বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনী (বাংলা)
সাহাবীগণ (রা)-এর হিজরত
হজ্জযাত্রী কাফেলা ভালভাবেই মদীনায় ফিরে গেল। মদীনাবাসীদের সাথে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একটা গোপন চুক্তি হয়ে গিয়েছে। তারা মুহাম্মদ (সাঃ)-কে অর্থ, সৈন্য, অস্ত্রশস্ত্র রসদ দিয়ে সাহায্য করতে প্রস্তুত। শীঘ্রই হয়ত যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার আশঙ্কা আছে, গুপ্তচরদের মুখে এই ধরনের সংবাদ পেয়ে কুরায়শগণ আবার উত্তেজিত হয়ে উঠল।
ফলে মক্কায় অবস্থানকারী মুসলমানদের উপর অত্যাচারের পাহাড় ভেঙ্গে পড়ল। আদরের মাতৃভূমি মক্কানগরী এখন তাঁদের জন্য একটা বিরাট অগ্নিকুণ্ডতুল্য মনে হতে লাগল। নামায, তিলাওয়াত ইত্যাদি যাবতীয় ধর্মানুষ্ঠান পালন করা তাঁদের জন্য একেবারে অসম্ভব হয়ে উঠল।
মদীনায় ইসলাম অনেকটা আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। দিন দিন তথায় ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়ে চলেছে। স্বাধীনভাবে ধর্ম কর্ম পালন করতে কোনপ্রকার অসুবিধা নেই। তাই রাসূল (সাঃ) মক্কাবাসী সাহাবীদেরকে মদীনায় হিজরত করা অনুমতি দিলেন।
মদীনায় গেলে শাস্তির সাথে আল্লাহর 'ইবাদত-বন্দেগী করতে পারবেন, এই আশায় তাঁদের প্রাণ উল্লাসে ভরে উঠল। গৃহসুখ আত্মীয়-স্বজন ধন-সম্পদ ও জন্মভূমির মায়া কাটায়ে সেবকগণ অম্লান বদনে মদীনায় চলে যেতে লাগলেন।
![]() |
| বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনী |
শিকারকে ছেড়ে দেয়ার পূর্বে তার প্রতি যে অহেতুক অত্যাচার করে লোকে যে রূপ আনন্দ পায়, সেই নির্মম আনন্দের লোভে কুরায়শগণ খুব মেতে উঠল। ভাবল, বে-দীন মুসলমানগণ যখন দেশ ছেড়ে চলেই যেতেছে, তখন যতটুকু পারা যায় তাদেরকে শিক্ষা দেয়াই উচিত। এই মনে করেই তারা পূর্ণোদ্যমে উৎপীড়নে প্রবৃত্ত হল। তখনকার নির্যাতন-কাহিনী শুনলে একদিকে যেমন পাষাণ হৃদয় পর্যন্তও থরথর করে কেঁপে উঠে, অপরদিকে তেমনি ধর্মবীর সাহাবীদের ধৈর্য, সত্যগ্রহ, আত্মত্যাগ ও মহত্ত্ব দেখে গৌরবে বুক ভরে উঠে।
মমবিদায়ক অত্যাচার
সর্বপ্রথম হযরত আবু সালামা তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামাকে সাথে নিয়ে মদীনাভিমুখে যাত্রা করলেন। হয়রত উম্মে সালামার ক্রোড়ে ছিল একটি দুগ্ধপাষ্য শিশু পুত্র। সংবাদ পেয়ে উভয়ের আত্মীয়-স্বজন তাঁদেরকে বাঁধা দেয়ার জন্য এসে হাযির হল। উম্মে সালামার অত্মীয়গণ আবু সালামাকে বলতে লাগল, "নরাধম, তুই জাহান্নামে যেতে চাস, যা। কিন্তু আমাদের উন্মে সালামাকে আমরা দিব কেন?" এই বলে তারা নকীল ধরে উটটিকে বসাল এবং উম্মে সালামার হাত ধরে আকর্ষণ করতে লাগল। ঠিক সেই সময়ই আবু সালামার স্বগোত্রের লোকে বলে উঠল: " পোড়াকপালে দুর্ভাগা, তোর যেখানে ইচ্ছা, যা; কিন্তু আমাদের বংশ-প্রদীপ এই অবোধ শিশুটিকে আমরা ছাড়ব কেন"? এই বলে তারা উম্মে সালামার বুক হতে শিশুটিকে কাড়িয়ে নিতে উদ্যত হল।
কি হৃদয়-বিদারক দৃশ্য। উম্মে সালামা একদিকে স্বামীর বস্ত্রাঞ্চল ধরিয়া, আর অন্যদিকে প্রাণপ্রতিম শিশু পুত্রকে আঁকড়ায়ে রেখে চীৎকার করতেছেন, আর আবু সালামা তাঁদেরকে রক্ষা করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু কাফিরদের পাষাণ হৃদয়ে বিন্দুমাত্রও দয়ার উদ্রেক হল না। তারা স্বামীর হাত হতে স্ত্রীকে এবং মাতার বুক হতে শিশুপুত্রকে ছিনায়ে নিয়ে গেল এবং আনন্দোচ্ছ্বাসে অট্টহাসি করে আকাশ-বাতাস মুখরিত করতে করতে গৃহাভিমুখে প্রস্থান করল।
হযরত আবূ সালামা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একদিকে সত্যের আহ্বান, অপরদিকে স্ত্রী পুত্রের আকর্ষণ' কোন দিকে যাবেন? কিছুক্ষণের জন্য তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। মুহূর্ত মধ্যেই তিনি প্রকৃতিস্থ হয়ে নিজের কর্তব্য নির্ধারণ করে নিলেন। তিনি ভাবলেনঃ "স্ত্রী-পুত্র আল্লাহর দান, আমিও আল্লাহর। আমাদের মঙ্গলামঙ্গল তাঁরই হাতে। সুতরাং তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়াই আমার সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রদান কর্তব্য। তাই তিনি একা উটের পিঠে আরোহণ করে মদীনাভিমুখে রওয়ানা হলেন।।
এদিকে উম্মে সালামা স্বামী-পুত্রের বিচ্ছেদ-বেদনায় একেবারে অস্থির হয়ে পড়লেন। যেস্থানে এই হৃদয়-বিদারক ব্যাপার সংঘটিত হয়েছিল, প্রত্যহ বৈকাল বেলা তিনি সেস্থানে যেয়ে স্বামী ও পুত্রের কথা স্মরণ করে পাগলিনীর ন্যায় কান্নাকাটি করতে থাকতেন। পাষাণ হৃদয় কাফিরদের অন্তরে এতেও সামান্যতম দয়ার উদ্রেক হল না। তারা বলল, "মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ধর্ম পরিত্যাগ কর, তবে তুমি পুত্রের মুখ দেখতে পাবে"; কিন্তু উম্মে সালামার অন্তরে পুত্রাপেক্ষা ধর্মের দরদ অনেকখানি বেশী ছিল। তাই তিনি তাতে সম্মত হলেন না।
এভাবে পূর্ণ একটি বৎসর কেটে গেল। তখন উম্মে সালামার এক চাচাতো ভাইয়ের মনে একটুখানি দয়া আসল। সে উভয় গোত্রের লোকদের নিকট অনুরোধ করে পুত্র সন্তানসহ উম্মে সালামাকে ছেড়ে দিতে রাজী করল। উম্মে সালামা অবলা নারী, কোন দিন বাড়ীর বাইরে গমন করেন নি, মদীনার রাস্তা-ঘাট তাঁর চেনা নেই, পথের সম্বল নেই, সঙ্গের সাথী নেই। কোথায় যাবেন? কি করবেন? অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন যে, আমি যেই সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছি, তাঁর ক্ষমতার বাইরে কিছুই নেই। তিনি যখন আমার প্রাণপ্রতিম পুত্রকে আমার বুকে এনে দিয়েছেন, শত্রুদের কঠোর বন্দীখানা হতে আমাকে মুক্তি দিয়েছেন সবচাইতে প্রিয়বন্ধু আমার প্রাণের ধন পবিত্র ধর্ম সতীত্বকে রক্ষা করেছেন, তখন তিনিই আমাকে মদীনাও পৌঁছে দিবেন। এই ভেবে শিশু পুত্রকে নিয়ে উষ্ট্রে আরোহণ করত মদীনাভিমুখে রওয়ানা হলেন।
ফলে তাই হল। পথে 'উসমান বিন তালহা নামক এক ব্যক্তির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হল। 'উসমান আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার সাথে কে আছে?" তিনি বললেন, "আল্লাহ"। এই উত্তর শুনে 'উসমানের অন্তর কেঁপে উঠল। তিনি তাঁকে সাথে করে মদীনায় তাঁর স্বামীর নিকট পৌঁছে দিয়ে আসলেন। বাস্তবিক যে আল্লাহর প্রতি নির্ভর করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তার কর্মোদ্ধারের বিধান করে দেন। আবু সালামার পর একে একে প্রায় সকল সাহাবীই মদীনায় প্রস্থান করতে লাগলেন; কিন্তু যাত্রাকালে কুরায়শদের প্রতিরোধ ও অত্যাচার হতে কেউ নিষ্কৃতি পান নি।
সুহায়ব রূমীর প্রতি অত্যাচার
হযরত সুহায়ব রূমী (রাঃ) ব্যবসা বাণিজ্য করে প্রভৃত ধন-সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন। তিনি মদীনায় যাত্রা করতেন শুনে কুরায়শগণ সদলবলে তাঁর গৃহে সমবেত হয়ে বলতে লাগল, "তুমি আমাদের দেশে ব্যবসা করে আমাদের অর্থে ধনী হয়েছ। আজ এই সমস্ত ধন-সম্পদ নিয়ে তুমি মদিনায় পলায়ন করবে? এটা কিছুতেই হতে পারে না।"
কাফিরগণ ভাবতে লাগল, সারা জীবনের পরিশ্রমের ফল, রক্ত বিনিময়ে অর্জিত সম্পদ পরিত্যাগ করে যাওয়া অসম্ভব। তাই তারা বলল, "যদি যেতেই হয়, তবে এই ধন-সম্পত্তি সব কিছু আমাদের হাতে ছেড়ে যেতে হবে"।
ঈমানদারের নিকট ধর্মের তুলনায় ধন-সম্পদ অতি তুচ্ছ পদার্থ। তাই হযরত সুহায়ব বললেন, "আচ্ছা, আমি আমার যথাসর্বস্ব পরিত্যাগ করেই যাচ্ছি"। এই বলে তিনি উটের পিঠে আরোহণ করত মদীনাভিমুখে রয়ানা হলেন। আর মনে মনে ভাবতে লাগলেন-স্বাধীনভাবে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করতে পারা, এই ধন-সম্পদের চেয়ে অনেক উত্তম।
হযরত সুহায়বের এই ঘটনা শুনে রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন যে, এই ব্যবসায়ে সুহায়ব লাভবান হয়েছেন।
হিশাম ও 'আয়্যাশের প্রতি অত্যাচার
হযরত 'উমর (রাঃ) মদীনায় যেতে প্রস্তুত হলেন। হিশাম এবং 'আয়্যাশও তাঁর সাথে মদীনায় যেতে সংকল্প করলেন। স্থির হল যে, একটি নির্দিষ্ট স্থানে সকলে সমবেত হয়ে মদীনা যাত্রা করবেন, হযরত 'উমর ও হযরত 'আয়্যাশ নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছলেন; কিন্তু হিশাম কুরায়শদের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। এখন বিলম্ব করা সমীচীন নয় ভেবে হযরত 'উমর ও আয়্যাশ মদীনায় চলে গেলেন।
'আয়্যাশ ছিলেন আবু জাহলের বৈপিত্রের ভ্রাতা। এজন্য আবু জাহল ক্ষোভে অপমানে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগল। সে তার ভাই হারাসকে সাথে নিয়ে 'আয়্যাশের নিকট পৌঁছে বলল, দেখ ভাই 'আয়্যাশ, তোমার বিচ্ছেদ-শোকে মা একেবারে অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। তিনি কসম খেয়েছেন যে, তোমাকে না দেখা পর্যন্ত মাথায় চিরুণী লাগাবেন না এবং ছায়ায়ও বসবেন না। তাই, তুমি আমাদের সাথে চল। মাকে সান্ত্বনা দিয়ে আবার চলে এস।
হযরত 'উমর (রাঃ) বললেন, "আমার মনে হয়, ফাঁকি দিয়ে তোমাকে বিপন্ন করার কুমতলব নিয়ে তারা এসব কথা বলতেছে। তোমার যাওয়া উচিত নয়।" 'আয়্যাশ বললেন, "আচ্ছা, একবার যেয়ে মাকে একটু সান্ত্বনা দিয়ে আসব।" হযরত উমর বললেন, "যদি যেতেই হয় তবে আমার দ্রুতগামী উটটি নিয়ে যাও, কোন প্রকার অসুবিধা দেখলে এই উটটি ছুটায়ে মদীনায় চলে এস।"
'আয়্যাশ তাদের সাথে যখন মক্কার নিকটে যেয়ে পৌঁছলেন তখন আবূ হাজল তাঁকে বলল, "ভাই তোমার উটটি বসাও। আমাদের উট অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমরা একজন তোমার সাথে আরোহণ করব।" যখন তিনি উটটি বসালেন তখন তারা দুই জনে 'আয়্যাশকে ডেকে মোড়া বাঁধ দিয়ে উটের উপর করে নিয়ে চলল। আর পথে পথে লোকদেরকে বলতে লাগল-এই দেখ, যারা বিধর্মী হয়ে পলায়ে যায় তাদের বিচার এভাবে করতে হয়।
'আয়্যাশকেও হিশামের সাথে পায়ে বেড়ি লাগায়ে মক্কার কারাগারে নিক্ষেপ করা হল। বহুদিন পর্যন্ত তাঁরা এই বন্দীখানায় অমানুষিকভাবে অত্যাচারিত হতে থাকেন; কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তাঁরা নিজেদের ধর্মে দুর্বলতা প্রদর্শন করেন নি। দীর্ঘ কাল যাবত কারাবরণের পর তাঁদেরকে শত্রুদের হাত হতে উদ্ধার করা হয়েছিল?
ইসলামের কি আশ্চর্য আকর্ষণ। ঈমানের কি অপূর্ব শক্তি। একদিন নয়, দুদিন নয়, যুগ যুগ ধরে কাফিরদের এত অত্যাচার! এত উৎপীড়ন। কিন্তু তারা এক মুহূর্তের জন্যও কোন একটি প্রাণীকে ইসলাম হতে বিমুখ করতে কিংবা ঈমানের মধ্যে একটুখানি দুর্বল করতেও সমর্থ হয় নি। বাস্তবিক এই ইসলাম: আর এরই নাম ঈমান। বাইবেলের পিতর ও য়্যাহ্দা বিপদের আশঙ্কায় হযরত 'ঈসা (আঃ) ও তাঁর ধর্মকে অস্বীকার করে খৃস্টান ধর্মের ইতিহাসে যে কলঙ্ক রেখে গেছেন, আল্লাহ তা'আলা ইসলামের উজ্জ্বল ইতিহাসকে এরূপ কলঙ্ক হতে সম্পূর্ণ পবিত্র রেখেছেন। সুতরাং হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) যে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, ইসলাম যে পূর্ণতম ধর্ম এবং উম্মতে মুহাম্মদী যে সর্বোত্তম উম্মত বাইবেলের অনুসরণকারী খৃস্টানগণের এটা অস্বীকার করার কোন উপায় আছে কি?"
'আকাবার শেষ বয়া'আতের পর হতে 'সফর' মাসের শেষ পর্যন্ত একে, একে সমস্ত সাহাবীই মদীনায় প্রস্থান করলেন। শুধু হযরত আবূ বকর (রাঃ) আর হযরত 'আলী (রাঃ) ব্যতীত রাসূল (সাঃ)-এর নিকট কেউ রইলেন না। অন্যান্য যাঁরা কাফিরদের হাতে বন্দী হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়।
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার যে মমতা উম্মতের প্রতি রাসূল (সাঃ)-এর তদপেক্ষা হাজার হাজার গুণ অধিক মমতা ছিল। একে ত মক্কা মুসলিম বৈরী কাফিরদের কেন্দ্রস্থল, আবার 'আকাবার বয়'অতের সংবাদ পেয়ে শত্রুগণ পাগলা কুকুরের ন্যায় ক্ষেপে উঠেছিল। পরে কোন ভক্তকে প্রাণ বধ করে ফেলে, এই আশঙ্কায় তাঁর দয়ার্দ্র হৃদয় অস্থির হয়ে উঠল। তাই তিনি নিজের কথা বিস্মৃত হয়ে প্রাণপ্রিয় ভক্তদেরকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছায়ে দিলেন।
মদীনাবাসী আনসারগণ (রাঃ) নবাগত প্রবাসী ভ্রাতাদেরকে প্রাণ খুলে অভ্যর্থনা করলেন। তাঁদের সুখ স্বচ্ছন্দ্যের জন্য। নিজেদের বাড়ী-ঘর ছেড়ে দিলেন এবং নিজেদের বিষয় সম্পত্তি দিয়ে তাঁদেরকে সর্বান্তঃকরণে সাহায্য করতে লাগলেন। দীর্ঘকাল পরে মক্কাবাসী মুহাজিরগণ (রাঃ) শান্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেলেন।
প্রথম হিজরী
সাহাবীগণ (রাঃ) মদীনায় চলে গিয়েছেন। একমাত্র হযরত 'আলী এবং হযরত আবু বকর ব্যতীত এখানে রাসূল (সাঃ)-এর দলের লোক কেউ নেই। তাঁকে বধ করে ইসলামকে সমূলে ধ্বংস করার এখনই সুবর্ণ সুযোগ। তাই কাফিরগণ নানা প্রকার দূরভিসন্ধি আঁটতে লাগল। রাসূল (সাঃ) মক্কা ছেড়ে কোথাও যাচ্ছেন না। তিনি আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন। মক্কার বাইরে যে সকল প্রতিপত্তিশালী ভক্ত বিদ্যমান ছিলেন, তাঁরা এই সঙ্কট সময়ে রাসূল (সাঃ)-কে রক্ষা করার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগলেন।
দওস গোত্রের মুসলমানদের একটি সুরক্ষিত দুর্গ ছিল তাঁদের সরদার হযরত তুফায়ল (রাঃ) রাসূল (সাঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ করলেন, হুযুর, আপনি হিজরত করে আমাদের দুর্গে চলুন; কিন্তু রাসূল (সাঃ) এতে সম্মত হলেন না। হামাদান বংশীয় জনৈক ব্যক্তিও একবার এরূপ অনুরোধ করে ছিলেন। পরে বললেন, "আমি আমার গোত্রের লোকদেরকে এই বিষয় জানিয়ে আগামী বৎসর আমি আপনার খিদমতে হাযির হব।
কিন্তু এই সৌভাগ্য লাভ করা মদীনার আনসারদের (রাঃ) অদৃষ্টে ছিল। তাই রাসূল (সাঃ) মদীনা ব্যতীত অন্য কোথাও হিজরত করার আদেশ পেলেন না। হিজরতের পূর্বে একদা রাসূল (সাঃ) স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন-তাঁর হিজরতের স্থান ফুলে ফলে পরিপূর্ণ একটা বাগান ভূমি। এই স্বপ্ন দেখে তিনি মনে মনে ধারণা করলেন যে, বোধ হয় এই স্থানটি য়্যামামা অথবা হজর হবে; কিন্তু শেষকালে দেখা গেল স্থানটি ছিল মদীনা। সাহাবীদের (রাঃ) মদীনায় প্রস্থান করার পর কুরায়শদের মনে একটা নূতন চিন্তা জেগে উঠল। তারা ভাবতে লাগল, মুসলমানদেরকে এভাবে ছেড়ে দেয়া উচিৎ হয় নি। আমাদের এই বোকামির ফলেই মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ধর্ম মদীনায় মূল গেড়ে বসল। তিনিও হয়ত তাঁদের সাথে যোগ দিয়ে তাঁদেরকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারেন। এরূপ হলে ও মহাসর্বনাশ। ইসলামকে ধ্বংস করা ও দূরের কথা, তার আক্রমণ হতে নিজেদেরকে রক্ষা করাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। সাথে সাথে মদীনাবাসীরাও ত আমাদের শত্রু হয়ে পড়ল। পরে যে তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কি?
হত্যার ষড়যন্ত্র
এসব চিন্তা করে কুরায়শ নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ল। তারা অচিরেই ইসলাম-প্রতিরোধ কমিটির একটি গুপ্ত সভ্য আহ্বান করল। 'দারুন-নদওয়া' নামক পরামর্শগৃহে এ সভ্যতা অধিবেশন হল। মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উৎপাত হতে চিরতরে নিস্তার পাওয়ার একটা সুষ্ঠু উপায় উদ্ভাবন করা এবং বর্তমান সমস্যার পূর্ণ সমাধান করাই হল এই অধিবেশনের আলোচ্য বিষয়। 'আবদে মানাফ বংশকে (হযরতের বংশ) বাদ দিয়ে কুরায়শের সকল গোত্রকেই, কারও কারও মতে ইসলাম-বৈরী অন্যান্য গোত্রসমূহকেও এই সভায় আহ্বান করা হয়েছিল। নজদের এক জন বৃদ্ধরূপী শয়তানও এই সভায় যোগদান করেছিল। কুরায়শদের প্রসিন্ধ গোত্রসমূহের যে সমস্ত সর্দার উক্ত সভায় যোগদান করেছিল, তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা এই-
১. 'আবদে শামস্ গোত্রের শায়বা, 'উতবা, আবূ সুফইয়ান।
২. নওফল গোত্রের তু'আয়রমা, জুবায়র বিন মুত্ ইম এবং হারিস বিন আমির।
৩. 'আবদুদদার গোত্রের নযর বিন হারিস। ৪. আসাদ গোত্রের আবুল বাখতরী, যহ'আ, হাকীম বিন হিযাম।
৫. মখযূম গোত্রের আবূ জাহল।
৬. সাহম গোত্রের নুবায়হ্ ও মুনাব্বাহ।
৭. জুমাহ্ গোত্রের উমায়্যা বিন খাল্ল্ফ।
নবুওয়তের চতুর্দশ সনের ১ মুহাররমে সকল সদস্য সভ্যগৃহে সমবেত হলে আলোচনা আরম্ভ হল। কেউ কেউ বলল, "মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হাতে হাতকড়ি পায়ে বেড়ি দিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতঃ কারাগারে নিক্ষেপ করা হউক এবং মরে না যাওয়া পর্যন্ত দরজা বন্ধ থাকুক।" নজদবাসী বৃদ্ধ বলল, "না, এটা ঠিক হবে না। কারণ এই সংবাদ বাইরে নিশ্চয়ই প্রচারিত হবে। তখন ভক্ত মুসলমানগণ ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনগণ তাঁকে উদ্ধার করার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করবে। ফলে তোমরাও বিপর্যস্ত হবে। তোমাদের নিজেদের মধ্যেও এই সম্পর্কে একটা আত্মকলহ জেগে উঠতে পারে। গিরিসঙ্কটে অন্তরীণ অবস্থায় রাখার কথা স্মরণ কর।"
আর একজন বলে উঠল, "তাঁকে একটা পাগলা উটের পৃষ্ঠে বসিয়ে দেশান্তর করে দেওয়া হউক। যেখানে ইচ্ছা, চলে যাক। আমরা ও তাঁর উৎপাত হতে নিরাপদ হতে পারব। "নজীদ বৃদ্ধ বলল, "এটাও সমীচীন নয়। কারণ, তিনি যে মিষ্টভাষী লোক। তাঁর মধুর বাণী দ্বারা লোকদেরকে বশীভূত করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিরাট দল গঠন করতে পারবেন। তখন হয়ত প্রতিশোধ গ্রহণার্থ তোমাদের উপর আক্রমণ করে বসবেন।"
সর্বশেষে আবু জাহল বলল, "আমি, বিশেষ চিন্তা করে দেখলাম, তাঁকে হত্যা করা ছাড়া উপায়ন্তর নেই। তবেই ইসলামের প্রাণশক্তির উৎস-মুখ রুদ্ধ হয়ে পড়বে এবং ইসলামও সমূলে ধ্বংস হয়ে যাবে। সকলেই এক বাক্যে এ-প্রস্তাব সমর্থন করল; কিন্তু হত্যা করবে কে? এটা হল প্রধান সমস্যা। যে কোন গোত্রের যে কোন লোকেই এই কাজের ভার গ্রহণ করুক না কেন, হাশিম ও মুত্তালিব গোত্রের লোকে চিরদিন তার রক্তবিনিময় বা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শত্রুতা ও বৈরীভাব পোষণ করতে থাকবে। সুতরাং কোন একজন লোকে তাঁকে হত্যা করা সমীচীন হবে না।
আবু জাহল এই সমস্যার সমাধান এভাবে করল, প্রত্যেক গোত্র হতে এক একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হউক, তৎপর তারা সকলে একযোগে মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হত্যা করুক। এই অবস্থায় আমাদের মধ্যে আত্মকলহেরও আশঙ্কা থাকবে না। আর মুত্তালিব এবং হাশিম গোত্রও আমাদের সকলের সঙ্গে শত্রুতা করতে সাহস পাবে না। এই প্রস্তাব সকলেরই মনঃপূত হয়ে প্রতিনিধি নির্বাচিত হল। স্থির হল যে, গভীর রাত্রে তারা গুহা ঘেরাও করে রাখবে। প্রত্যুষে বের হওয়া মাত্র।
সকলে একযোগে তাঁকে হত্যা করবে। পবিত্র কুর'আনে এই ষড়যন্ত্রের উল্লেখ আছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-
হে মুহাম্মদ (সাঃ), আল্লাহর মহাদানের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মুসলমানদের নিকট সেই ঘটনাটি বর্ণনা করুন। যখন কাফিরগণ আপনার সম্বন্ধে (মারাত্মক রকমের) ষড়যন্ত্রসমূহ পাকাচ্ছিল যে, আপনাকে বন্দী করে রাখবে, না আপনাকে হত্যা তরে ফেলবে, না আপনাকে দেশান্তর করে দিবে। তারা ও ষড়যন্ত্র পাকানে লিপ্ত ছিল, আর আল্লাহ তাদের ষড়যন্ত্রসমূহ পণ্ড করার যোগাড় করছিলেন। আর আল্লাহ্ তা'আলা সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী (সুতরাং তিনি তাদের সমস্ত যড়যন্ত্র পণ্ড করে দিলেন এবং রাসূল (সাঃ) নিরাপদে মদীনায় পৌঁছলেন।"
হিজরতের আদেশ
আল্লাহর আদেশে হযরত জিবরাঈল। (আঃ) অবতীর্ণ হয়ে রাসূল (সাঃ)-কে কাফিরদের গোপন ষড়যন্ত্রের সমস্ত কথা জানিয়ে দিয়ে সেই রাত্রে নিজের বিছানায় না থাকার জন্য অনুরোধ করলেন। তৎসঙ্গে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশও অবতীর্ণ হল। রসুল (সাঃ) নির্দেশ পেয়ে হিজরতের আয়োজন করতে আরম্ভ করলেন।
দ্বিপ্রহরের প্রখর রৌদ্র দিয়ে রসুল (সাঃ) হযরত আবু বকরের গৃহে উপস্থিত হলেন। নিয়মানুযায়ী দরজা খটখটায়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। অনুমতির পর ঘরে প্রবেশ করে হযরত আবু বকরকে বললেন, "আপনার সাথে বিশেষ প্রয়োজনীয় পরামর্শ আছে, ঘরে কেউ থাকলে সরিয়ে দিন। হযরত আবু বকর আরয, করলেন, "আপনার স্ত্রী আয়িশা (রাঃ) ব্যতীত ঘরে আর অন্য কেউ নেই।” (ইতঃপূর্বেই হযরত আয়িশার সাথে রসুল (সাঃ)-এর বিবাহ হয়েছিল।) তখন রসুল (সাঃ) বললেন, "আমি আল্লাহর দরবার হতে হিজরতের অনুমতি প্রাপ্ত হয়েছি।” এই কথা শুনে হযরত আবু বকর অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন, "আপনার প্রতি আমার পিতা উৎসৃষ্ট হউন, আমি আপনার সাথী হওয়ার অনুমতি পাব কি?" রসুল (সাঃ) সম্মতিসূচক উত্তর দিলেন। হযরত আবু বকর চার মাস পূর্ব হতেই দুটি বলিষ্ঠ দ্রুতগামী উট হিজরতের জন্য তৈয়ার করে রেখেছিলেন। উট দুইটিকে বাবলা পাতা খাওয়ায়ে খুব হৃষ্টপুষ্ট করে তুলেছিলেন। তিনি রসুল (সাঃ)-কে বললেন, "হুযুর, দয়া করে একটি উট আপনি গ্রহণ করুন।" রসুল (সাঃ) উত্তর করলেন, "আচ্ছা, বেশ কথা: কিন্তু আপনাকে এর মূল্য গ্রহণ করতে হবে।" বিনা মূল্যে গ্রহণ করতে সম্মত না হওয়ায় অগত্যা হযরত আবুবকর এতে রাযী হলেন। হযরত 'আয়িশা এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ ভগ্নি হযরত আসমা পথের জন্য আসবাবপত্র এবং খাদ্য যোগাড় করতে লাগলেন। দুই তিন দিনের খাদ্য তৈয়ার করে 'নাশতাদানে' ভরে দিলেন এবং হযরত আসমা নিজের 'কমর বন্দ' ফেড়ে দুই টুকরা করতঃ নাশতাদানের মুখ বেঁধে দিলেন। এইজন্যই তাঁকে দুই কমরবন্দওয়ালী বলা হয়ে থাকে।
রসূল (সাঃ) মদীনা যাত্রা করলে পথে কাফিরগণ নানা প্রকার বিভ্রাটের সৃষ্টি করতে পারে, এই কথা ভেবে আবু বকর অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করলেন। তিনি স্থির করলেন যে, তাঁর বাড়ীর পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে পদব্রজে মদীনার পথ ধরবেন। প্রভাত হবার পূর্বেই সত্তর' নামক গিরি গহ্বরে আশ্রয় গ্রহণ করবেন। হযরত আবু বকরের পুত্র 'আবদুল্লাহ সারাদিন কুরায়শদের যুক্তি পরামর্শ ও গতিবিধি অবগত হয়ে রাত্রিকালে 'সওর' গহবরে যেয়ে তাঁদেরকে জানিয়ে আসবেন। হযরত আবু বকরের আযাদকৃত গোলাম 'আমির বিন ফুহায়রা দিনের বেলায় অন্যান্য রাখালদের সাথে মেষ চরাবেন এবং রাত্রিকালে তাঁদেরকে ছাগ-দুগ্ধ পৌঁছায়ে দিয়ে আসবেন। 'সওর' হতে বের হবার পর সোজা পথে না যেয়ে সমুদ্র উপকূলের পথ ধরে মদীনা যাত্রা করতে হবে। ঐ পথ অপরিচিত হবার দরুন একজন পথপ্রদর্শকের আবশ্যক। তজ্জন্য 'আবদুল্লাহ বিন উরায়কীত নামক একজন বিশ্বস্ত কাফিরকে নিযুক্ত করলেন এবং গোপন তথ্য প্রকাশ না করার অঙ্গীকার নিলেন। তাকে চুপে চুপে উট দুটি নিয়ে সওর পাহাড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
গচ্ছিত মাল ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা
কুরায়শগণ যদিও অন্ধবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে রসুল (সাঃ)-এর প্রাণের শত্রু হয়ে পড়েছিল।, তথাপি তারা সারা মক্কানগরে অন্য কাউকেও তাঁর ন্যায় বিশ্বাসী বলে মনে করত না। অলঙ্কার, টাকা কড়ি বা অন্য কোন মূল্যবান পদার্থ গচ্ছিত। রাখতে হলে তাঁর নিকটেই রাখত। তাদের এই বিশ্বাস ছিল যে, আমরা তাঁর সাথে যতই শত্রুতা করি না কেন, তিনি কখনও অবিশ্বাসের কাজ করবেন না। কারণ, তিনি হলেন আল-আমিন ও আসসাদিক অর্থাৎ বিশ্বাসী ও সত্যবাদী। তিনি যে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন কিংবা মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করবেন, আজও তারা এরূপ সন্দেহ করতে পারে না।
রসুল (সাঃ) যখন হিজরত করে মদীনা যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন তাঁর নিকট কুরায়শদের বহু মূল্যবান সম্পদ গচ্ছিত ছিল। এগুলো ফেরত দিয়ে হিজরত করতে হবে; কিন্তু ফেরত দিলে লোকে হয়ত সন্দেহ করবে যে, তিনি বুঝি দেশত্যাগের সংকল্প করেছেন। এজন্য স্থির করলেন যে, হযরত 'আলীকে এখানে রেখে যাবেন। তাঁরা চলে যাবার পর তিনি এই সমস্ত গচ্ছিত মাল ফেরত দিয়ে পরে মদীনায় হিজরত করবেন।
গৃহাবরোধ
রাত্রি গভীর হয়েছে। গৃহে গৃহে লোকজন ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছে। মক্কানগরী নীরব, নিস্তব্ধ। এমন সময় পূর্ব পরামর্শ অনুযায়ী নির্বাচিত ঘাতকদল রসুল (সাঃ)-এর বাসগৃহ অবরোধ করে দাঁড়াল। প্রত্যুষে রসুল (সাঃ) হাত্রোত্থান করে বাইরে পদার্পণ করা মাত্রই তারা সকলে একযোগে তরবারি চালায়ে তাঁকে বধ করবে, এই আশায় প্রতীক্ষা করতে লাগল।
রসুল (সাঃ) হযরত 'আলীকে বললেন, তুমি আমার এই সবুজ চাদরখানা আবৃত করে আমার বিছানার উপর নিঃসঙ্কোচে ঘুমায়ে থাক। কাফিরগণ তোমাকে কিছুই করতে পারবে না। সকালে উঠে গচ্ছিত মালগুলো ঠিকভাবে মালিকদেরকে ফিরিয়ে দিয়ে মদীনায় চলে এসো। ঈমানের পাহাড়, আল্লাহর সিংহ হযরত 'আলী সংশয়হীন চিত্তে চাদর আবৃত করে রসুল (সাঃ)-এর পবিত্র শয্যায় ঘুমিয়ে রইলেন। ঈমানের কি অপূর্ব শক্তি। কত দুর্জেয় তার সাহস। কোন মুহূর্তে যে এই বিছানার উপর হত্যাকাণ্ড সাধিত হয়, তার নিশ্চয়তা নেই। অথচ ঈমানের অসাধারণ বলে বলীয়ান হযরত আলী কেমন নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্ত মনে শুইয়ে ঘুমাচ্ছেন। রসুল (সাঃ) হযরত 'আলীকে শয়নের নির্দেশ দিয়ে বিদেশ যাত্রার পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে বিসমিল্লাহ্ বলে ঘর হতে বের হলেন। ধুলা ও কাঁকর মিশ্রিত একমুষ্টি মৃত্তিকা হাতে নিয়ে সূরা ইয়াসীনের কিছু অংশ পাঠ করে কাফিরদের উপর নিক্ষেপ করলেন এবং তাদের সম্মুখ দিয়ে বের হয়ে চলে গেলেন। আল্লাহর কুদরতে অবরোধকারী কাফিরগণ অচেতন অবস্থায় দাঁড়ায়ে রইল। রসুল (সাঃ) যে উক্ত স্থান হতে প্রস্থান করে চলে গেলেন। একথা তারা অনুভবও করতে পারল না।
রসুল (সাঃ) গৃহ হতে বের হয়ে পবিত্র কা'বা গৃহের দিকে করুণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। নয়নযুগল অশ্রুসজল হয়ে উঠল। গভীর মততা ও পরিতাপের সাথে বললেন-হে মক্কা নগরী। তুমি আমার জন্মভূমি, আমি তোমাকে ভালবাসি। সমগ্র ধরাপৃষ্ঠের মধ্যে তুমিই আমার নিকট প্রিয়তম। কিন্তু তোমার সন্তানগণ আমাকে (তোমার বুকে) বাস করতে দিচ্ছে না। তৎপর তিনি পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফটক দ্বার দিয়ে হযরত আবু বকরের গৃহে প্রবেশ করলেন এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গৃহের পিছনের খিড়কী দরজা দিয়ে বের হয়ে পড়লেন। সওর পাহাড় মক্কা হতে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। ভগ্ন প্রস্তর ও কাঁকরে পরিপূর্ণ দুর্গম পথ। রাত্রির অন্ধকারে এ-পথ অতিক্রম করা বড়ই দুঃসাধ্য কাজ। পাথরের চোট লেগে রসুল (সাঃ)-এর পবিত্র পদযুগল আহত হয়ে পড়ল। অতি কষ্টে তাঁরা সওর পর্বতে গিয়ে পৌঁছলেন।
কুরায়শদের ক্রোধ
এদিকে কাফিরগণ হযরত 'আলীকে রাসূল (সাঃ) মনে করে সারা রাত্রি দাঁড়িয়ে রইল। প্রত্যুষে যখন হযরত 'আলী গাত্রোত্থান করলেন তখন তারা হতভম্ব হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, মুহাম্মদ (সাঃ) কোথায়? তিনি বললেন, আমি কি জানি, আমাকে ত তোমরা চর নিয়োগ কর নি? তিনি কোথায় আছেন, তাঁর আল্লাহ্ জানেন। তোমরা বারংবার তাঁকে মক্কা ছেড়ে যেতে বল, তিনি হয়ত মক্কা ছেড়ে চলে গেছেন।
তারা মনে করল, মুহাম্মদ (সাঃ) হয়ত আছেন কিন্তু তাঁকে বাঁচাবার জন্য হযরত 'আলী আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এজন্য প্রথমে তাঁকে আটকিয়ে রেখে পীড়াপীড়ি করল। পরে যখন বুঝল, যে, তাঁকে উৎপীড়ন করে সময় নষ্ট করা নিষ্ফল, তখন তারা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে রাসূল (সাঃ)-এর অনুসন্ধানে বের হল।
রাসূল (সাঃ) মদীনায় প্রস্থান করবেন এবং হযরত আবূ বকরকে ছাড়া তিনি যে কোন কিছুই করবেন না একথা তাদের অবিদিত ছিল না। সুতরাং তারা হযরত আবু বকরের গৃহদ্বারে এসে উপস্থিত হল। আবু জাহল ক্রোধান্বিত হয়ে গৃহদ্বারে ভীষণ বেগে করাঘাত করতে আরম্ভ করল। তখন গৃহাভ্যন্তরে হযরত আস্থা ও তাঁর কনিষ্ঠা ভগ্নি অপ্রাপ্ত বয়স্কা বালিকা হযরত 'আয়িশা বিদ্যমান ছিলেন। ব্যাপার কি, তা বুঝতে আর তাঁদের বাকী রইল না; কিন্তু বীর মুসলিম বালিকা আসমা এতে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হলেন না। হযরত আম্মা বস্ত্রাদি সুবিন্যস্ত করে নির্ভীক চিত্তে দুয়ার খুলে দিলেন। দরজা খোলা মাত্রই দেখতে পেলেন, মূর্তিমান শয়তান পাপিষ্ঠ আবু জাহল দণ্ডায়মান। ক্রোধ কষায়িত লোচনে জিজ্ঞেস করল-"বল, তোর পিতা কোথায়? হযরত আসমা (রাঃ) উত্তর দিলেন-"আমি বলতে পারি না"-এই কথা বলার সাথে সাথে দুর্বৃত্ত হযরত আমাকে একটা চপেটাঘাত করে চলে গেল। সেই আঘাতে তাঁর কর্ণ-বালি ছিঁড়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল।
মক্কাময় প্রচার হয়ে গেল নির্বাচিত ঘাতক দল অকৃতকার্য হয়ে ফিরে এসেছে। রাসূল (সাঃ) চলে গেছেন। সারা মক্কায় ক্ষোভ ও ক্রোধের দাবানল প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠল। অগ্নিশর্মা কুরায়শগণ তাঁকে ধরার জন্য উন্মত্ত কুকুরের ন্যায় চতুর্দিকে দৌড়াদৌড়ি করতে আরম্ভ করল।
সওর গুহায় তিন দিন
অপর দিকে হযরত আবূ বকর (রাঃ) প্রথম সওর গুহায় প্রবেশ করে গর্তটি পরিষ্কার করলেন। চতুষ্পার্শ্বস্থ গুহা প্রাচীরে ছোট ছোট ছিদ্র ছিল। ছিদ্র পথে সাপ বিচ্ছু অন্য কোন বিষাক্ত প্রাণী বের হয়ে ব্যাঘাত ঘটায়, এই আশংকায় হযরত আবু বকর তাঁর গায়ের চাদর ছিড়ে ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দিলেন; কিন্তু পূর্ণ চাদরটি শেষ হয়ে যাওয়ায় একটি ছিদ্র বন্ধ করতে পারলেন না। তৎপর রাসূলকে গুহার ভিতরে নিয়ে গেলেন। তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে আসছিলেন। এজন্য হযরত আবূ বকরের জানুর উপর মাথা রেখে ঘুমায়ে পড়লেন। হযরত আবু বকর যে ছিদ্রটির মুখ খোলা ছিল, তার উপর পা দিয়ে বন্ধ করে রাখলেন। ঘটনাক্রমে পদনিম্নের গর্ত হতে একটি সাপ তাঁকে দংশন করল। তিনি ব্যথায় জর্জরিত হয়ে পড়লেন। পরিশ্রান্ত হাবীবের ঘুম ভেঙ্গে যায়, এই কথা চিন্তা করে তিনি চীৎকারও করলেন না এবং গর্তের মুখ হতে পাও সরালেন না। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে ঝড় ঝড় করে দুই নয়ন হতে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়ে রাসূল (সাঃ)-এর উপর পড়তে লাগল। এতে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল। অবস্থা জেনে তিনি ক্ষতস্থলে তাঁর পবিত্র মুখের থুথু লাগিয়ে দিলেন। আল্লাহর কৃপায় হযরত আবূ বকর নিরাময় হয়ে গেলেন।
পাঠক, এটা রাসূলের প্রেম এবং গুরুভক্তির উজ্জ্বল আদর্শ। মৃত্যু-শয্যায় শয়ন করে হযরত 'আলী যেমন আত্মত্যাগের চরম দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছেন, তদ্রূপ হযরত আবূ বকর ও স্ত্রী-পুত্র কন্যা শত্রুর কবলে ফেলে নির্জন গুহায় সর্পদষ্ট হয়ে আত্মোৎসর্গের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করলেন।
তাঁরা গর্তে প্রবেশ করার সাথে সাথেই আল্লাহর কুদরতে একটি মাকড়সা এসে গর্তের মুখে জাল বুনছিল। কুরায়শগণ রাসূল (সাঃ)-কে অনুসন্ধান করতে করতে ঐ গর্তের নিকটে এসে পৌঁছল। গুহার মুখের নিকট শত্রুদেরকে দেখতে পেয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ) অত্যন্ত বিচলিত হয়ে রাসূল (সাঃ)-কে বললেন, "হুযূর, শত্রুগণ এখন আমাদের এত নিকটে এসে পৌঁছিয়েছে যে যদি তারা নিজেদের পায়ের দিকে দৃষ্টি করে, তবে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। রাসূল (সাঃ) শান্তভাবে বললেন। "হে আবূ বকর, বিচলিত হইও না, নিশ্চয় আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন।"
অর্থাৎঃ শত্রুদের শক্তি ও সংখ্যা যতই অধিক হউক না কেন তারা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। কারণ, সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের সহায়। আর তাঁর সহায়তার সম্মুখে কোন শক্তিই টিকতে পারে না। সমস্ত শক্তিই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, সমস্ত গর্বই খর্ব হয়ে যায়। পাঠক, একটু চিন্তা করে দেখুন, নিভৃত গুহার মধ্যে মাত্র দুটি মানুষ। আর শত্রুগণ মস্তকোপরি দণ্ডায়মান। পালাবার পথ নেই। মুক্তির উপায় নেই। অবধারিতরূপে মৃত্যুর মুখে পতিত। কিন্তু সেখানে মহামানবের মহান হৃদয় কেমন অবিচলিত সমুদ্রের ন্যায় কত গভীর প্রশান্ত, আকাশের ন্যায় কত নির্বিকার উন্মুক্ত। আল্লাহর। প্রতি কি অটল বিশ্বাস।
কাফিরগণ এদিক ওদিক অনুসন্ধান করার পর গুহার মুখের দিকে তাকায়ে বলল, "তার ভিতরে নিশ্চয়ই কেউ প্রবেশ করে নি। নতুবা মাকড়সার জাল কিছুতেই অক্ষত থাকতে পারে না। এই ভেবে তারা চলে গেল।
আল্লাহর কি কুদরত। মাকড়সার জাল কত অকিঞ্চিৎকর বস্তু। কত দুর্বল উপকরণ। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেন-
" নিশ্চয় সমস্ত ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘর (জাল) সবচেয়ে অধিক দুর্বল।"
এই ক্ষীণ ও দুর্বল উপকরণ দিয়েই তিনি বন্ধ করলেন নিজ হাবীবের গিরিগহবর কেল্লার ফটক। তাই দিয়ে তিনি ব্যর্থ করে দিলেন দুর্ধর্ষ শত্রুদের সমস্ত অপচেষ্টা। বজ্রপাত দ্বারা নয়, প্লাবন, ভূমিকম্প বা অন্য কোন অলৌকিক কাণ্ডের দ্বারা নয়, সামান্য একখানি মাকড়সার জালের আড়ালে রেখে তিনি রক্ষা করলেন প্রিয় রাসূলকে।
আল্লাহর প্রিয় রাসূল সেদিন এই গুহার মধ্যে বিশ্বমানবের জন্য এক মহান আদর্শ রেখে গিয়েছেন। বিপদ যতই কঠোর হউক, মানুষ যতই নিঃসহায় হউক, আল্লাহর রহমত হতে কোন অবস্থাতেই নিরাশ হতে নেই। আল্লাহর উপর নির্ভর ও তাঁর প্রতি অটল ঈমান রেখে ধৈর্য ধারণ করলে নিমেষের মধ্যে তিনি মহাবিপদ হতে মুক্তি দিতে পারেন। এই সত্যই সে দিন প্রতিপন্ন হয়েছে। এই পুণ্যময় পবিত্র গুহা যারা যিয়ারত করতে পেরেছে, সত্যই তাদের জীবন ধন্য হয়েছে।
আল্লাহর প্রিয় নবী, ঈমানের স্বর্গীয় আদর্শ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) আপন হৃদয়ে আল্লাহকে এমনভাবে প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর পবিত্র হৃদয় সত্যের তেজে এমনভাবে দৃপ্ত হয়ে উঠেছিল যে, দুনিয়ার কোন বিভীষিকা তাঁর সেই মহান হৃদয়কে এক মুহুর্তের জন্য বিচলিত করতে পারে নি।
যে গুণ স্বীকার করতে শত্রুও বাধ্য হয়, তা যে বাস্তব ও শ্রেষ্ঠতম, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এই প্রসঙ্গে মারগোলিয়থের ন্যায় ইসলাম-বৈরী লেখকও বলতেছেন: চরম বিপদের সময় মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মানসিক বল সর্বাপেক্ষা উত্তমরূপে বিকাশ প্রাপ্ত হত; তিনি বিশেষ ধীরতা সহকারে এবং অত্যন্ত সাহসের সাথে কাজ করেছিলেন, এতে কোন সন্দেহ নেই।
রাসূল (সাঃ) হযরত আবু বকরের সাথে এই গুহার মধ্যে তিন দিন কাটালেন। হযরত আবু বকরের পুত্র 'আবদুল্লাহ (রাঃ) তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, সুনিপুণ কর্মী, শক্তিশালী ও সাহসী যুবক ছিলেন। তিনি এই তিন দিন যাবৎ সারা দিন মক্কায় থেকে শত্রুদের আলাপ-আলোচনা, অবস্থাদি সম্যকরূপে অবগত হতেন এবং রাত্রি কালে সত্তর পর্বতে গমন করে তাঁদেরকে সব কথা জানিয়ে আসতেন। এতে তাঁরা গুহার ভিতর হতে বের হওয়া সমীচীন কি না, একথা বিবেচনা করার পূর্ণ সুযোগ লাভকরতেন। ফুহাইয়ার পুত্র 'আমির হযরত আবু বকরের ক্রীত গোলাম ছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর হযরত আবু বকর তাঁকে মুক্ত করে দেন। প্রভুভক্ত 'আমির মুক্তির পরও হযরত আবু বকরের গৃহে অবস্থান করে তাঁর মেষ চরাতেন। তিনি সারা দিন মক্কার অন্যান্য রাখালদের সাথে মেষ চরাতেন এবং রাত্রিকালে মেষ-দুগ্ধ সওর গুহায় পৌঁছায়ে আসতেন। এই দুগ্ধই ছিল তাঁদের প্রধান খাদ্য।
চতুর্দিকে তালাশ করে কোন সন্ধান পাচ্ছেন না। কুরায়শ-সরদারগণ হতাশ হয়ে পড়ল। পিঞ্জিরাবন্ধ শিকার হাত ছাড়া হয়ে গেল, এই দুঃখ কি সহ্য করা যায়? অপমানে, ক্ষোভে, ক্রোধে, কুরায়শগণ একেবারে দিশাহারা হয়ে পড়ল। তখন উদ্ভ্রান্ত কুরায়শ দলপতিগণ ঘোষণা করল-
"মুহাম্মদ (সাঃ) অথবা আবূ বকর (রাঃ)-কে যে ধরে এনে দিতে পারবে, তাকে একশত উট পুরস্কার দেয়া হবে।
-%E0%A6%8F%E0%A6%B0%20%E0%A6%9C%E0%A7%80%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%80.jpg)