মহানবী সাঃ সাথে আবু জাহলের অসদ্ব্যবহার
প্রিয় পাঠক, পূর্বেই জানতে পেরেছেন যে, আবুল আরকমের পুত্র আরকম ইসলাম গ্রহণ করার পর হতে রাসূল (সাঃ) অধিকাংশ সময় তাঁর বাসগৃহে অবস্থান করেই ধর্ম প্রচার করতেন এবং নওমুসলিমদেরকে 'ইবাদত বন্দেগীর নিয়ম-পদ্ধতি শিক্ষা দিতেন। একদিন আবু জাহল 'সাফা' পবর্তের পথে হযরত আরকমের বাড়ীর নিকট দিয়ে যেতেছিল। তখন রাসুল (সাঃ) আরকমের বাড়ীর সম্মুখে দাঁড়ায়ে ছিলেন। পাপিষ্ঠ আবু জাহল তাঁকে দেখে প্রথমে নানা প্রকার ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে এবং কটুবাক্য বলে তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবার চেষ্টা করল, কিন্তু ধৈর্যের পাহাড় হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) তাতে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হলেন না। তৎপর নরাধম অশ্লীল ভাষায় তাঁকে গালাগালি করতে লাগল এবং ধর্মের কুৎসা ও গ্লানি করতে লাগল।
তাতেও মুস্তফা-হৃদয়ে বিন্দুমাত্র ক্রোধের সঞ্চার হল না। তাঁর পবিত্র মুখমন্ডল উত্তেজনার চিহ্নমাত্র দেখা গেল না। বরং প্রশান্ত হৃদয়ে দাঁড়ায়ে তিনি ভাবতে ছিলেন হায়। তারা কত নিবোর্ধ। নিজেদের মঙ্গলামঙ্গল বুঝতে ও অক্ষম। তৎপর তিনি নীরবে-এস্থান হতে চলে গেলেন।
![]() |
| মহানবী সাঃ সাথে আবু জাহলের অসদ্ব্যবহার |
'আবদুল্লাহ বিন জুদ আনের একটি ক্রীতদাসী অদূরে দাঁড়ায়ে ঘটনাটি আদ্যোপান্ত দেখল এবং আবু জাহলের অন্যায় আক্রমণে ও তার অমানুষিক আসদ্ব্যবহার তাঁর মনে ভীষণ আঘাত লাগল। সেও মনের দুঃখ মনে চাপা দিয়ে চলে গেল।
হযরত হামযা রাসূল (সাঃ)-এর পিতৃব্য ছিলেন। বয়সে তাঁর চেয়ে দুই তিন বৎসরের বড় ছিলেন। চাচাদের মধ্যে তিনি রাসূল (সাঃ)-কে অত্যন্ত ভালবাসতেন। কারণ তাঁর উভয়েই সুওয়ায়বিয়ার দুধ পান করেছিলেন। এজন্য তাঁরা পরস্পর দুধভাইও ছিলেন আবার ছোটবেলার খেলার সাথীও ছিলেন।
হযরত হামযা এখনও ইসলাম গ্রহণ করেন নি। কিন্তু রাসূল (সাঃ)-এর চালচলন ও কার্যকলাপ তাঁর নিকট খুব পছন্দনীয় ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা বীর পুরুষ। শিকার করতে তিনি ভালবাসতেন। প্রত্যহ প্রত্যুষে তীর ধনুক হাতে নিয়ে শিকারে বের হতেন। বৈকালে শিকার হতে ফিরার পথে কা'বা গৃহে তাওয়াফ করতেন এবং কাবা প্রাঙ্গনে সমবেত কুরায়শ-সরদারদেরকে অভিবাদন করত অনেক সময় তাঁদের নিকটে বসে খোশ আলাপ করতেন। মোটকথা সকলের সঙ্গেই তাঁর সম্ভাব ছিল। আজ সায়াহ্নে শিকার হতে ফেরার পথে সাফা' পর্বতের নিকট 'আবদুল্লাহ বিন-জুদ 'আনের দাসী তাঁকে দেখতে পেয়ে, রসুল (সাঃ)-এর প্রতি আবু যাহলের অসদ্ব্যহারের সমস্ত বৃক্তান্ত খুলে বলল।
হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণ
ঘটনা শুনে বীর কেশরী আমীর হামযা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন, আমার ভাতিজা মুহাম্মদ (সাঃ) কার কি ক্ষতি করেছে? তাঁর কি অপরাধ? মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর 'ইবাদত করতে বলা কি এতই অপরাধের কাজ? না হয় তিনি একটা নূতন ধর্ম প্রচার করেছেন, কিন্তু তিনি ত বলপূর্বকভাবে কারও উপর সে ধর্ম চাপায়ে দিচ্ছেন না।
যার ইচ্ছা হয়, গ্রহণ করবে, না হয়, না করবে। তারই জন্য এত বড় অবিচার? আবু জাহলের এত বড় স্পর্ধা। এসব বলতে বলতে তিনি কা'বা শরীফে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন যে, আবু জাহল কুরায়শ দলপতিদের সভায় বসে হাসি-কৌতুক করতেছে। তখন তিনি স্বীয় স্কন্ধ বিলম্বিত ধনুক দ্বারা তার মস্তকে ভীষণভাবে আঘাত করে বলতে লাগলেনঃ পাষণ্ড, তুই মুহাম্মদের উপর অত্যাচার করবি, ধর্মের জন্য? আচ্ছা, আমিও ইসলাম গ্রহণ করলাম। তোর যা করার ক্ষমতা আছে কর।
আবূ জাহলের দুর্দশা দেখে তার গোত্রের লোকজন ছুটে আসল, কিন্তু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আবু জাহল বলল থাম। হামযার কোন দোষ নেই। আমিই অপরাধ করেছি। মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উপর আমিই অন্যায়ভাবে অত্যাচার করেছিলাম। এই বলে আবু জাহল ব্যাপারটাকে আর বেশী ধূর অগ্রসর হতে দিল না। হযরত আমীর হামযাকে শান্ত করে সেদিনকার মত ফিরায়ে দিল।
পরে হযরত আমীর হামযার ন্যায় বীর পুরুষ হাত ছাড়া হয়ে পড়েন এবং ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমানদের শক্তি বাড়ায়ে দেন, এই ভয়েই কুটিল আবু জাহল আজ এত ন্যায়পরায়ণ সাধু সেজেছিল। কিন্তু তাঁর কূট কৌশল ফলোদয় হল না। হযরত হামযা সেখান হতে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে চিন্তা করতে লাগলেন, বাপ-দাদার ধর্ম পৌত্তলিকতা। আমি হঠাৎ এই ধর্ম পরিত্যাগ করব কিরূপে? আবার ভাবতে লাগলেন, সত্যকে সত্য বলে গ্রহণ করাই ত মানুষের কতব্য। ইসলাম যদি সত্য হয় তবে তা গ্রহণ করতে ইতস্ততঃ করার কি আছে? সারা দিন চিন্তা করার পর শেষ পর্যন্ত এই সিন্ধান্তে উপনীত হলেন যে, ইসলামই সত্য ধর্ম এবং নিঃসঙ্কোচে ও বিনা দ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করা কর্তব্য। সুতরাং তিনি লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ বলে কায়মনো বাক্যে ইসলাম গ্রহণ করলেন।
তাঁর ইসলাম গ্রহণে রাসুল (সাঃ) এবং নওমুসলিমগণ যারপর নাই আনন্দিত হলেন। কুরায়শগণ মর্মাহত ও দুর্বল হয়ে পড়ল। কাফিরদলের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে পড়ল। তাদের মধ্যে ঘোর চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল। অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি করে লাভনেই। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে যতই লগুড়াঘাত করা হয় ততই সে বিস্তার লাভ করে। কোন প্রকার প্রলোভন দ্বারা একটা আপোষ মীমাংসা করতে পারলেই মঙ্গল; নতুবা আর রক্ষা নেই। একবার 'উৎবাকে পাঠায়ে দেখা গিয়েছে যে, স্বতন্ত্র এবং ব্যক্তিগত চেষ্টার কোন ফলোদয় হয় না। চল, এবার সমবেতভাবে সকলে মিলে চেষ্টা করে দেখি কোন কিছু করা যায় কি না?
এই পরামর্শ অনুসারে কাফিরগণ একদিন সূর্যাস্তের সময় কা'বা গৃহে সমবেত হল। এই সভায় 'উতবা, শায়বা, আবু মুফইয়ান, নযর, আবুল বুখতরী, আসওয়াদ, যম'আ, 'আস বিন ওয়ায়িল, ওলীদ, আবু জাহল, উমাইয়া প্রমুখ কুরায়শ সরদারগণ সকলেই যোগদান করল। তাঁরা সকলে মিলে স্থির করল যে, মুহাম্মদ (সাঃ)-কে এখানে ডেকে এনে তাঁর সঙ্গে আজই মীমাংসা করে নিতে হবে। সভার পক্ষ হতে দূত এসে রাসূল (সাঃ)-কে জানাল যে, সমস্ত কুরায়শ সরদার কা'বা গৃহে সমবেত আছেন। তাঁরা আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চান। আপনি অনুগ্রহপূর্বক তথায় তশরীফ আনলে ভাল হয়।
সংবাদ পাওয়া মাত্র তিনি একা নিঃসঙ্কোচে সভাস্থলে যেয়ে উপস্থিত হলেন। সরদারগণ সমবেতভাবে 'উৎবার ন্যায় তাঁকে নানা প্রকার প্রলোভন দেখিয়ে বলতে লাগলঃ ধন-সম্পদ, প্রভাব প্রতিপত্তি, যা চান আমরা তাই দিতে প্রস্তুত আছি। আপনি দয়া করে এই নূতন ধর্ম প্রচার করা বন্ধ করে দিন।
তাদের বক্তব্য শেষ হলে রাসূল (সাঃ) উত্তর করলেন: ধন-দৌলত, মান-মর্যাদা, সিংহাসন ও রাজ মুকুট এ সমস্ত তুচ্ছ পদার্থের কোন আবশ্যকতা আমার নেই। প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ তা'আলার সত্য ও জ্ঞানের আলোক দিয়ে ইহ-পরকালের মুক্তির পথ দেখার জন্য আমাকে আপনাদের নিকট প্রেরণ করেছেন। আমার প্রতি আল্লাহর পবিত্র বাণী অবতীর্ণ হয়েছে। মানুষ পরকালে স্বীকৃত কর্মফল ভোগ করবে, পূর্ণ কর্মের প্রতিফল স্বরূপ অনন্ত পুরস্কার এবং পাপকর্মের প্রতিফল স্বরূপ কঠোর শাস্তির ভাগী হবে, এই সংবাদ পৌছাবার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি। আমি নিজের কর্তব্য পালন করতেছি। তার বিনিময়ে মান মর্যাদা, ধন দৌলৎ কিছুই চাই না। আপনারা যদি আল্লাহর বাণীকে গ্রহণ করেন তবে ইহ-পরকালে আপনারাই তার সুফল ভোগ করবেন। অন্যথায় আমি ধৈর্যাবলম্বন করব। প্রভুর যা ইচ্ছা তাই হবে।
রাসূল (সাঃ)-এর কথা শুনে সরদারগণ বলতে লাগল, আপনার মঙ্গলের জন্যই আমরা এ সমস্ত মুল্যবান প্রস্তাব করেছিলাম। আমাদের কোন প্রস্তাবই যখন আপনার ভাল লাগল না, আচ্ছা, বেশ ভাল কথা। এখন আপনি একটা কাজ করুন। আপনি আপনার প্রভুকে বলুন, তিনি যেন মক্কার চতুষ্পার্শ্বস্থ পাহাড়সমূহ স্থানান্তরিত করে এবং এদেশে সিরিয়া ও ইরাকের ন্যায় নদ-নদী প্রবাহিত করে দেশটিকে সুজলা সুফলা করে দেন। কারণ, মরুভূমি হওয়ার দরুন এ দেশে বাস বসতি করতে কত কষ্ট, তা ত আপনি নিজেই দেখেছেন। আর একটি কাজ করুন আমাদের পূর্বপুরুষ 'কুসায়' প্রমুখ কয়েকজনকে জীবিত করে দেওয়ার জন্য আপনার আল্লাহকে বলুন। আমরা তাদের নিকট আপনার কথা সত্য কিনা, আমরা তা জিজ্ঞেস করে দেখি। আপনার প্রভু যখন এই কাজগুলো করে দিবেন, তখনই আমরা আপনার কথা সত্য বলে বিশ্বাস করব।
রাসূল (সাঃ) উত্তর করলেন, এই সমস্ত কাজের জন্য আমি প্রেরিত হই নি। আমাকে যে শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে তা আমি আপনাদেরকে পৌঁছায়ে দিয়েছি। যদি তা আপনারা গ্রহণ করেন, তবে আপনাদের মঙ্গল, অন্যথায় আমি ধৈর্য ধারণ করব। আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই হবে।
রাসূল (সাঃ)-এর উত্তর শুনে তারা বলতে লাগল, আচ্ছা আমাদের জন্য না হয় কিছু নাই করলেন। কিন্তু আপনি অন্ততঃপক্ষে নিজের জন্য আপনার প্রভুর নিকট এই প্রার্থনা করুন, তিনি যে আপনার জন্য ফলে-ফুলে সুশোভিত একটি সুন্দর উদ্যান, মনোরম একটা বৃহৎ প্রাসাদ, স্বর্ণ-রৌপ্যের কতকগুলো ভাণ্ডার আপনাকে দান করেন। তা হলে আপনার সমস্ত অভাব পূর্ণ হয়ে যাবে। এই অভাবের তাড়নায় আপনাকেও আমাদের ন্যায় হাটে-বাজারে যেতে হচ্ছে। দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের জন্য আমাদের ন্যায় আপনাকেও পরিশ্রম করতে হচ্ছে। আপনারও আমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আপনি আপনার আল্লাহর নিকট হতে এসব জিনিস চেয়ে নেন। তবেই সমাজে আপনার একটা গুরুত্ব ও স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাসূল (সাঃ) নীরবে সমস্ত প্রলাব শ্রবণ করে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন, এই সমস্ত পার্থিব বস্তু মানব জীবনের কাম্য নয়। এই সব প্রার্থনা করা আমার কর্তব্যের বহির্ভূত। আমি জগদ্বাসীর নিকট সত্য মহাসত্য প্রচার করার জন্য প্রেরিত হয়েছি। তা মেনে নিলে আপনাদের মঙ্গল হবে অন্যথায় আমি আমার কর্তব্য পালন করে ক্ষান্ত হব। কাল কিয়ামতের দিন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তার মীমাংসা করবেন।
কাফিরগণ বলল, দেখুন, আমাদের সমস্ত বক্তব্য আজ আপনাকে বলে দিয়েছি। অতঃপর আমরা আর আপনাকে এই সমস্ত কথা বলতে দিব না। তাতে হয় আমরা ধ্বংস হব, না হয় আপনি। তা শেষ কথা। তাদের এই হুমকিতে রাসূল (সাঃ) একটুও ভয় পান নি। তিনি প্রসন্ন বদনে সভাস্থল পরিত্যাগ করে স্বগৃহে ফিরলেন।
য়্যাহুদীদের সঙ্গে কাফিরদের পরামর্শ
তৎপর কুরায়শ প্রধানগণ বলতে লাগল, আমরা যে সমস্ত প্রতিবাদ করলাম বস্তুত একজন নবীকে এসব প্রতিবাদ করা সমীচীন হয় নি। বাস্তবিকই তিনি নবী কিনা, তা জানার জন্য কি করা উচিত, তা হয়ত য্যাহূদীগণ বলতে পারবে। এই কথা জানার জন্য তারা নযর এবং 'উত্কাকে মদীনার য়্যাহ্দী পণ্ডিতদের নিকট প্রেরণ করল। য্যাহুদী পণ্ডিতগণ তাদেরকে বলে দিলেন যে, তোমরা তাকে এই প্রশ্ন করবে যে, সিকান্দর যুলকরনায়ন কে ছিলেন? আসহাবে কাহাফের ঘটনা কি? তহ (আত্মা) কি বস্তু? যদি তিনি এই সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন তবে সত্যই তিনি নবী।
য্যাহ্দী পণ্ডিতদের পরামর্শ অনুযায়ী পুনরায় আর এক সভায় রাসুল (সাঃ)-কে ডেকে এনে তারা এই সমস্ত প্রশ্ন করল। সুতরাং তাদের এই প্রশ্নের উত্তরে সূরা-কাহাফ অবতীর্ণ হল। এই সুরাতে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে। পূর্বে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে যে সমস্ত প্রশ্ন করা হয়েছিল পবিত্র কুর'আনে সেগুলোর উত্তরও দেয়া হয়েছে; কিন্তু এ স্থানে এই সুদীর্ঘ আলোচনা করা সম্ভব নয়।
কাফিরগণ রাসূল (সাঃ)-কে এই কথা ও বলেছিলেন যে, আমরা ফেরেশতা পূজা করে থাকি। কারণ ফেরেশতাগণ আল্লাহর কন্যা। যে পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ প্রকাশ্যভাবে আমাদের সম্মুখে এসে না বলবে সে পর্যন্ত আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করব না। এই কথা শুনে রাসূল (সাঃ) মজলিস ত্যাগ করে চলে আসলেন। তখন রাসূল (সাঃ) এর ফুফাত ভাই 'আতিকার পূত্র' আবদুল্লাহ তার সাথে চলল এবং চলতে চলতে বলতে লাগলঃ হে মুহাম্মদ, আপনি আকাশে সিড়ি লাগায়ে একবার উঠতেছেন, আবার নামতেছেন এবং আপনার সাথে আকাশ হতে চারজন ফেরেশতা আপনার নবুওয়তের সাক্ষ্যও দেয়, তবু আমি আর আপনার উপর ঈমান আনব না।
পাঠক, কি আশ্চর্য? আজ 'আবদুল্লাহ ইসলামের বিরুদ্ধে এত দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতেছে; কিন্তু মক্কা বিজয়ের পূর্বেই এই 'আবদুল্লাহ রাসূল (সাঃ) খিদমতে হাজির হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করল। এটা কি রাসূল (সাঃ)-এর মু'জিযা এবং ইসলামের সত্যতার প্রমাণ নয়? বাস্তবিক তা আকাশে উঠা এবং ফেরেশতাদের সাক্ষ্য দেওয়ার চেয়েও অধিকতর আশ্চর্যজনক। বস্তুত যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কাফিরগণ রাসূল (সাঃ)-এর নিকট যে সমস্ত পার্থিক সম্পদ চেয়েছিলেন, তাঁরা তদপেক্ষাও অধিক মূল্যবান সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন।
অলৌকিক নিদর্শন দেখাতে অসম্মত হওয়ার কারণ
কাফিরদের কূট প্রশ্নের উত্তরে রাসূল (সাঃ) বারংবার বলেছেন যে, আমি সত্য ধর্ম শিক্ষা দেওয়ার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। একমাত্র তাই আমার কর্তব্য কর্ম। পার্থিক সম্পদের জন্য প্রার্থনা করা কিংবা কোন নির্দশন দেখার জন্য প্রার্থনা করা কর্তব্যের অন্তভূক্ত নয়। বাস্তবিক তা সাধকের কর্ম জীবনের আদর্শ হওয়া উচিত। স্বীয় কর্তব্য পালন করাই মানুষের কর্তব্য এবং তার নাম তদবীর। আর ফলাফল সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে এবং তারই নাম তকদীর। চাষাবাদ করে বীজ বপন করা এবং তার উপযুক্ত যত্ন করাই মানুষের কর্তব্য। কিন্তু তার ফল প্রদান মানুষের কর্তব্যও নয় এবং তার ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত ও নয়।
আল্লাহ বেহেশত, দোযখ, হাশর প্রভৃতি সবই মানুষের অদৃশ্য ও অগোচর। এই অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার নামই ঈমান। এই বস্তুগুলো যখন মানুষের গোচরিভূত হয়ে যায়, তখন তা বিশ্বাস করতে কোন স্বার্থকতাও নেই এবং এইরূপ ঈমান আল্লাহ তা'আলার নিকট গ্রহণীয়ও নয়। এজন্যে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে পশ্চিম দিকে সূর্য উদিত হতে দেখে দুনিয়ার সমস্ত কাফির ঈমান আনবে, কিন্তু তাদের সেই ঈমান আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। যেহেতু অগোচরিভূত এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের দিকে মানব সন্তানকে আহ্বান করার জন্যই পয়গম্বরগণ প্রেরিত হয়ে থাকেন। এজন্য তাঁরা চিরদিনই নিজেদের সত্যতা প্রতিপাদনের জন্য অলৌকিক নিদর্শন না দেখে তাঁদের ধর্মের এবং শিক্ষার সৌন্দর্য ও সত্যতাই পেশ করে থাকেন। কারণ, অলৌকিক নিদর্শন দেখার পর বিষয়টি আর অদৃশ্য বা অগোচরিভূত থাকে না এবং ঈমানের সেই উচ্চ ও পূর্ণ মর্যাদাও থাকে না। আবশ্য স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলা কোন কোন সময় আবশ্যকবোধে তাঁদের কর্তৃক বহু অলৌকিক কার্যকলাপ প্রকাশ করে থাকেন।
কাফিরগণ প্রত্যেক পয়গম্বরকেই এই ধরনের প্রশ্ন করেছেন এবং পয়গম্বরগণ ও এই রূপ উত্তরই দিয়েছেন। বাইবেলে আছে 'দিয়াবল' নামক এক ব্যক্তি হযরত 'ঈসাকে পরীক্ষা বরার জন্য বলেছিল, "তুমি যদি পয়গম্বর হও, তবে বল, যেন এই পাহাড়সমূহ রুটি হয়ে যায়;" কিন্তু তিনি উত্তর করে বললেন, লেখা আছে "মনুষ্য কেবল রুটিতে বাঁচবে না; কিন্তু ঈশ্বরের মুখ হতে যে প্রত্যেক বাক্য নির্গত হয়, তাতেই বাঁচবে।" তখন 'দিয়াবল' তাঁকে পবিত্র নগরে নিয়ে গেল এবং ধর্মধামের চূড়ার উপরে দাঁড় করাল আর তাঁকে বল, তুমি যদি পয়গম্বর হও, তবে নীচে ঝাপ দিয়ে পড়.... যীশু তাকে বললেন, আবার লেখা আছে, "তুমি আপন ঈশ্বর প্রভুর পরীক্ষা কর না।"
রাসূলের বাণী ও কুর'আনের আকর্ষণ
এই সমস্ত কূট প্রশ্ন ও প্রলাপ উক্তির পর কাফির-সরদারগণ পরামর্শ করে এই সিদ্ধান্ত করল যে, রাসূল (সাঃ)-কে আর কেউ কোন প্রশ্ন করবে না এবং কুরআনও শুনবে না। কারণ এ বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করলে কিংবা কুরআন শুনলে নিশ্চয়ই একদিন আমরা পরাজিত হয়ে অথবা কুরআনের অলৌকিক মাধুর্য-আকর্ষণে অভিভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়ে পড়ব।
রাসূল (সাঃ) রাত্রিকালে নামাযের মধ্যে বিশেষতঃ শেষ রাত্রিতে তাহাজ্জুদের নামাযে উচ্চৈঃস্বরে কুরআন মজীদ পাঠ করতেন। কুরআনের কি আশ্চর্য আকর্ষণ। কাফিরগণ কুর'আন না শুনার অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা করেছে সত্য; কিন্তু তারা এই প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতে পারল না। কুরআন শুনার জন্য তাদের অন্তর ব্যাকুল হয়ে উঠল। তারা রাত্রির অন্ধকারে চুপে চুপে রাসূল (সাঃ)-এর প্রকোষ্ঠের নিকট কোন গুপ্তস্থানে বসে থেকে কুর'আন শুনতে লাগল।
একদিন শেষ রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাযে রাসূল (সাঃ)-এর মুখে কুর'আন শুনার জন্য চুপে চুপে আবু জাহল, আবু সুফইয়ান এবং আখনাস রাসূল (সাঃ)-এর প্রকোষ্ঠের নিকটে যেয়ে প্রত্যেকেই নিজ নিজ গুপ্তস্থানে বসে রইল। তারা প্রত্যেকেই মনে করতেছিল যে, আমি একাই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে এখানে এসেছি; অন্য কেউ হয়ত এ-কথা জানতে পারবে না। কিন্তু ভোর হওয়ার পর ফেরার পথে তিন জনেরই সাক্ষাৎ হয়ে গেল। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে এখানে আসার দরুন তারা সকলেই অত্যন্ত লজ্জিত হল এবং বলতে লাগল, এটা আমরা ভুল করেছি, ভবিষ্যতে আর এরূপ করব না। পর দিন রাত্রে কুর'আন শুনার জন্য তারা প্রত্যেকেই অস্থির হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবল, আজ ত আর কেউ আসবে না। আমি একাই যাই। সুতরাং কেউ জানতে পারবে না। প্রত্যুষে আবার পূর্ববৎ তিন জনের সাক্ষাৎ হয়ে গেল। আজ আবার প্রতিজ্ঞা করল। পরের রাত্রিতেও ঠিক এই অবস্থাই হল। তৃতীয় প্রত্যুষে তিন জনের সাক্ষাৎ হওয়ার পর তারা নিজেদের এই কার্যকলাপের উপর অত্যন্ত আশ্চর্যন্বিত হল। আজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করল।
তখন আখনস আবূ সুফইয়ান বলল, কুরআন গভীর তত্ত্বপূর্ণ অতি উচ্চ ধরনের বাণী। আখনস বলল-আমার মতও ঠিক তাই। তৎপর আখনস আবু জাহলকে জিজ্ঞেস করল-আপনি কি বলেন? আবু জাহল বলল, আমার মতও ঠিক তাই। কিন্তু কথা হল কি? মান-মর্যাদায় দান-দক্ষিণায়, অতিথি সেবায় আমরা হাশিম গোত্রের সমকক্ষ ছিলাম, কিন্তু আজ তারা বলবে যে, আমাদের গোত্রে নবী আছেন এবং তাঁর উপর আল্লাহর বানী অবর্তীণ হয়। এই কথার উত্তর কি? আল্লাহর কসম আমরা কখনও মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নবী বলে স্বীকার করব না এবং তাঁর উপর ঈমানও আনব না।
মোটকথা তাদের এই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হল। অনেক গোত্রই চুপে চুপে কুর'আন শুনতে থাকল এবং তত্ত্বপূর্ণ আল্লাহর বানী শুনে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল।
হযরত উমরের ইসলাম গ্রহণ
কুরায়শ সরদারগণ সমবেতভাবেই রাসূল (সাঃ)-এর সাথে শত্রুতা এবং ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করে আসতেছিল; কিন্তু আবু জাহল ও 'উমর ছিল তাদের অগ্রনায়ক। তারা উভয়ে সর্বদা মুসলমানদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করার জন্য এবং ইসলামকে সমূলে বিনষ্ট করার জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত থাকত। পক্ষান্তরে মানব সমাজের অকৃত্রিম দরদী রাসূল (সাঃ) তাঁদেরকে সৎ পথে আনয়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকতেন। সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর রাসূল (সাঃ) সর্বশেষে একটা অব্যর্থ উপায় অবলম্বন করলেন। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার দরবারে দু'আ করলেন, "হে প্রভু" আবূ জাহল ও 'উমর, এতদুভয়ের মধ্যে যে তোমার নিকট অধিক প্রিয় তার দ্বারা তুমি পবিত্র ইসলামকে সম্মানিত কর।" পয়গম্বরের দু'আ কখনও বৃথা যায় না। তার কয়েক দিন পরেই হযরত উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করলেন।
কিন্তু এই দু'আ কবুল হওয়া প্রতিক্রিয়া কিরূপে প্রকাশিত হল, এ সম্পর্কে ইতিহাস ও জীবনচরিত্রের কিতাবসমূহে দুর্বল বা সনদবিহীন অনেক ঘটনাই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তন্মধ্যে হাদীস ও সীরতের সহীহ্ রিওয়ায়তের দুটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
প্রথম ঘটনাটি স্বয়ং হযরত উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাত্রিকালে আমি রাসূল (সাঃ)-কে ব্যঙ্গোক্তি ও বিদ্রূপ করার উদ্দেশ্যে বের হলাম। (কিন্তু আমি সুযোগ পেলাম না, কারণ) তিনি অগ্রসর হয়ে কা'বা শরীফে প্রবেশ করলেন এবং নামায পড়া আরম্ভ করে দিলেন। তিনি নামাযে 'সূরা আলহাক্কা" পাঠ করতে লাগলেন এবং আমি নিবিষ্ট চিত্তে শুনতে লাগলাম। শুনতে শুনতে মুহূর্তে মুহূর্তে আমার মনে নূতন নূতন ভাবের উদয় হতে লাগল। কুরআনের অলঙ্কারপূর্ণ মাধুর্যময় ভাষা শুনে প্রথমে আমি মনে করলাম যে, কুরায়শগণ যা বলে থাকে তাই ঠিক; ইনি একজন বড় ধরনের কবি। তখন রাসূল (সাঃ) পড়তে লাগলেন-
"নিশ্চয়ই এই কুরআন এক সম্মানিত ফেরেশতার বাহিত বার্তা এবং এটা কোন কবির (কল্পিত) বাণী নয়; কিন্তু তোমরা এই কথা খুব কমই বিশ্বাস করে থাক।
তখন আমি মনে মনে বললাম যে, ইনি একজন মন্ত্রতন্ত্রজ্ঞ গনৎকার আর কিছুই নন। নতুবা তিনি আমার মনের কথা কিরূপে জানতে পারলেন। তৎক্ষনাৎ তিনি পড়তে লাগিলেন-
"এবং এটা মন্ত্রহজ্ঞ গণৎকারের উক্তিও নয়, তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাক। এটা সর্বজগতের প্রতিপালকের তরফ হতে অবতীর্ণ হয়েছে।
অতঃপর তিনি এই সুরা শেষ পর্যন্ত পাঠ করলেন। এবং নিবিষ্ট চিত্তে আমি শ্রবণ করতে লাগলাম। তাতে আমার অন্তঃকরণে ইসলাম যথেষ্ট স্থান অধিকার করল।
সম্ভবত এই ঘটনাই হযরত উমরের মনে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করেছিল। পরে আবু জাহল ও অন্যান্য কাফিরদের সংস্পর্শে যেয়ে তাঁর মনের এই আকর্ষণ শিথিল হয়ে পড়ে এবং তিনি পূর্ববৎ ইসলামের বিরোধিতা করতে থাকেন।
হযরত 'উমরের বয়স যখন সাতাশ বৎসর তখন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নবুওয়ত প্রাপ্ত হন। প্রাগৈসলামিক যুগের প্রসিদ্ধ একত্ববাদী যায়দ ছিলেন হযরত উমরের চাচা। তাঁর পুত্র হযরত সা'ঈদ ছিলেন হযরত 'উমরের চাচাত ভাই। এই হযরত সা'ঈদের সঙ্গেই 'উমরের ভগ্নী হযরত ফাতিমার বিবাহ হয়েছিল। হযরত যায়দ 'আশারায়ে মুবাশশারার অন্যতম। তাঁর স্ত্রী হযরত ফাতিমা প্রাথমিক মুসলমানদের অন্তর্ভক্ত ছিলেন। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এতদ্ভিন্ন এই বংশে নাঈম ইবন 'আবদুল্লাহ নামক আরও এক মহাত্মা মুসলমান হয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই নিজেদের মুসলমান হওয়ার কথা গোপন রেখেছিলেন। লবীনা নামক এই বংশের একজন ক্রীতদাসীও ইসলাম গ্রহণ করেন। এই সংবাদ 'উমরের কর্ণগোচর হওয়ামাত্র তিনি লবীনাকে ভীষণ মারপিট আরম্ভ করেন। যে কোন মুসলমানের প্রতিই তাঁর ক্ষমতা চলত, তাঁকেই তিনি এভাবে মারপিট করতে লাগলেন। মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, একটু বিশ্রাম নেওয়ার পর আবার মারতেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার প্রেমিক নও-মুসলিমগণ ইসলাম সুরা পান করে সত্যের প্রেমে এরূপ প্রমত্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, এসব অত্যাচারে তাঁরা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। মুক্ত কণ্ঠে আল-কালিমাতুত তায়্যিবা উচ্চারণ করে নিজেদের অটলতা প্রকাশ করতে থাকলেন।
অবশেষে 'উমর ক্রোধে অধীর হয়ে ইসলামের মূলকেন্দ্র হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-কে হত্যা করার সংকল্প করলেন এবং উলঙ্গ তরবারি কটিদেশে বেঁধে বের হয়ে পড়লেন।
পথে নাঈম ইবন আবদুল্লাহর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হল। উমরের উগ্র মেজাজ লক্ষ্য করে হযরত ন'ঈম তাঁকে বললেন, উমর খবর কি? কোথায় যাচ্ছেন? 'উমর গম্ভীর স্বরে উত্তর করলেন, মুহাম্মদ মুণ্ডপাত করতে। হযরত ন'ঈম বললেন, আপনি উদ্ভ্রান্ত হয়েছেন নাকি? এমন করলে হাশিম পৌত্র কি আপনাকে ছেড়ে দিবে? নিজের প্রাণের মায়াও ছেড়ে দিলেন নাকি?
'উমর ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন-বুঝেছি, হতভাগা! তুমিও বুঝি মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মন্ত্র গ্রহণ করে ধর্মীয় সেজেছ। আস, প্রথমে তোমাকেই সমুচিৎ শিক্ষা দিয়ে দেই।
নির্ভীক চিত্তে ন'ঈম উত্তর করলেন, "প্রথমে নিজের ঘর সামলাও, তৎপর ঘাড়ে পড়ে আমার সাথে আসিও। দেখ, তোমার ভগ্নী ফাতিমা ও ভগ্নীপতি সা'ঈদ ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার কি করবে?
আমার ভগ্নী ও ভগ্নীপতি ইসলাম গ্রহণ করেছে? আচ্ছা, প্রথমে তাদের বিচারই করে আসি, এই বলে 'উমর ফাতিমার বাড়ীর দিকে ধাবিত হলেন।
সা'ঈদ ও ফাতিমা বসে কুরআন তিলাওয়তের একটা অস্ফুট গুঞ্জনধ্বনিন শুনতে পেয়ে ন'ঈমের কথা সত্য বলে মনে করলেন। তখন ক্রুদ্ধ উমর সশব্দে গৃহে প্রবেশ করলেন। 'উমরের সাড়া পেয়ে ফাতিমা কুরআনের লিখিত আয়াতসমূহ বস্ত্রাভ্যন্তরে লুকায়ে ফেলেন। 'উমর ভগ্নীকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা কি পড়তেছিলে বল? ফাতিমা বললেন, "কই তুমি কি কিছু শুনেছ?"
'উমর উত্তেজিত কণ্ঠে উত্তর করলেন, "ন্যাকামি রেখে দাও, আমার বুঝি কাম নেই? তৎপর সা'ঈদের দিকে মুখ ফিরায়ে বললেন, "ওরে হতভাগা। তোরা বুঝি বে-দীন হয়ে মুহাম্মদের মন্ত্র গ্রহণ করেছিস। তবে দেখ মজা"" এই বলে তিনি সা'ঈদকে ভীষণভাবে প্রহার করতে আরম্ভ করলেন। ফাতিমা স্বামীকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেন। 'উমর তখন ফাতিমাকেই মারতে আরম্ভ করলেন। স্বামী-স্ত্রী পরস্পর পরস্পরকে রক্ষা করতে গিয়ে উভয়েই ঘোরতরভাবে প্রহৃত ও আহত হলেন। ফাতিমার সারা দেহ রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল। রক্ত দেখে উমর একটুখানি অপ্রতিভ হয়ে বললঃ বল হতভাগিনী, মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করেছিস কি?
ফাতিমা উত্তেজিত হয়ে নির্ভীক কণ্ঠে উত্তর করলেন, হাঁ করেছি। আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসুলের উপর ঈমান এনে আমরা মুসলমান হয়েছি। প্রাণ দিতে হয় দিব। কিন্তু এই সত্যকে আমরা পরিত্যাগ করতে পারব না। আপনার যা ইচ্ছা করতে পারেন।
ফাতিমার অটল উক্তি শুনে 'উমরের অন্তর অত্যন্ত কোমল হয়ে পড়ল। তিনি স্নেহ-দৃষ্টিতে ভগ্নির দিকে তাকায়ে কোমল স্বরে বললেন, "তোমরা কি পড়তেছিলে, তা আমাকে দেখাও। ভ্রাতার ভাবান্তর দর্শন করে ফাতিমার মন পুলকিত হয়ে উঠল। তিনি কুরআনের লিখিত অংশটুকু তাঁর সম্মুখে রেখে দিলেন। তাতে সূরা 'তা-হা' লিখিত ছিল। হযরত 'উমর নিবিষ্ট মনে 'তা-হা' পাঠ করে যেতে লাগলেন। যখন তিনি এই আয়াতে পৌছলেন-
"একমাত্র আমিই আল্লাহ তা'আলা আমাকে ছাড়া আর অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং তুমি একমাত্র আমারই 'ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থ নামায কায়েম কর।
তখন হযরত 'উমর আর স্থির থাকতে পারলেন না। এক স্বগীয় ভাবের আলোড়নে তাঁর অন্তর শিহরিয়ে উঠতে লাগল। তিনি এক নূতন আলোকের সন্ধান পেলেন। অপূর্ব ভাবাবেগের মধ্যে তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করে উঠলেন-
"আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত আর কেউ ইবাদতের যোগ্য নেই, আর মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহ তা'আলার রাসূল।
তৎপর হযরত উমর রাসূল (সাঃ)-এর খিদমতে হাযির হওয়ার ইচ্ছায় হযরত সা'ঈদের বাড়ী হতে রওয়ানা হলেন। তখন রাসূল (সাঃ) সাফা পাহাড়ের পাদদেশে আরকমের বাসভনে সাহাবীগণসহ অবস্থান করতেছিলেন। হযরত উমর দরজা খটখটায়ে প্রবেশের অনুমতি জ্ঞাপন সঙ্কেত জানালেন। উলঙ্গ তরবারি হাতে দেখে সাহাবীগণ ভীত হয়ে ইতস্তত করতে লাগলেন। তখন হযরত আমীর হামযা (রাঃ) বললেন, দরজা খুলে দাও। যদি কোন শুভেচ্ছায় আগমণ করে থাকে, তবে ত খুব ভাল কথা, নতুবা তাঁর তরবারি দ্বারাই মস্তক দ্বিখন্ডিত করে দিব।
'উমর গৃহে প্রবেশ করলে রাসূল (সাঃ) স্বয়ং অগ্রসর হয়ে তাঁর বস্ত্রাঞ্চলে ধরে বললেনঃ হে উমর, কি মনে করে আসলে? রাসূল (সাঃ)-এর গুরুগম্ভীর স্বয়ে হযরত উমরের সারা দেহ ভয়ে প্রকম্মিত হয়ে উঠল এবং কাঁপতে কাঁপতে বিনয়াবনত মস্তকে বললেন পবিত্র ইসলাম গ্রহণ করার উদ্দেশেই খিদমতে হাযির হয়েছি। এই কথা বলে সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাশ্য মজলিসে মুক্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন-"লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।" তাঁর মুখে কালিমা তায়্যিবা শ্রবণ করে রাসূল (সাঃ) উৎফুল্ল হয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেনঃ "আল্লাহু আকবর।" সঙ্গে সঙ্গে সাহাবীগণ (রাঃ) সমস্বরে বলে উঠলেন "আল্লাহু আকবর।" সেই তকবীর ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠল।
হযরত 'উমরের ইসলাম গ্রহণ বাস্তবিকই এক অভাবনীয় ব্যাপার। শির নিতে এসে তিনি শির দান করলেন। এমন দৃষ্টান্ত আর কোথাও দেখা যায় কি? সত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরিণাম বুঝি এরূপই হয়ে থাকে। হয়ত পরাজয় স্বীকার করতে হয়; নতুবা চিরতরে ধ্বংস হতে হয়। নমরূত ফির'আউন, আবরাহা আরও কত শয়তান সত্যের উপর আঘাত হেনে স্বয়ং ধ্বংস হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কুরায়শ, অপর আরও কত শত শত পরাক্রমশালী বাহিনী ভক্ষকরূপে ইসলামকে আক্রমণ করে সৌভাগ্য বলে রক্ষক বেশে দেশে ফিরে গিয়েছে।
এটাই ইসলাম। সে কখনও পরাস্ত হয় না। তার বিজয় পতাকা চিরদিনই উন্নত থাকে। দুঃখ-দৈন্য, ঝঞ্ঝা-বিপদের ভিতর দিয়েই চলেছে তার জয়যাত্রা।
হযরত উমর ইসলাম গ্রহণের পর জিজ্ঞেস করলেন, নূতন সংবাদ শীঘ্র প্রচার করার জন্য অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠে, এমন লোক কেউ আছে কি? জনৈক ব্যক্তি বলল, এ কাজে 'জমীল' খুব পটু। তখন তিনি জমীলের নিকট যেয়ে বললেন, আমি যে ইসলাম গ্রহণ করেছি তা তুমি জান কি? এই কথা শুনা মাত্রই জমীল দৌড়িয়ে কাবা গৃহে যেয়ে সমবেত কুরায়শদেরকে বলল-'উমর বেদীন হয়ে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে হযরত 'উমরও তথায় গিয়েছেন। তিনি বললেন সে মিথ্যা কথা বলে, আমি বে-দীন হই নি; বরং আমি মুসলমান হয়েছি। এই কথা শুনে কুরায়শগণ তাঁকে ভীষণভাবে আক্রমণ করল হযরত উমরের পুত্র আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, এমন সময় একজন বৃদ্ধ এসে বলল, উমরের যা ইচ্ছা, তাই করুক। তাতে তোমাদের কি? তাঁকে হত্যা করলে তাঁর বংশধরগণ কি তোমাদেরকে ছেড়ে দিবে? এই কথা শুনে সকলেই শান্ত হয়ে গেল। 'আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, হিজরতের পরে আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই বৃদ্ধ লোকটি কে ছিল? তিনি বললেন তিনি ছিলেন 'আস ইবন ওয়ায়িল।
হযরত 'উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করে নবজীবন লাভ করলেন। পক্ষান্তরে তাঁর ইসলাম গ্রহণে ইসলামের ইতিহাস যুগান্তর আনয়ন করল। তিনি যখণ ইসলাম গ্রহণ করেন তখন আরকমের বাসগৃহে প্রায় চল্লিশ জন মুসলমান সমবেত ছিলেন। হযরত হামযাও সেখানে ছিলেন। তথাপি তাঁরা ইসলামী অনুষ্ঠানাদি প্রকাশ্যভাবে উদযাপন করতে পারতেন না।
কিন্তু হযরত 'উমর (রাঃ) বললেন, কা'বা নির্মিত হয়েছে আল্লাহ তা'আলার 'ইবাদতের জন্য, মূর্তি পূজার জন্য নয়। আমরা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করব গোপনে, আর বিধর্মী পৌত্তলিকগণ মূর্তি পূজা করবে আল্লাহ তা'আলার ঘরে, তা কেমন কথা? তা কখনও হতে পারে না। চলুন, অদ্য হতে আমরা কা'বা গৃহে নামায পড়ি। সুতরাং সেদিন হতে মুসলমানগণ প্রকাশ্যভাবে কা'বা গৃহে নামায পড়তে আরম্ভ করেন।
'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) বলেন- "যখন হযরত 'উমর (রাঃ) মুসলামন হলেন তখন তিনি কুরায়শদের সাথে সংগ্রাম করলেন এবং কা'বা প্রাঙ্গণে নামায পড়লেন। আমরাও তাঁর সাথে (তথায়) নামায পড়লাম।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন- ইমলাম গ্রহণের পর হযরত উমর (রাঃ) প্রকাশ্য ভাবে কা'বা গৃহে নামায পড়লেন।
মোটকথা হযরত 'উমর ও হযরত আমীর হামযার ইসলাম গ্রহণের কারণে ইসলাম অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠল এবং কাফিরগণ দুর্বল হয়ে পড়ল।
