জুমার দিনের আদব ও শিষ্টাচার

ক. জুমার দিনের শরয়ি শিষ্টাচার

১. এই দিন বেশি বেশি নেক আমল করা এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কারণ, দিনসমূহের মধ্যে এই দিনটি হলে সর্বোত্তম দিন। নবি (সা.) বলেছেন- 'দিনসমূহের মাঝে শ্রেষ্ঠ দিন হলো জুমার দিন। '

২. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়া। নবি (সা.) বলেছেন- 'দিনসমূহের মাঝে শ্রেষ্ঠ হলো জুমার দিন। অতএব, তোমরা এদিন আমার ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ পড়ো। তোমাদের পড়া দরুদ এদিন আমার কাছে পেশ করা হয়।

৩. জুমার দিন দুআ কবুলের নির্দিষ্ট সময়টি অনুসন্ধান করা। নবি (সা.) বলেছেন-'তোমরা জুমার দিন দুআ কবুলের নির্দিষ্ট সময়টি আসর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনুসন্ধান করো। 

৪. জুমার দিন ফজর নামাজে সূরা আস-সিজদা এবং সূরা দাহর তিলাওয়াত করা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন-'নবি (সা.) জুমার দিন ফজরের নামাজে সূরা আস-সিজদা ও সূরা দাহর তিলাওয়াত করতেন। 

৫. সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করা। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে, পরবর্তী জুমা পর্যন্ত তার জন্য একটি নূর প্রজ্বলিত করে দেওয়া হবে। 

৬. জুমার দিন পরার জন্য নিজের সর্বোত্তম পোশাকটি নির্ধারণ করা। নবি (সা.) বলেছেন-'তোমাদের সক্ষমতা থাকলে জুমার দিনের জন্য দুটি উত্তম পোশাক নির্ধারণ করো। 

খুতবার আদব ও শিষ্টাচার
জুমার দিনের আদব ও শিষ্টাচার

খ. জুমার নামাজের আদব ও শিষ্টাচার

১. জুমার নামাজ আদায়ে অবহেলা না করা। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি অবহেলা করে একটানা তিন জুমা ত্যাগ করবে, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেবেন।

২. জুমার নামাজের জন্য গোসল করা। নবি (সা.) বলেছেন- 'জুমার দিন যে অজু করল, সে ভালো কাজ করল। আর যে গোসল করল, সে সর্বোত্তম কাজ করল। 

৩. মিসওয়াক করা। নবি (সা.) বলেছেন-'জুমার দিন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জন্য গোসল ও মিসওয়াক করা আবশ্যক।'

৪. তেল দেওয়া। নবি (সা.) বলেছেন- 'যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে ও যথাসম্ভব উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে এবং তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে আসে। অতঃপর দুজনের মধ্যে ফাঁক না রেখে নামাজ আদায় করে। ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় চুপ থাকে, তাহলে তার এ জুমা থেকে পূর্ববর্তী জুমার মধ্যকার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। 

৫. নিজের কাছে থাকা কাপড়গুলোর মধ্যে সর্বোত্তম কাপড় পরিধান করা। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে যথাযথভাবে পবিত্রতা অর্জনের পর উত্তম পোশাক পরিধান করে। আর ব্যবহার করে সুগন্ধি। এরপর জুমায় এসে বিরত থাকে অনর্থক আচরণ থেকে; এমনকি মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে সামনে অগ্রসর না হয়ে যেখানে স্থান পায় সেখানেই বসে যায়, তাহলে তার এই জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

৬. সুগন্ধি ব্যবহার করা। নবি (সা.) বলেছেন- 'জুমার দিন যে সুগন্ধিই পাওয়া যায়, তা ব্যবহার করবে; এমনকি যদিও তা হয় মহিলাদের সুগন্ধি।'

৭. জুমার দিন আগেভাগে মসজিদে যাওয়া। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি জুমার দিন জানাবাতের (ফরজ) গোসলের ন্যায় গোসল করে সবার আগে মসজিদে আগমন করল, সে যেন একটি উট কুরবানি করল। আর যে ব্যক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে আগমন করল, সে যেন কুরবানি করল একটি গাভি। তৃতীয় পর্যায়ে আগমনকারী যেন কুরবানি করল একটি দুম্বা। চতুর্থ পর্যায়ে আগমনকারী কুরবানি করল একটি মুরগি। আর পঞ্চম পর্যায়ে আগমনকারী কুরবানি করল একটি ডিম।'এরপর ইমাম যখন খুতবা দিতে শুরু করেন, তখন ফেরেশতারা খুতবা শোনার জন্য বসে যায়। 

৮. জুমার প্রথম আজানের পর সব কাজ বাদ দিয়ে মসজিদে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'হে মুমিনগণ। জুমার দিন যখন নামাজের জন্য ডাকা হয়, তখন আল্লাহর স্মরণের দিকে শীঘ্র ধাবিত হও, ক্রয়-বিক্রয় পরিত্যাগ করো। এটাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে।

৯. সম্ভব হলে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়া। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালোভাবে গোসল সেরে সবার আগে মসজিদে আসে এবং ইমামের নিকটে বসে মনোযোগের সাথে খুতবা শোনে, তাহলে তার প্রত্যেক কদমের বদলে এক বছর রোজা ও রাত্রিজাগরণ করে ইবাদত করার সওয়াব দেওয়া হবে।

১০. মসজিদে যাওয়া এবং মসজিদে অবস্থানের আদব ও শিষ্টাচারের প্রতি খেয়াল রাখা।

১১. দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ পড়া। নবি (সা.) বলেছেন-'তোমাদের কেউ মসজিদে গেলে বসার আগেই যেন দুই রাকাত নামাজ পড়ে নেয়।

১২. জুমার নামাজের আগে তালিমের জন্য গোল হয়ে না বসা। আমর ইবনে শুআইব পিতার সূত্রে তাঁর দাদা থেকে বর্ণনা করেন-'নবি (সা.) জুমার দিন নামাজের পূর্বে গোল হয়ে বসতে নিষেধ করেছেন।

১৩. লোকদের কাঁধ ডিঙিয়ে সামনে না যাওয়া। আবদুল্লাহ ইবনে বুসর বলেন-'নবি (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় জনৈক ব্যক্তি লোকদের কাঁধ ডিঙিয়ে সামনে আসছিল। নবি (সা.) তাকে বললেন-বসে যাও, কারণ তুমি মানুষকে কষ্ট দিচ্ছ।'

১৪. প্রথম কাতারে বসার চেষ্টা করা। নবি (সা.) বলেছেন- 'আল্লাহ তায়ালা এবং তাঁর ফেরেশতারা প্রথম কাতারে রহমত নাজিল করেন। 

১৫. ইমামের নিকটবর্তী হয়ে বসা। নবি (সা.) বলেছেন-'জুমার নামাজে অংশগ্রহণ করো এবং ইমামের কাছাকাছি বসো। 

১৬. কাউকে উঠিয়ে দিয়ে তার স্থানে না বসা। নবি (সা.) বলেছেন-'তোমাদের কেউ যেন তার ভাইকে উঠিয়ে দিয়ে তার স্থানে না বসে; বরং এ কথা বলে-আমাকে বসারও একটু সুযোগ করে দাও।'

১৭. পাশাপাশি থাকা দুজনের মধ্যখানে এসে না বসা। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে গোসল করে এবং উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জনের পর পরিধান করে উত্তম পোশাক। আর ব্যবহার করে সুগন্ধি। এরপর জুমায় এসে বিরত থাকে অনর্থক আচরণ থেকে; এমনকি মানুষের কাঁধ ডিঙিয়ে সামনে অগ্রসর না হয়ে যেখানে স্থান পায় সেখানেই বসে যায়, তাহলে তার এই জুমা থেকে পরবর্তী জুমার মধ্যবর্তী সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। 

১৮. তন্দ্রা এলে স্থান পরিবর্তন করা। তবে খুতবার সময় স্থান পরিবর্তন করা অনুচিত। নবি (সা.) বলেছেন-'জুমার দিন তন্দ্রা এলে তোমরা সঙ্গীর স্থানে চলে যাবে, আর তাদের পাঠিয়ে দেবে নিজের স্থানে।

১৯. খুতবার পর অনতিবিলম্বে নামাজ শুরু করা। 'খুতবা শেষ হওয়া মাত্রই নামাজ শুরু করবে। অযথা দুনিয়াবি কারণে খুতবা শেষ হওয়ার পরও বিলম্বে নামাজ শুরু করা মাকরুহ। 

২০. জুমার নামাজে হাদিসে বর্ণিত সূরা দিয়ে কেরাত পড়া। 

২১. খুতবা থেকে নামাজকে দীর্ঘায়িত করা। নবি (সা.) বলেছেন-'নামাজ দীর্ঘ করা এবং খুতবা ছোটো করা বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন। অতএব, নামাজ দীর্ঘ করো, আর সংক্ষিপ্ত করো খুতবা। 

২২. জুমার নামাজের পরপর সুন্নত ও নফল পড়ার জন্য স্থান পরিবর্তন করা। আতা (রহ.) বলেন-'আমি দেখেছি, ইবনে উমর (রা.) জুমার দিন ফরজ পড়ার পর নিজ স্থান থেকে সামান্য সরে দুই রাকাত নামাজ পড়েছেন।

২৩. জুমার নামাজের পর সাতবার সূরা ইখলাস, সাতবার সূরা নাস ও সাতবার সূরা ফালাক পড়া। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি জুমার নামাজের পর সাতবার সূরা ইখলাস, সাতবার সূরা নাস ও সাতবার সূরা ফালাক পড়বে, আল্লাহ তাকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। 

২৪. জুমার নামাজ শেষে রিজিকের অনুসন্ধান করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-'অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো।'

গ. খুতবার আদব ও শিষ্টাচার

১. মিম্বারে আরোহণের পর আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত বসে থাকা। ইবনে উমর (রা.) বলেন-'নবি (সা.) মিম্বারে আরোহণের পর মুয়াজ্জিন আজান শেষ না করা পর্যন্ত বসে থাকতেন।'

২. দাঁড়িয়ে খুতবা দেওয়া। জাবির (রা.) বলেন- 'রাসূল (সা.) দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। 

৩. দুটি খুতবা দেওয়া। জাবির ইবনে সামুরা (রা.) বলেন-'নবি (সা.) দুটি খুতবা দিতেন। 

৪. প্রয়োজনে উঁচু আওয়াজে খুতবা দেওয়া। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন-'রাসূল (সা.) যখন খুতবা দিতেন, তখন তাঁর চক্ষু লাল হয়ে যেত এবং উচ্চ থেকে উচ্চতর হতো তাঁর আওয়াজ।'

৫. খুতবা সংক্ষেপে দেওয়া। নবি (সা.) বলেছেন-'নামাজ দীর্ঘ করা ও খুতবা ছোটো করা বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন। অতএব, নামাজ দীর্ঘ করো ও খুতবা সংক্ষিপ্ত করো।

৬. আল্লাহর হামদ ও সানা এবং রাসূল (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়ার মাধ্যমে খুতবা শুরু করা।

৭. হামদ, সানা ও দরুদ পাঠের পর 'আম্মাবাদ' বলা। আয়িশা (রা.) বলেন-'রাসূল (সা.) খুতবার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করতেন। এরপর বলতেন-আম্মাবাদ।'

৮. খুতবায় কুরআন থেকে তিলাওয়াত করা। জাবির ইবনে সামুরা (রা.) বলেন-'নবি (সা.) দুটি খুতবা দিতেন। উভয় খুতবার মধ্যখানে বসতেন। প্রত্যেক খুতবায় তিনি কুরআন থেকে তিলাওয়াত করতেন। আর দিতেন লোকদের উপদেশ।'

৯. খুতবায় সূরা কাফ থেকে বেশি বেশি তিলাওয়াত করা। আমরাহ (রা.)-এর বোন বলেন-'আমি কাফ ওয়াল কুরআনিল মাজিদ জুমার দিন রাসূল (সা.)-এর মুখ থেকে শুনে শুনেই মুখস্থ করেছি। তিনি প্রত্যেক জুমাতেই মিম্বারে দাঁড়িয়ে এ সূরা থেকে তিলাওয়াত করতেন।

নোট: সাময়িক প্রয়োজনে খুতবা বন্ধ রাখা যায়।

'রাসূল (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন। এ সময় ইবনে মাসউদ (রা.) এসে মসজিদের দরজায় বসলে নবি (সা.) খুতবার মাঝেই তাঁকে ডাক দিয়ে বললেন-হে ইবনে মাসউদ। এদিকে এসো।

১০. দুই খুতবার মধ্যখানে নীরব হয়ে কিছুক্ষণ বসা। ইবনে উমর (রা.) বলেন-'নবি (সা.) দুটি খুতবা দিতেন। তিনি মিম্বারে আরোহণের পর মুয়াজ্জিন আজান দিত। আজান শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বসে থাকতেন। এরপর দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। খুতবা শেষে আবার বসতেন। এ সময় চুপ থাকতেন। একটু পর দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় খুতবা দিতেন।'

১১. মুসল্লিরা ইমামের দিকে মুখ করে বসবে। সাবিত বলেন-'নবি (সা.) যখন মিম্বারে দাঁড়াতেন, তখন সাহাবায়ে কেরাম তাঁর দিকে মুখ করে বসতেন। 

১২. খুতবা শোনার সময় চুপ থাকা। নবি (সা.) বলেছেন-'যে ব্যক্তি জুমার দিন উত্তমরূপে অজু করে মসজিদে যায় এবং নামাজ শেষ না করা পর্যন্ত চুপ থাকে, তাহলে তা তার জন্য এ জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত সমুদয় গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।'

১৩. খুতবার সময় দুই পা খাড়া করে না বসা। আনাস (রা.) বলেন- 'জুমার দিন খুতবার সময় দুই পা খাড়া করে বসতে নবি (সা.) নিষেধ করেছেন।

১৪. খুতবার সময় কথা না বলা; এমনকি কেউ কথা বললে তাকে চুপ থাকার নির্দেশ দেওয়ার জন্যও কথা না বলা। নবি (সা.) বলেছেন- 'খুতবা সময় যে ব্যক্তি "চুপ করো"ও বলল, সে ভুল কাজ করল।'

১৫. কারণ ছাড়াই নড়াচড়া না করা। এমনিভাবে কঙ্কর, কার্পেট, চাটাই ইত্যাদি নিয়ে খেলাধুলা না করা। নবি (সা.) বলেছেন-'যে পাথর নাড়ল, সে ভুল কাজ করল। 

১৬. খুতবার সময় সুন্নত বা নফল নামাজ না পড়া। ইবনে শিহাব বলেন-'খুতবার জন্য ইমামের বের হওয়া নামাজের ইতি টানে, আর তাঁর কথা বলা মানুষের কথা বন্ধ করে। 


পরিশেষেঃ


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url