এবং দুইজন মহিলাও এই কাফেলায় যোগদান করলেন। মক্কায় এসে তাঁরা সকলে আত্মগোপন করে রইলেন। পেছনে কুরায়শগণ জানতে পেরে একটা অনর্থের সৃষ্টি করে, এই আশঙ্কায় তাঁরা গোপনে গোপনে রাসূল (সাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার ব্যবস্থা করলেন। তাঁদের আগমনের সংবাদ পেয়ে রাসূল (সাঃ) অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। স্থির হল যে, গভীর রাত্রে গত বৎসরের স্থানে 'আকাবার প্রান্তদেশে সমবেত হবেন খাজা আবূ তালিবের মৃত্যুর পর রাসূল (সাঃ)-এর অপর চাচা হযরত 'আব্বাসই ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়। তিনিও আবু তালিবের ন্যায় তখনও ইসলাম গ্রহণ করেন নি, তথাপি রাসূল (সাঃ)-কে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতেন। এজন্যই রাসূল (সাঃ) ১২ যিলহজ্জ (নবুওয়তের ত্রয়োদশ বৎসর) তারিখে তাঁকে সাথে নিয়ে নীরবে 'আকাবায় উপস্থিত হলেন। পরে কুরায়শগণ এই গোপন মাহফিলের খবর পেয়ে কোন অশান্তির সৃষ্টি করে, এই আশঙ্কায়ই হযরত 'আব্বাস তাঁর সাথে গিয়েছিলেন। মদীনাবাসী মুসলমানগণও তাঁদের সহযাত্রী কাফিরদের অগোচরে একে একে সবাই এসে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হলেন।

সমবেত সভায় সর্বপ্রথম হযরত 'আব্বাসই আলোচনা আরম্ব করলেন। তিনি মদীনাবাসী মুসলমানদেরকে সম্বোধন করে বললেন, "হে আওস ও খযরজগণ, আপনারা মুহাম্মদ (সাঃ)-কে মদীনায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন; কিন্তু এটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। এ সম্বন্ধে আপনারা সুষ্ঠুভাবে চিন্তা করে দেখুন। তাঁকে নিয়ে গেলে আপনাদেরকে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। এতে হয়ত মক্কা কোপিত হয়ে আপনাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে। তখন যদি বিপদ দেখে আপনারা পিছনে সরে দাঁড়ান, তবে তা এখনই বলুন।

হযরত 'আব্বাসের কথার কোন উত্তর তাঁরা দিলেন না। রাসূল (সাঃ। কি বলেন, তা শুনার জন্য সকলেই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেন। তখন রাসূল (সাঃ) আল্লাহর পয়গাম পবিত্র কুরআন পাঠ করে শুনালেন। কুরআন শুনে উপস্থিত সকলের অন্তর ঈমানের নূরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তৎপর ইসলামের মাহাত্ম সম্পাকে সারগর্ভ উপদেশ দান করে বলতে লাগলেন, "আমি মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে তোমাদের সাথে মদীনায় যেতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু আমার নিকট তোমাদের এই প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, যেভাবে তোমরা নিজেদের পিতা, পুত্র ও অন্যান্য স্বজনগণকে সুখে দুঃখে বিপদে আপদে সাহায্য করে থাক, তদ্রূপ আমাকে এবং আমার সাথী মুহাজিরদেরকেও সাহায্য করতে হবে। আর সত্য ধর্ম নিজেদের ধন-সম্পদ এবং প্রাণ দিয়ে সাহায্য করতে হবে। এতে তোমরা সম্মত আছ কি?"

তখন তাঁরা আরজ করলেন-

"হুযূর, আমরা যদি ধনপ্রাণ সর্বস্ব আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে দেই, তবে তার প্রতিফল কি পাব?"

রাসূল (সাঃ) উত্তর করলেন- "তোমরা তার বিনিময়ে দোযখ হতে মুক্তি, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বেহেস্ত লাভ করবে।" তখন মদীনাবাসী মুসলমানদের পক্ষ হতে অবুল হায়সাম বললেন-"হুযূর, বর্তমানে মদীনার য্যায়দীদের সাথে আমাদের সন্ধি আছে। আপনার হাতে ব্যয়'আত গ্রহণ করার পর হয়ত তা আর থাকবে না। কিন্তু মুসলিম শক্তি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে আপনি যদি আমাদেরকে পরিত্যাগ করে স্বদেশে চলে আসেন, তখন আমাদের উপায় হবে কি?"

রাসুল (সাঃ) হাসিমুখে উত্তর করলেন-"কখনও এরূপ হবে না। আমরা তোমাদের তোমরা আমাদের। চিরদিন আমরা একসাথে থাকব, জীবন-মরণ সবকিছু আমাদের একসাথে হবে।"

বয়'আত

এই কথা শুনামাত্র ইসলামের প্রেমিকগণ উল্লাসিত হয়ে ইসলাম এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করতে প্রস্তুত হলেন। প্রতিজ্ঞা গ্রহণের জন্য ভক্তদের আগ্রহের সীমা রইল না। তাঁরা এসে রাসূল (সাঃ)-এর দস্ত মুবারক ধারণ করে বলতে লাগলেন, "আমরা ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা জীবন-যৌবন পরিবার-পরিজন যথাসর্বস্ব আল্লাহর নামে উৎসর্গ করলাম। সর্বপ্রথম হযরত বরা' বিন মা'রূর (রাঃ) রাসূল (সাঃ)-এর হাতে বয়'আত করলেন। তৎপর অন্যান্য সকলেও তাঁর অনুসরণ করলেন।

যখন তাঁরা রাসূল (সাঃ)-এর দস্ত মুবারক ধারণ করে প্রতিজ্ঞা করতে প্রস্তুত হলেন তখন সা'আদ; বিন যুরারা (রাঃ) দাঁড়ায়ে বললেন, "হে ভ্রাতঃগণ, ক্ষান্ত হও; তোমরা কি প্রতিজ্ঞা করতেছ তা আরও একবার ভালরূপে চিন্তা করে দেখে নাও। তোমাদের এই প্রতিজ্ঞার ফলে আরব, অনারব, জিন, মানুষ সকলেই তোমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়াবে। এই প্রতিজ্ঞা ফলত সারা জাহানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার প্রতিজ্ঞা। যদি তোমাদের বুকে প্রতিজ্ঞা রক্ষার মত শক্তি ও সাহস থাকে তবে অগ্রসর হও, বিসমিল্লাহ বলে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ কর, অন্যথায় এখনই সরে থাকা ভাল।"

আনসার বাহিনী ধীরে গম্ভীরস্বরে উত্তর করল, "আমরা প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য সর্বান্তঃকরণে প্রস্তুত আছি।"

তৎপর 'উবাদার পুত্র 'আব্বাস আনসারী (রাঃ) তাঁদেরকে সম্বোধন করে বললেন, "হে খযরজগণ এটা অত্যন্ত কঠিন প্রতিজ্ঞা। এর ফরে তোমরা রোম ও পারস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে; তোমাদের উপার্জিত ধন-সম্পদ সর্বস্ব অকাতরে বিলিয়ে দিতে হবে। তোমাদের অনেক সম্ভ্রান্ত সরদারদের গলায় চুরি পড়বে। তখন যদি অবিচলিত থেকে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পার তবে হাত বাড়াও প্রতিজ্ঞা কর, সর্বাগ্রে ইহ-পরকালের সর্বপ্রকার মঙ্গল লাভ কর।"

সকলে ভক্তি বিজাড়িত কণ্ঠে উত্তর করলেন, "আমরা এসব কিছুর জন্যই প্রস্তুত আছি।" অতি আনন্দের সাথে সকলে বয়'আত গ্রহণ করলেন।

বার নকীব

বয়'আত বা শপথ গ্রহণ শেষ হলে রাসূল (সাঃ) বললেন, তোমরা তোমাদের মধ্য হতে বারজন লোককে প্রতিনিধি মনোনীত কর। তাঁরা হযরত 'ঈসার হাওয়ারীদের ন্যায় আমাকে কেন্দ্র করে সত্য প্রচার করবে। তাঁরা হযরত 'ঈসা (আঃ)-এর হাওয়ারী নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। আর তারা আমার নকীব নামে অভিহিত হবেন।

রাসূল (সাঃ)-এর আদেশক্রমে নিম্নলিখিত দ্বাদশ মহাত্মা তাঁর নকীব বা প্রচারক মনোনীত হলেন-

১. আস'আদ বিন যুরারা: ইনি মুস্আব-এর (রাঃ) সহকারী প্রচারক।

২ . রাফি' বিন মালিক: ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।

৩. 'উবাদা বিন সামিত: বহু হাদীসের বর্ণনাকারী। তারা তিন জন 'আকাবার প্রথম বাইয়াতেও অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

৪. সা'আদ বিন রবী': ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।

৫. মুনযির বিন 'আমর: মা'উনার যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।

৬. 'আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহাঃ প্রসিদ্ধ কবি ছিলেন, মৃতা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।

৭. বরা' নি মা'রূর: বয়'আতের সময় ইনিই বক্তৃতা করেছিলেন। রাসূল (সাঃ)-এর হিজরতের পূর্বেই তিনি পরলোক গমন করেন।

৮. 'আবদুল্লাহ বিন 'আমরঃ ওহুদ যুদ্ধে শহিদ হয়েছিলেন।

৯. সা'আদ বিন উবাদা: জনৈক প্রসিদ্ধ সাহাবী।

এই নয়জন সকলেই খায়রাজ বংশীয় নকীব।

১০। উসায়দ বিন হুযায়র: বু'আস যুদ্ধে তার পিতা আউস সংশের সরদার ছিলেন।

১১. আবুল হায়সাম

১২. সা'আদ বিন খায়সামা: তিনি একজন প্রসিদ্ধ সাহাবী বদর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।

তারা তিন জন আউস্ বংশীয় নকীব।

হজ্জ মৌসুমে রাসূল (সাঃ)-এর গতি বিধি লক্ষ্য করার জন্য কুরায়শদের চর লাগিয়েই থাকত। তাদের একটা শয়তান ঘুরতে ঘুরতে এ দিকে এসে উপস্থিত হল। রাসূল (সাঃ)-এর নিকট এত লোক সমাগম দেখে চীৎকার করে উঠল, মক্কাবাসিগণ ঐ দেখ, মুহাম্মদ (সাঃ) তার দলবল নিয়ে যুদ্ধের যড়যন্ত্র পাকাচ্ছেন।"

এ চীৎকার শুনে রাসূল (সাঃ) বললেন: ঐ শয়তানটাকে চীৎকার করতে দাও, তারা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। তখন 'আব্বাস বিন 'উবাদা (রাঃ) বললেন, "যদি হুযুরের অনুমতি পেতাম, তবে আমরা আজ প্রত্যুষেই মক্কা বাসীদেরকে তরবারির চাকচিক্য দেখাতাম।" রাসূল (সাঃ) বললেন না, আমি এখনও যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হই নি। এখন তোমরা স্বস্থানে প্রস্থান কর।"

মহানবী (সাঃ)-কে তাঁরা তাঁদের সাথে নিয়ে যাবার জন্য আবেদন করলেন; কিন্তু তিনি এতে সম্মত হলেন না। তিনি বললেন, "এখনও আমি হিজরত করার আদেশ পাই নি।"

মদীনার কাফেলা প্রত্যুষে উঠে প্রস্থানের আয়োজন করতে লাগল। এমন সময় এক দল কুরায়শ এসে তাঁদেরকে বলতে লাগলঃ তোমরা নাকি আমাদের এই লোকটিকে অর্থাৎ রাসূল (সাঃ)-কে তোমাদের দেশে নিয়ে গিয়ে আমাদের সাথে যুদ্ধ করার সংকল্প করেছ। অথচ তোমাদের সাথে আমাদের কোন শত্রুতা নেই। তবে তোমরা এরূপ করবে কেন?"

কাফেলার অমুসলমানগণ এবিষয়ে কিছুই জানত না। সুতরাং তারা বলল: এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা। কিন্তু তখন কাফেলা বহু দূরে চলে গিয়েছিল। ঘটনাক্রমে সা'আদ (রাঃ) এবং মুনযির পিছনে পড়ে গিয়েছিলেন। হযরত মুনযির অতি সর্তকতার সাথে পলায়ন করে আত্মরক্ষা করলেন। কিন্তু হযরত সা'আদকে তারা গ্রেফতার করে নিয়ে গেল এবং বেঁধে নির্মমভাবে প্রহার করতে লাগল। যুবায়র এবং হরিস নামক দুই ব্যক্তি বাণিজ্য উপলক্ষে মদীনায় গমন করলে হযরত সা'আদের আশ্রয় গ্রহণ করত। তারা এই দুঃসংবাদ পেয়ে অবিলম্বে হযরত সা'আদকে দুর্বৃত্তদের হাত হতে মুক্ত করে দিল।

কাফেলার লোকেরা হযরত সা'আদের বিপদের আশঙ্কায় মক্কার দিকে ফিরার সংকল্প করতেছিল। এমন সময় হযরত সা'আদ এসে উপস্থিত হলেন। কাফেলা মক্কাভিমুখে চলল। 'আকাবার এই দ্বিতীয় বয়'আত (শপথ) জগতের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যদি এই দিন মদীনাবাসিগণ সত্যের জন্য এমন করে যথাসর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তত না হতেন, তবে ইসলামের বিজয় অভিযান কোন পথ ধরে অগ্রসর হত তা কে জানে? জগতের সমস্ত কল্যাণ ও মুক্তির পথ রুদ্ধ প্রায় হয়ে আসতেছিল, পাপ অনাচারের স্রোতে সারা বিশ্ব ভেসে যাবার উপক্রম হয়েছিল; মদীনাবাসী মহাত্মগণই সেদিন ধরণীকে এই চরম অভিশাপ হতে রক্ষা করেছে। সত্যই তাঁরা আনসার বা সাহায্যকারী নামের পূর্ণ উপযোগী। তারা শুধু হযরতেরই সহায় নন, পুণ্য ও কল্যাণের সহায়। হে 'আকাবার সমবেত আনসার সম্প্রদায়, সার্থক তোমাদের 'আনসার' নাম; ধন্য তোমাদের নবী-প্রেম, ধন্য তোমাদের অটল সংকল্প।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url