ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বিস্তারিত আলোচনা

আসসালামু আলাইকুম পাঠক, কেমন আছেন সবাই? আশাকরি সবাই ভালো আছেন। প্রিয় পাঠক আজ আমি আপনাদের সাথে আলোচনা করবো ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক শিষ্টাচার কেমন হবে বা ইসলামের আলোকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার কেমন হয় সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে। আরও আলোচনা করবো- ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব দেওয়ার শিষ্টাচার কি? বিচার কার্য সম্পর্কে ইসলামের শিষ্টাচার কি? এছাড়াও আরও অনেক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে আজকের আর্টিকেলে। কাজেই আপনি যদি উপরোক্ত তথ্য মোতাবেক এই সকল প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান তাহলে আর্টিকেলটি সম্পুর্ন মনোযোগ সহকারে পড়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। তাহলে চলুন শুরু করা যাক-

ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক শিষ্টাচার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক শিষ্টাচার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

নেতৃত্ব সংশ্লিষ্ট শরয়ি শিষ্টাচার

ক. নেতৃত্বের সাধারণ শরয়ি শিষ্টাচার

১. নেতৃত্ব কামনা এবং এর আশা পোষণ না করা। নবি (সা.) বলেন-'হে আবদুর রহমান ইবনে সামুরা! তুমি নেতৃত্ব কামনা করো না। কেননা, তোমার চাহিদার ভিত্তিতে দেওয়া হলে তা তোমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি চাহিদা ছাড়া দেওয়া হয়, তাহলে এতে তোমাকে সহায়তা করা হবে।

২. নেতা হিসেবে পুরুষদের নির্বাচন করা। নবি (সা.) বলেন-'যে জাতি নারীদের নিজেদের নেতা বানাবে, তারা কখনো সফলকাম হবে না।'

৩. নেতা হিসেবে আমানতদার ও দক্ষ ব্যক্তিকে নির্বাচন করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'অতঃপর সে যখন তার সাথে কথা বলল, তখন রাজা বলল, আজ তুমি আমাদের কাছে খুবই মর্যাদাবান ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিগণিত। ইউসুফ বলল, আমাকে দেশের কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করুন। নিশ্চয় আমি উত্তম রক্ষক ও সুবিজ্ঞ।'

৪. পুণ্যবানদের মন্ত্রী ও সহযোগী নির্বাচন করা। নবি (সা.) বলেন-'আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক নবি ও খলিফাকে দুজন সহযোগী দিয়ে প্রেরণ করেছেন। একজন সহযোগী তাকে ভালো কাজের আদেশ দেয় এবং রাজাকে এর প্রতি আগ্রহী করে। অন্য সহযোগী তাকে খারাপ কাজের আদেশ দেয় এবং রাজাকে এর প্রতি আগ্রহী করে। নিরাপদ সে-ই, যাকে আল্লাহ নিরাপদ রাখেন। '

৫. নেতাদের জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা। নাফে বলেন-'উমর (রা.) তাঁর গভর্নরদের কাছে এ মর্মে চিঠি লেখেন-আমার কাছে তোমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নামাজ। যে নামাজের হেফাজত করবে এবং এর পাবন্দি করবে, সে পুরো দ্বীনের হেফাজত করবে। আর যে এ ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শন করবে, সে অন্য ব্যাপারেও উদাসীনতা দেখাবে।'"

রাজার জন্য পালনীয় প্রজা সংশ্লিষ্ট শরয়ি শিষ্টাচার

১. আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আর আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারে আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করুন। তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।

২. ন্যায় ও ইনসাফের সাথে ফয়সালা করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচার-মীমাংসা করো, তখন মীমাংসা করো ন্যায়ভিত্তিক। '

৩. স্বজাতির কল্যাণ কামনা করা। তাদের ধোঁকা না দেওয়া। নবি (সা.) বলেন-'কোনো রাজা প্রজাদের ধোঁকা দিলে তার মৃত্যু এমন অবস্থায় হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের ঘ্রাণও হারাম করে দেবেন।

৪. নিজ জাতির প্রয়োজনের প্রতি খেয়াল রাখা। নবি (সা.) বলেন-'যে রাজা ও গভর্নর মুখাপেক্ষী ও দুর্বলদের জন্য নিজ দরজা বন্ধ রাখে, আল্লাহ তার প্রয়োজন ও মুখাপেক্ষিতার জন্য আকাশের দরজা বন্ধ রাখেন।

৫. প্রজাদের সাথে বদান্যতা দেখানো। 

৬. প্রজাদের সাথে কোমল আচরণ করা। নবি (সা.) গভর্নরদের জন্য এই বলে দুআ করেছেন-'হে আল্লাহ। যে ব্যক্তিকে আমার উম্মতের কোনো কাজের জিম্মাদার বানানো হয়, সে যদি তাদের সাথে কঠোর আচরণ করে, তাহলে আপনিও তার সাথে কঠোর আচরণ করুন। আর যে ব্যক্তি জিম্মাদার হয়ে তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করবে, আপনিও তার সাথে নম্র আচরণ করুন। '

৭. বড়োত্ব না দেখানো। 

৮. জ্ঞানীদের সম্মান প্রদর্শন করা। 

৯. গোয়েন্দাগিরি না করা। নবি (সা.) বলেন- 'রাজা যখন নিজ প্রজাদের সন্দেহের চোখে দেখে, তখন সে তাদের বিগড়ে দেয়। '

১০. ক্ষমতায় আসার আগে যে ব্যক্তি উপহার-উপঢৌকন দিত না, তার উপহার গ্রহণ না করা। নবি (সা.) বলেন- 'রাজাকে উপহার-উপঢৌকন দেওয়া খেয়ানত। '

ক. প্রজার জন্য পালনীয় রাজা সংশ্লিষ্ট শরয়ি শিষ্টাচার

১. রাজার কথা মানা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'হে ঈমানদারগণ। আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। 

২. রাজার প্রতি শিষ্টাচার দেখানো। নবি (সা.) বলেন-'তোমাদের কাছে কোনো গোত্রের সম্ভ্রান্ত কেউ এলে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করো। 

৩. রাজাকে ভয় করা, সে যতই নম্র হোক। 

৪. তার জন্য দুআ করা।

৫. তার অনুপস্থিতিতে সমালোচনা না করা।

৬. রাজার দরজা ঘিরে না রাখা। 

৭. অল্পস্বল্প সাহায্য কামনা করা। তবে অক্ষম হলে অধিক সাহায্যও চাওয়া যায়।

জিহাদ সংশ্লিষ্ট শরয়ি শিষ্টাচার

১. আল্লাহ পাকের কালিমা বুলন্দ করার উদ্দেশ্যে জিহাদ করা। নবি (সা.) বলেন-'যে ব্যক্তি আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করার উদ্দেশ্যে জিহাদ করল, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পথেই যুদ্ধ করল।'

২. জিহাদের জন্য বের হওয়ার আগে সমস্ত গুনাহ থেকে তওবা করা। 

৩. জিহাদের আগে নেক আমলে মনোনিবেশ করা। বারা (রা.) বলেন-'নবি (সা.)-এর কাছে অস্ত্রসজ্জিত এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুসলিম হব নাকি জিহাদ করব? তিনি বললেন-আগে মুসলিম হও, পরে জিহাদ করো।'

৪. জিহাদের জন্য বের হওয়ার আগে পিতা-মাতার অনুমতি নেওয়া। 'পিতা-মাতার অনুমতি ব্যতীত জিহাদ করতে আসা জনৈক ব্যক্তিকে নবি (সা.) বললেন-যাও, ফিরে গিয়ে পিতা-মাতার অনুমতি চাও। তাঁরা অনুমতি দিলে যুদ্ধে এসো। অথবা তাঁদের আনুগত্য করো। 

৫. জিহাদে বের হওয়ার আগে ঋণ পরিশোধ করা। 

৬. সামর্থ্য অনুসারে জিহাদের সরঞ্জাম প্রস্তুত করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ববাহিনী সদা প্রস্তুত রাখো। যা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু আর তোমাদের শত্রুদের। 

৭. সামর্থ্যবান ও শক্তিশালী সৈন্য বাছাই করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর।' 

৮. সৈন্যদের জন্য সরঞ্জাম ব্যবস্থা করে দেওয়া এবং তাদের পরিবার-পরিজনের খোঁজখবর নেওয়া। নবি (সা.) বলেন-'যে ব্যক্তি যোদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত করে দিলো, সেও যেন যুদ্ধ করল। আর যে ব্যক্তি যোদ্ধার অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের খোঁজখবর নিল, সেও যেন যুদ্ধ করল।

৯. নেতার জন্য নিজ বাহিনীকে সদুপদেশ দেওয়া। তাদের আল্লাহর আনুগত্যের এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দেওয়া। জিহাদ সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানও শিক্ষা দেওয়া। বুরাইদা (রা.) বলেন- 'রাসূল (সা.) কোনো বাহিনীর নেতা নির্বাচন করে বলে দিতেন-আল্লাহর নামে, আল্লাহর রাহে, আল্লাহর শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করো। আর খেয়ানত করো না। 

১০. সেনাপ্রধান ও বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দেওয়া এবং বিদায়ের সময় হাদিসে বর্ণিত দুআ পড়া। আবদুল্লাহ আল খিতমি বলেন-নবি (সা.) কোনো বাহিনীকে বিদায় দেওয়ার সময় বলতেন-اسْتَوْدِعُ اللَّهَ دِينَكُمْ وَأَمَا نَتِكُمْ وَخَوَاتِيمَ أَعْمَالِكُمْ -'তোমাদের দ্বীন, আমানত এবং শেষ আমলসহ বিদায় দিচ্ছি। 

১১. সৈন্যদের সফর সংশ্লিষ্ট শরয়ি শিষ্টাচারের প্রতি লক্ষ রাখা।

১২. পাপ কাজের নির্দেশ ছাড়া নেতার সব হুকুমে আনুগত্য করা। নবি (সা.) বলেন-'গুনাহ ব্যতীত পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় সকল ক্ষেত্রে মুমিনের জন্য নেতার আদেশ শোনা ও মানা আবশ্যক। কিন্তু যখন কোনো গুনাহের আদেশ দেওয়া হবে, তখন তা আর শোনা ও মানা যাবে না।

১৩. বাস্তবিক অর্থেই শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা করা। নবি (সা.) বলেন- 'শপথ ওই সত্তার, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমার আশা হয়, আমি আল্লাহর রাহে জিহাদ করে শহিদ হব, এরপর আবার জীবিত হব, তারপর আবার শহিদ হব। এভাবে পুনরায় জীবিত হব, পুনরায় শহিদ হব। 

১৪. সম্ভব হলে হাদিসে বর্ণিত সংখ্যা অনুযায়ী সৈন্য রাখা। নবি (সা.) বলেন-'উত্তম সঙ্গী চারজন, উত্তম দল চার শ, উত্তম বাহিনী চার হাজার। আর অল্প হওয়ার কারণে বারো হাজার সৈন্যের বাহিনীও কখনো পরাজিত হবে না।'

১৫. সৈন্যসংখ্যা অধিক হলে আত্মতৃপ্তিতে না ভোগা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'এবং হুনাইনের দিনে-যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের প্রফুল্ল করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে তোমরা পলায়ন করেছিলে। 

১৬. সেনাপতির জন্য অন্য সেনাদের সাথে পরামর্শ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'এবং কাজকর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।'

১৭. গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো বণ্টন করে দেওয়া।

'নবি (সা.) কোনো এক সফরে ছিলেন। তিনি সাহাবিদের একটি বকরি জবাইয়ের আদেশ দিলেন। একজন বলল, আমি জবাই করব। অন্যজন বলল, আমি চামড়া ছিলাব। আরেকজন বলল, আমি রান্না করব। আরেকজন বলল, আমি রান্নার জন্য কাঠ কুড়িয়ে দেবো।'

১৮. শত্রুবাহিনীর খবর সংগ্রহের জন্য গোয়েন্দা প্রেরণ করা। আনাস (রা.) বলেন-'নবি (সা.) বাসিসা (রা.)-কে আবু সুফিয়ানের বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানার জন্য গোয়েন্দা বানিয়ে প্রেরণ করেছিলেন।'

১৯. শত্রুদের গতি পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা। অর্থাৎ তারা যাতে যুদ্ধে আগ্রহী না হয়-এই আকাঙ্ক্ষা করা। নবি (সা.) বলেন-'তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করো না। তবে মুখোমুখি হয়ে গেলে ধৈর্যের পরিচয় দাও। '

২০. শত্রুপক্ষের সামনে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করা, দুর্বলতা প্রকাশ না করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও, তবে তোমরাই জয়ী হবে। '

নবি (সা.) বলে-'তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হওয়া কামনা করো না। তবে মুখোমুখি হয়ে গেলে ধৈর্যের পরিচয় দাও। '

২১. বক্ষ সটান করে বীরত্ব দেখিয়ে শত্রুর সামনে চলা। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন-আবু দুজানা বীরত্ব প্রকাশ করে হাঁটলেন। রাসূল (সা.) দেখে বললেন- 'যুদ্ধের ময়দান ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালা এই হাঁটাকে অপছন্দ করেন। '

২২. জিহাদের আগে হাদিসে বর্ণিত দুআ পড়া। আনাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে বলতেন-

اللَّهُمَّ أَنْتَ عَضُدِي وَنَصِيرِي بِكَ أَحُولُ وَبِكَ أَصُولُ وَبِكَ أَقَاتِلُ

'হে আল্লাহ! আপনি আমার শক্তির উৎস ও সাহায্যকারী। আপনার সাহায্যেই আমি কৌশল অবলম্বন করি, আপনার সাহায্যেই আমি বিজয়ী হই এবং আপনার সাহায্যেই আমি যুদ্ধ করি। '

২৩. শত্রুদের যুদ্ধের আগে হাদিসে বর্ণিত তিনটি বিষয়ের প্রতি আহ্বান করা। নবি (সা.) বলেন- 'যখন তুমি মুশরিক শত্রুর সম্মুখীন হবে, তখন তাদের তিনটি বিষয়ের দিকে আহ্বান জানাবে। তারা এগুলোর যেটিই গ্রহণ করে, তুমি তা মেনে নেবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়াবে। প্রথমে তাদের ইসলামের দাওয়াত দেবে। যদি তারা এ আহ্বানে সাড়া দেয়, তবে তুমি তা মেনে নেবে এবং যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়াবে। আর যদি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তাহলে জিজিয়া প্রদানের প্রস্তাব দেবে। যদি তারা তা গ্রহণ করে, তবে তুমি তা মেনে নেবে এবং যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে। আর যদি তারা এ দাবিও না মানে, তবে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে। '

২৪. দিনের শুরুতে কিংবা সূর্য ঢলার সময় যুদ্ধ আরম্ভ করা। ইবনে মুকাররিন (রা.) বলেন-'আমি নবি (সা.)-কে দেখেছি, দিনের গুরুভাগে তিনি যুদ্ধ আরম্ভ না করলে সূর্য ঢলে গিয়ে বাতাস প্রবাহিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। কেননা সে সময় সাহায্য অবতীর্ণ হয়। '

২৫. আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করা এবং তাঁরই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তাহলে কেউ তোমাদের ওপর পরাক্রান্ত হতে পারবে না। আর যদি তিনি তোমাদের সাহায্য না করেন-তবে এমন কে আছে, যে তোমাদের সাহায্য করবে? আর মুমিনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত। '

২৬. সাহায্যকে আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত মনে করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'অনেক যুদ্ধক্ষেত্রে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন। '

২৭. যুদ্ধের সময় বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন কোনো বাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত হও, তখন সুদৃঢ় থাকো এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো, যাতে তোমরা কৃতকার্য হতে পারো।'

২৮. যুদ্ধে অবিচল থাকা, পৃষ্ঠপ্রদর্শন না করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'হে ঈমানদারগণ। তোমরা যখন কাফিরদের মুখোমুখি হবে, তখন পশ্চাৎপসরণ করবে না।

২৯. যুদ্ধের সময় ময়দান ত্যাগ না করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আর যে লোক সেদিন তাদের থেকে পশ্চাৎপসরণ করবে, অবশ্য যে লড়াইয়ের কৌশল পরিবর্তনকল্পে কিংবা যে নিজ সৈন্যদের নিকট আশ্রয় নিতে আসে, সে ব্যতীত অন্যরা আল্লাহর গজব সাথে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে। আর তার ঠিকানা হলো জাহান্নাম। আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল।'

৩০. যুদ্ধ চলার সময় অকারণে উঁচু আওয়াজে কথা না বলা। কাইস ইবনে উব্বাদ বলেন-'নবিজির সাহাবিরা যুদ্ধের সময় আওয়াজ উঁচু করতে অপছন্দ করতেন।'

৩১. আশ্রয়দাতার আশ্রয়ের মূল্যায়ন করা-যদিও কোনো মহিলা আশ্রয় দিয়ে থাকে।

'উম্মু হানি (রা.) যখন জনৈক মুশরিক ব্যক্তিকে আশ্রয় দিলেন, তখন নবি (সা.) তাঁকে বললেন-তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছ, আমরাও তাকে আশ্রয় দিলাম।

৩২. প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা। ধোঁকা না দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'নিশ্চয়ই আল্লাহ ধোঁকাবাজ-প্রতারককে পছন্দ করেন না।'

নোট: শত্রুকে পরাজিত করার জন্য কৌশল অবলম্বন করা জায়েজ আছে। নবি (সা.) বলেন-'যুদ্ধ হলো কৌশলক্ষেত্র।'

৩৩. বিজয়ের পর কৃতজ্ঞতার নামাজ পড়া। আবু বাকরা (রা.) বলেন-'নবি (সা.) কোনো সুসংবাদ পেলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় সিজদাবনত হতেন।'

৩৪. দূত প্রেরণ করে বিজয়ের সুসংবাদ দেওয়া। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সুসংবাদ দেওয়া যেতে পারে।

'জুল খালসাহ নামক মূর্তি জ্বালানোর জন্য নবি (সা.) জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-কে প্রেরণ করলেন। তিনি মূর্তিটি জ্বালিয়ে নবি (সা.)-কে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য জনৈক ব্যক্তিকে পাঠালেন। '

৩৫. শত্রুপক্ষের নিহতদের মুসলা (অর্থাৎ নাক, কান ইত্যাদি) না কাটা। সামুরা ইবনে জুন্দুব (রা.) বলেন-'নবি (সা.) আমাদের সাদাকা করতে উৎসাহিত করেছেন এবং মুসলাহ করতে নিষেধ করেছেন। '

৩৬. মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধদের হত্যা না করা। আবদুল্লাহ (রা.) বলেন-'নবি (সা.) মহিলা ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। '

৩৭. বন্দিদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার্য দান করে। '

৩৮. বন্দিদের মাঝে মা ও ছোটো সন্তান একসাথে থাকলে তাদের পৃথক না করা। এমনিভাবে ছোটোদের সাথে মাহরাম নিকটাত্মীয় থাকলেও পৃথক না করা। আলি (রা.) বলেন-'আমি বন্দিদের মাঝে এক দাসীকে তার সন্তানকে পৃথক করে দিলে নবিজি তা করতে বারণ করেন এবং বিক্রয় চুক্তি ভঙ্গ করে দেন। '

৩৯. গনিমতের সম্পদে খেয়ানত না করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আর যে ব্যক্তি খেয়ানত করবে, সে খেয়ানতকৃত বস্তুসহ কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। 

৪০. বণ্টনের আগে গনিমতের মাল ব্যবহার না করা। তবে প্রয়োজনে খাবার জাতীয় জিনিস ব্যবহার করা যেতে পারে। আবদুর রহমান ইবনে সামুরা বলেন-'রাসূল (সা.) বণ্টনের আগে গনিমতের মাল ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। '

৪১. বিজিত অঞ্চলে কিছুদিন অবস্থান করা। আবু তালহা (রা.) বলেন-'নবি (সা.) কোথাও বিজয়ী হলে সেখানে তিন দিন পর্যন্ত অবস্থান করতেন। '

৪২. বিজিত অঞ্চলে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টি না করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'তারা এমন লোক, যাদের আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ্য দান করলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। '

৪৩. দেশে থাকা সাধারণ মুসলমানদের জন্য যুদ্ধফেরত সৈন্যদের অভিনন্দন জানানোর জন্য এগিয়ে যাওয়া। আস-সায়িব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেন-'রাসূল (সা.)-কে অভিবাদন জানানোর জন্য আমরা আমাদের শিশুদের নিয়ে সানিয়্যাতুল ওয়াদায় যেতাম। '

কয়েদি সংশ্লিষ্ট শরয়ি শিষ্টাচার

১. নিজের পূর্ণ মনোনিবেশ আল্লাহর দিকে রাখা। 

২. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া। 

৩. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও থেকে মুক্তির আশা না করা। 

৪. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে অভিযোগ-অনুযোগ না করা। 

৫. বন্দি থাকা অবস্থায় শাহাদাতের মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেলে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নেওয়া। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন-'মুশরিকরা খুবাইব (রা.)-কে হত্যা করার জন্য তাঁকে হারাম শরিফ থেকে বাইরে নিয়ে গেল। তিনি বললেন, আমাকে সুযোগ দাও, দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিই। এরপর ফিরে এসে বললেন, যদি তোমাদের এ ধারণা না হতো-আমাকে মৃত্যুভয় কাবু করে ফেলেছে, তাহলে আমি নামাজকে আরও দীর্ঘায়িত করতাম।'

আবু হুরায়রা (রা.) আরও বলেন- 'খুবাইবই প্রথম ব্যক্তি, যিনি মৃত্যুর আগে দুই রাকাত নামাজের রীতি চালু করেছেন। '

বিচারকার্য সংশ্লিষ্ট শরয়ি শিষ্টাচার

১. বিচারপতি পদের গুরুত্ব অনুধাবন করা। নবি (সা.) বলেন- 'যাকে বিচারপতির দায়িত্ব দেওয়া হলো, তাকে যেন ছুরি ছাড়াই জবাই করা হলো।' 

২. পদ কামনা না করা। নবি (সা.) বলেন-'যে বিচারপতির পদ কামনা করে, তা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। আর যে তা অপছন্দ করার পরও দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে, আল্লাহ তাকে সাহায্যের জন্য একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে দেবেন। '

৩. অযোগ্য লোকের এ পদ গ্রহণ না করা। নবি (সা.) বলেন- 'নেতৃত্ব যখন অযোগ্যের কাঁধে অর্পিত হয়, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো। '

৪. শরিয়াহ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'হে দাউদ। আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছি। অতএব, তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়সংগতভাবে ফয়সালা করো, আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। করলে তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। '

৫. সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা। 

৬. সময় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া। মুয়াজ (রা.) বলেন-'কুরআন ও সুন্নাহয় সমাধান না পেলে আমি আমার বিবেক দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করব। '

৭. রাগান্বিত অবস্থায় সিদ্ধান্ত না দেওয়া। নবি (সা.) বলেন- 'কোনো বিচারক যেন রাগান্বিত অবস্থায় দুজনের মাঝে বিচার না করে। '

৮. বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষের কথা না শুনে সিদ্ধান্ত না দেওয়া। নবি (সা.) বলেন- 'যখন তুমি দুই পক্ষের মুকাদ্দামা সমাধান করতে বসবে, তখন এখম পক্ষের বক্তব্য শোনার মতো দ্বিতীয় পক্ষের বক্তব্যও না শোনা পর্যন্ত ফয়সালা করবে না। '

৯. কারও বাষ্পটুতায় প্রভাবিত হয়ে তার প্রতি ঝুঁকে না যাওয়া। নবি (সা.) বলেন-'আমি তো একজন মানুষ। আর তোমরা আমার কাছে বিবাদ মীমাংসার জন্য এসে থাকো। তোমাদের একপক্ষ অন্য পক্ষ অপেক্ষা দলিল-প্রমাণ পেশ করার ক্ষেত্রে বেশি পারদর্শী হতে পারে। ফলে আমি আমার শোনার কারণে যদি কাউকে তার ভাইয়ের হক দিয়ে দিই, তাহলেও যেন সে তা গ্রহণ না করে। কেননা, আমি তার জন্য জাহান্নামের একটা অংশই পৃথক করে দিচ্ছি। 

১০. উভয়পক্ষের মাঝে ভারসাম্য বিধান করা। আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) বলেন-'রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, বাদী-বিবাদী উভয়পক্ষ বিচারকের সামনে সমান্তরালে বসবে। '

১১. সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য ঘুস গ্রহণ না করা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন-'বিচারকার্যে ঘুসদাতা ও ঘুসগ্রহীতা উভয়কেই রাসূল (সা.) অভিসম্পাত করেছেন। '

১২. বিচারপতি হওয়ার আগে যাদের তরফ থেকে উপহার-উপঢৌকন আসত না, বিচারপতি হওয়ার পর তাদের উপহার গ্রহণ না করা। নবি (সা.) বলেন-'সাদাকা উসুলকারীর কী হলো। আমি তাকে পাঠাই, আর সে এসে বলে-এটা আপনার আর ওটা আমার। সে তার বাপ-মায়ের ঘরে বসে দেখুক, তাকে এভাবে উপহার-উপঢৌকন দেওয়া হয় কি না?'

১৩. অপবাদের ক্ষেত্র থেকে নিজেকে বাঁচানো। উমর (রা.) বলেন-'যে অপবাদের পথ অবলম্বন করবে, সে অপবাদগ্রস্ত হবে। '

১৪. একই ব্যাপারে বিপরীতমুখী দুই সিদ্ধান্ত না দেওয়া। নবি (সা.) বলেন-'তোমাদের কেউ যেন একই ব্যাপারে দুই সিদ্ধান্ত না দেয়। 

১৫. নিজের আত্মীয়স্বজন বা সম্ভ্রান্ত লোকদের সাথে স্বজনপ্রীতির আচরণ না করা। নবি (সা.) বলেন-'তোমাদের পূর্বেকার উম্মাহ এজন্য ধ্বংস হয়েছে-তাদের মধ্যকার সম্ভ্রান্ত কেউ চুরি করলে তারা তার বিচার করত না। কিন্তু দুর্বল কেউ চুরি করলে তারা তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তাঁর হাত কেটে দিতাম।

১৬. এতিমদের মোকাদ্দমায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা। 

১৭. জনসাধারণের জন্য নিজেকে আদর্শ প্রমাণিত করা।

১৮. বিচারপতির নিজ সহযোগীদের ফ্যাসাদ থেকে বিরত রাখা। 

১৯. নীরবতা ও ভাবগাম্ভীর্য অবলম্বন করা। 

সাক্ষীর শরয়ি শিষ্টাচার

১. সাক্ষীর ঘুস না নেওয়া। নবি (সা.) বলেন-'ঘুসদাতা ও গ্রহীতা উভয়ে জাহান্নামি। '

২. সত্য সাক্ষ্য দেওয়া। 

৩. প্রয়োজনের সময় আমানতদারির সাথে সাক্ষী দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। '

৪. সত্য সাক্ষীতে অবিচল থাকা। 

৫. সাক্ষ্যের ব্যাপার ভালোভাবে স্মরণ রাখা। 

৬. বিচারকের সামনে তর্ক কম করা। 


শেষ কথাঃ 

প্রিয় পাঠক আর্টিকেলের সর্বশেষে এসে বলা যায় যে, আপনি যদি সুখী সমৃদ্ধ এবং শান্তিময় জীবন-যাপন করতে চান তাহলে উপরোক্ত আলোচনা মোতাবেক ইসলামের গাইডলাইন মোতাবেক নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন। আশাকরি জীবন পাল্টে যাবে ইনশাআল্লাহ। 

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url