মহানবী সাঃ এর জীবনী। Muhammad The Final Legacy. Ep-02

আসসালামু আলাইকুম, প্রিয় পাঠক আজকের আর্টিকেল এর মাধ্যমে আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করবো মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর সম্পুর্ন জীবনী বাংলা সিরিজ এর ২য় পর্ব সম্পর্কে। আপনি যদি 'মহানবী সাঃ এর সম্পুর্ন জীবনী' এই সিরিজে নতুন হয়ে থাকেন এবং ১ম পর্বটি পড়তে চান তাহলে এখানে ক্লিক করে আগের পর্বটি পড়ে নিতে পারেন। চলুন আজকের পর্ব শুরু করা যাক-

 মাতৃহীন মহানবী সাঃ 

হযরত-জননী যেন দুই রূপে দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন। হযরত আমিনা দিলেন গর্ভধারিণী জননী, আর হযরত হালীমা ছিলেন তাঁর স্তন্যদায়িনী জননী। হযরত হালীমা ও তাঁর পরিবারের সাথে শিশুনবীর যে সম্বন্ধ ছিল তা ছিল অতি মধুর ও অনিন্দ্য সুন্দর। মায়ের অকৃত্রিম স্নেহ, ভাই বোনের প্রাণভরা ভালোবাসা শিশুনবী একমাত্র তাঁদের নিকট হতে লাভ করতে পেরেছিলেন। বস্তুতঃ তার নির্মল শৈশব জীবনে একমাত্র তাঁরাই পারিবারিক য়ে-প্রীতির ছাপ দিতে পেরেছিলেন। হালীমার পরিবারে অবস্থান কালে শিশুনবী নিমেষের তরেও স্নেহ-যত্নের অভাব অনুভব করেন নি। কতই মনোহর ছিল তাঁদের সেই মিলন। কতই মধুর ছিল তাঁদের সেই সম্বন্ধ।

সুখের দিন অতি ত্বরিত গতিতে অতীত হয়ে যায়। চক্ষের পলকে যেন ছয়টি বৎসর অতিবাহিত হয়ে গেল। হযরত হালীমা কর্তব্যের তাড়নায় প্রিয়পুত্র শিশুনবীকে তাঁর গর্ভধারিণী জননী আমিনার নিকট ফিরায়ে দিয়ে তিনি বিদায় গ্রহণ করলেন। এখানে তাঁর ধাত্রী গৃহের শৈশব-জীবনের সমাপ্তি হল।

শিশুনবী মাতৃ-ক্রোড়ে আসলেন। মরুপ্রান্তরের বেদুইন জীবন পরিত্যাগ করে এবার তিনি নাগরিক জীবন আরম্ভকরলেন। মক্কা নগরে নূতনভাবে আবার তার জীবন যাত্রা আরম্ভ হল। এজীবনের ভাবধারা, পারিপারির্শ্বকতা এবং আবহাওয়া পূর্ববর্তী জীবন হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। সুদীর্ঘ ছয় বছর পর প্রাণের দুলালকে পেয়ে হযরত আমিনার আর আনন্দের সীমা রইল না। কিন্তু শিশুনবীর এসুখ বেশী দিন স্থায়ী হল না।

Muhammad The Final Legacy. Ep-01
মহানবী সাঃ এর জীবনী। Muhammad The Final Legacy. Ep-02
শীঘ্রই আমিনা তাঁকে নিয়ে মদিনায় বেড়াতে গেলেন। উম্মু আয়মন নামী পরিচারিকাটিও তাঁদের সাথে ছিল। মদীনার নজ্জার বংশে রাসূলের দাদা 'আবদুল মুত্তালিবের মাতুলালয় ছিল। তাঁদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করার জন্যই তিনি মদীনায় গমন করলেন। কিন্তু তথায় যেয়ে মৃতস্বামী 'আবদুল্লাহর কবর যিয়ারত করাই ছিল আমিনার প্রধান ও মুখ্য উদ্দেশ্য।

'আবদুল্লাহর কবর দর্শন করে আজ হয়ত আমিনার মনে পুরানো দিনের কত স্মৃতি ভেসে উঠছিল, তা কে জানে? গণ্ডদেশ প্লাবিত করে তাঁর নয়নযুগল হতে যে কত অশ্রু প্রবাহিত হয়েছিল তা কে বলবে? আজ হয়ত শিশুনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলেন যে, তিনি পিতৃহীন। তাঁর কচি মনেও হয়ত আজ পিতৃবিয়োগের একটা বেদনা নূতনভাবে জাগরিত হয়ে থাকবে। পূর্ণ একটি মাস নদীনায় অবস্থান করার পর আমিনা প্রাণের দুলাল শিশুপুত্র ও পরিচারিকা উন্মু আয়মানকে নিয়ে মক্কাভিমুখে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে 'আবৃওয়া' নামক স্থানে পৌঁছে হযরত আমিনা নিতান্ত অপ্রাতিশ্যভাবে প্রাণত্যাগ করলেন এবং সেখানেই তিন সমাধিস্থ হলেন।

হায়। কি মহাবিপদ, সম্মুখে দিগ-দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি, উপরে নীল আকাশ। বসার স্থান নেই, দাঁড়াবার স্থান নেই, সাথে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই। এ বিশাল মরুপ্রান্তরে শুধু একটি দাসী, আর এ বালক। বহু কষ্টে উন্মু আয়মন তাঁকে নিয়ে মক্কায় ফিরলেন।

মাতৃগর্ভে অবস্থান কালেই আমাদের প্রিয় নবী পিতৃহারা হন। পিতার স্নেহ দূরের কথা, তাঁর মুখ পর্যন্তও দেখতে পান নি। মাত্র গণা কয়টি দিন মায়ের কোলে অবস্থান করতে না করতেই আজ তিনিও দূর মরুপ্রান্তরে শিশু পুত্রকে পরিত্যাগ করে চির বিদায় গ্রহণ করলেন। আল্লাহ যাঁকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করলেন, তাঁকে বুঝি এভাবেই তিনি সকল আপন জন হতে বিচ্ছিন্ন করে নেন।

রাসূল (সাঃ) তাঁর আম্মাজানের সাথে মদীনায় অবস্থান কালে যা দেখেছিলেন বা করেছিলেন, পরবর্তী কালেও সে সব কথা তাঁর স্মরণ ছিল। একদিন তিনি বনু 'আদী মহল্লার উপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় একটি বাড়ী নির্দেশ করে বললেন, "এই বাড়িতে আমার আম্মুজান অবস্থান করছিলেন।" পার্শ্ববর্তী একটি পুকুর দেখিয়ে তিনি বললেন, "এই পুকুরেই আমি সাতার কেটেছিলাম। আর একটি ময়দানের প্রতি লক্ষ্য করে বলেছিলেন, "আমি এ মাঠেই আনীসা নাম্নী একটি মেয়ের সাথে খেলা করতাম।"

 আবদুল মুত্তালিবের তত্ত্বাবধানে মহানবী সাঃ 

মাতৃহীন শিশুনবী মদিনা হতে প্রত্যাবর্তন করার পর পিতামহ 'আবদুল মুত্তালিবের তত্ত্বাবধানে লালিত পালিত হতে লাগলেন। পিতৃ-মাতৃহীন শিশু পুত্রের প্রতি বৃদ্ধ পিতামহের যেরূপ বাৎসল্য হওয়া স্বাভাবিক, 'আবদুল মুত্তালিব সেরূপ * বাৎসল্য সহকারেই এই অমূল্য রত্নস্বরূপ পুত্রটির লালন পালন করতে লাগলেন। তিনি সর্বদা তাঁকে চোখে চোখে রাখতেন। নিমেষের জন্য চক্ষুর আড়াল হলে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন।

পিতৃমাতৃহীন শিশুনবী একমাত্র বৃদ্ধ পিতামহের স্নেহের মুখ দর্শন করে সান্ত্বনা লাভ করতেন। এই পিতামহ ছিলেন নিরাশ্রয় শিশুনবীর একমাত্র আশ্রয়স্থল। বিধাতার কি কঠোর বিধান। এখনও তিনি মাতৃ বিয়োগের হৃদয়বিদারক শোক সংবরণ করে উঠতে পারেন নি, তাঁর আহত হৃদয় এখনও নিরাময় লাভ করে নি, অথচ আল্লাহর বিধানের নির্মম হস্ত তাকে পিতামহের স্নেহপূর্ণ বক্ষ হতেও অপসারিত করে দিল। 'আবদুল মুত্তালিব বিরাশি বছর বয়সে প্রিয় য়‍্যাতিম পৌত্রকে পরিত্যাগ করে দুনিয়া হতে চির বিদায় গ্রহণ করলেন। তখন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর বয়স ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন।

হজুন নামক স্থানে 'আবদুল মুত্তালিবকে দাফন করা হল। 'আবদুল মুত্তালিবের মৃতদেহ কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় রাসূল (সাঃ) শোকাভিভূত অবস্থায় কাঁদতে কাঁদতে মৃতদেহের সাথে গমন করেছিলেন।

মৃত্যুকালে 'আবদুল মুত্তালিব স্বীয় পুত্র আবূ তালিবের উপর প্রাণ-প্রিয় পুত্র শিশুনবীর লালন-পালন ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করে যান। পিতার অন্তিম কালের উপদেশ এবং স্বীয় স্বাভাবিক স্নেহশীলতা বশতঃ তিনি এ দায়িত্ব-কর্তব্য অতি যত্নের সাথে সুচারুরূপে পালন করেছিলেন।

এখানে একটি কথা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তা হল এঃ বহু কাল ধরে কা'বা শরীফের খিদমতের ভার এবং মক্কার উপর একচ্ছত্র অধিকার বনু হাশিমের উপর ন্যস্ত ছিল।

কিন্তু 'আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ তাদের এই ক্ষমতা হ্রাস পেল। সরদারীর সমস্ত পদ দখল করে উমায়্যা বংশীয়গণ ক্ষমতাশালী হয়ে উঠল। উমায়্যার খ্যাতনামা পুত্র 'হরব' 'আবদুল মুত্তালিবের আসন দখল করে বসল। এরূপ 'সিকায়া' ব্যতীত অন্যান্য সমস্ত পার্থিব-ক্ষমতা 'হরব'-এর অধিকারে এসে পড়ল।

শুধু সিকায়ার (হজ্জযাত্রীদের জন্য পানি সরবরাহের) ভার 'আবদুল মুত্তালিবের কনিষ্ঠ পুত্র 'আব্বাসের হাতে রইল।

 আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে মহানবী সাঃ 

আবদুল মুত্তালিবের বিভিন্ন স্ত্রীর গর্ভজাত দশটি পুত্র ছিল। কিন্তু রাসূল (সাঃ)-এর পিতা 'আবদুল্লাহ্ এবং তাঁর চাচা আবু তালিব একই মায়ের সন্তান ছিলেন। তাই 'আবদুল মুত্তালিব শিশুনবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর লালন-পালন ভার আবু তালিবের হাতে ন্যস্ত করে যান। আবু তালিব প্রিয়তম ভাতিজাকে নিজের সন্তানদের চেয়েও অধিক ভালোবাসতেন। বালক মুস্তফা (সাঃ)-এর বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অনুপম বাহ্যিক রূপ ও লাবণ্য এবং আধ্যাত্মিক চরিত্র-মাধুরী এমনিভাবে ফুটে উঠতেছিল যে, তদ্দর্শনে তাঁর প্রতি আবু তালিবের অনুরক্তি ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেতে লাগল। তিনি তাঁকে এত ভালোবাসতেন যে, শয়নকালে তাঁকে নিয়ে ঘুমাতেন, খাওয়ার সময় হলে তাঁকে নিয়ে খেতেন এবং বাইরে কোথাও যেতে হলে তাঁকে সাথে নিয়ে যেতেন। সর্বদা তাঁকে নিজের সাথে চোখে চোখে রাখতেন। আবূ তালিব জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রাণ-প্রতিম ভাতিজার প্রতি যে অকৃতিম ভালোবাসা ও অনুপম আসক্তির পরিচয় দিয়ে গেছেন, পরবর্তী ঘটনাবলী হতে পাঠকগণ তা সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে পারবেন।

'আরব দেশে মেষ-চারণ একটি সাধারণ পেশা ছিল। সে যুগে হালাল রুষি ও পবিত্র জীবিকা অর্জনের তা ছিল একমাত্র সরল ও সহজ উপায়। সেকালে সকল ভদ্র পরিবারের ছেলেরাই মেষ-চারণ করে থাকত। তখনকার দিনে 'আরব দেশে কোন স্কুল মাদ্রাসাও ছিল না এবং ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া শিক্ষা দেওয়ার কোন সূব্যবস্থা ছিল না। বেকার ঘুরা-ফিরা করলে ছেলেরা দুশ্চরিত্র বা অলস ও অর্কমা হয়ে পড়তে পারে, এই আশঙ্কায় সাধারণভাবেই ভদ্র পরিবারের অভিভাবকগণ আপন আপন ছেলেদেরকে মেষ-চারণের জন্য চারণ-ভূমিতে পাঠায়ে দিতেন। যখন রাসূল (সাঃ)-এর বয়স দশ বছর বা তদূর্ধ্ব তখন তিনিও দেশের প্রথানুযায়ী মেষ-চারণে মনোনিবেশ করলেন।

গৃহপালিত পশুদের মধ্যে ছাগল অত্যন্ত দূর্বল প্রাণী। কিন্তু তার মেজাজ বড় তেড়া। শৈশবে এরূপ তেড়া ও রুক্ষ মেজাজের দুর্বল প্রাণীর লালন-পালন ও আদর যত্ন করতে অভ্যস্ত হলে পরে রাসূল (সাঃ) অনায়াসেই নিখিল বিশ্বের নানা জাতীয়, বিভিন্ন খেয়ালের শতধা মেজাজের মানুষের নেতৃত্ব দিতে পারবেন; এজন্যই বুঝি আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মেষ-চারণে প্রবৃত্ত করেন। বস্তুতঃ তাঁর মেষ-চারণ নিখিল বিশ্বের নেতৃত্বের উপক্রমণিকা স্বরূপ ছিল।

হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ) নবী হওয়ার পর অনেক সময় ছোট বেলার মেষ-চারণের কথা অতি আনন্দের সাথে উল্লেখ করতেন। একবার তিনি সাহাবীদের সাথে মাঠে গিয়েছিলেন। তখন সাহাবীগণ জঙ্গল হতে 'কিবাস' নামক এক প্রকার বন্য ফল পেড়ে খেতে লাগলেন। তিনি তাঁদেরকে বললেন: যেই ফলগুলো পেকে খুব কালো হয় সেগুলো বেশী সুস্বাদু। আমি যখন মেঘ চরাতাম তখন আমার এই অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে। রাসূল (সাঃ)-এর এই কথা শুনে সাহাবীগণ আশ্চর্যস্বতি হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "হুযুর আপনি কি মেষ চরায়েছেন?" তিনি প্রতিউত্তরে বলেছিলেন: "নবী হওয়ার পূর্বে নবীগণ মেষ চরায়ে থাকেন। রাসূল (সাঃ) বলেন- "আমি মক্কাবাসীদের ছাগল চরাতাম।"

আল্লাহর প্রেরিত মহাপুরুষদের আত্মা অতি মহান, হৃদয় অতি কোমল। অহঙ্কার বা আত্মম্ভরিতা তাঁদেরকে স্পর্শও করতে পারে না। তাঁরা শুধু মানব জাতিকে নয়, বরং দুনিয়ার প্রত্যেক প্রাণীকে সমভাবে ভালোবাসেন, সমস্ত সৃষ্টজগতের মঙ্গল কামনা করেন। এজন্য আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রিয় নবীকে 'রহমতুল্লিল 'আলামীন' বা 'সমগ্র জগতের রহমত' উপাধিতে বিভূষিত করেছেন। তাঁরা প্রকৃত সাম্যবাদী। তাঁদের নিকট রাজ-সিংহাসন এবং রাখাল বালকের চারণভূমির ডেরা বা ঝুপরি সবই সমান। তিনি মানব-জীবনের অতি সাধারণ কাজও নিজ হাতে সমাধা করতেন। কোন প্রকার লজ্জা বা অপমান মনে করেন না। জীবিকা অর্জনের জন্য বৈধ ও হালাল উপায়কে তাঁরা সম্মানের চক্ষে দেখে থাকেন। ঘৃণা, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মম্ভরিতা ইত্যাদি সর্বপ্রকার কুপ্রবৃত্তি দূর করে মানব সমাজকে সাম্য শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেম ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্যই তাঁদের আবির্ভাব। কিছু দিন পরে মানবরূপী তেড়া স্বভাবের পথভ্রষ্ট পশুদেরকে তাঁরা নিজেদের বদান্যতা, মিষ্টি বাক্য ও সদ্ব্যবহার দ্বারা হিদায়ত করবেন, এজন্য তাঁরা শৈশবে তেড়া মেজাজের দুর্বল পশু ছাগ ও মেষ চরায়ে থাকেন। আমাদের নবীর পূর্বে হযরত মুসা, শু'আয়ব (আঃ) প্রমুখ বহু রাসূলই প্রথম জীবনে মেষ চরায়ে গিয়েছেন।

একদিন রাসূল (সাঃ)-এর সম্মুখে উটপালক ও মেষপালকদের মধ্যে তর্কবিতর্ক হচ্ছিল। তর্ক প্রসঙ্গে উটের মালিকগণ গর্ব করে লম্বা লম্বা কথা বলতে লাগল। তখন রাসূল (সাঃ) বললেন: হযরত মূসা (সাঃ) নবীরূপে আবির্ভূত হলেন অথচ তিনি মেষ চরাতেন, হযরত দাউদ (সাঃ) নবীরূপে আবির্ভূত হলেন তিনিও মেষ চরাতেন, আমিও আবির্ভূত হলাম অথচ আমিও আজয়্যাদ নামক স্থানে আমাদের নিজেদের মেষ চরাতাম।

এই বর্ণনাসমূহ হতে বুঝা যাচ্ছে যে, নবী জীবনের সাথে মেষ চারণের একটা গূঢ় কার্যকারণ সম্পর্ক আছে। জনমানবশূন্য বিশাল প্রান্তরে একা একটি মানুষ শত শত মেষের পরিচালক। আবার তাদের নাম যেমন ছাগ-ভেড়া, তাদের মেজাজও তেমনি তেড়া। যদি বলে আগে চল তবে যায় পিছনে; আর যদি বলে থাম, তবে দে ছুট সবার আগে। অথচ একা এই পরিচালকের উপরই তাদের পানাহার ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার। কোন মেষ যেন পথভ্রষ্ট না হয়, বাঘে না খায়, হারিয়ে না যায়, কোন শস্যক্ষেত্র বিনষ্ট না করে, অথচ পানাহারে পরিতুষ্ট হয়ে যেন সন্ধ্যাকালে নির্বিঘ্নে বাড়ী ফিরে, এটা হল মেষপালকের কর্তব্য। তদ্রূপ রাসূলগণও বিভিন্ন মেজাজের বিভিন্ন মুখী অসংখ্য নরনারীর পরিচালক। শয়তানরূপী বাঘের হাত হতে পথভ্রষ্টতা, কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি শত্রুর আক্রমণ হতে রক্ষা করে সততা, তাকওয়া, পরহেযগারী ও দীনদারীর খোরাক দিয়ে পরিপুষ্ট করত ইহলোকিক দিবার অবসানে নিরাপদে সকলকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌছায়ে দেওয়াই হল তাঁদের কর্তব্য। সুতরাং উভয় কর্তব্যের মধ্যে অতি নিকট সম্পর্ক। এজন্য নবী হওয়ার পূর্বে পয়গম্বরগণ মেষপালক হয়ে পূর্বাহ্নেই নবী জীবনের কর্তব্যকে বাস্তবরূপে উপলব্ধি করেন এবং কঠোর কর্তব্য পালনের জন্য নিজকে সর্বতোভাবে প্রস্তুত করে থাকেন।

 মহানবী সাঃ এর শিক্ষা 

আমাদের পাঠক-পাঠিকাগণ হয়ত ভাবতেছেন, শৈশব কাল শিক্ষার সময়। এই সময়ে শিশুর অন্তরে যে-শিক্ষা ও যে-আদর্শের রেখাপাত করা যায়, তা হয় চিরস্থায়ী। অথচ ধাত্রীগৃহে, মাতৃক্রোড়ে, পিতামহ ও পিতৃব্যের তত্ত্বাবধানে আদর-যত্ন ও দুখ-সুখের ভিতর দিয়ে আমাদের প্রিয় নবীর শৈশবকাল অতিবাহিত হতে চলল। তাঁর শিশু জীবনের সব কথাই শুনতেছি; কিন্তু তাঁর শিক্ষার কি ব্যবস্থা হল, তা কিছুই জানতে পারতেছি না।

পাঠকগণ, একে ত পয়গম্বর (আঃ) গণের শিক্ষা পদ্ধতি সাধারণ মানুষের শিক্ষা পদ্ধতি হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আবার 'সে-কালে আরব দেশে ছেলেদেরকে লেখা-পড়া শিখাবার কোন নিয়ম ছিল না। এমন কি তারা চল্লিশ বছর পরে যখন রাসূল (সাঃ) নবুওয়ত প্রাপ্ত হন তখন সারা 'আরব দেশে মাত্র কয়েক জন লোক লেখা-পড়া জানতেন। সুতরাং আমাদের প্রিয় পয়গম্বর (সাঃ) কখনও কোন মানুষের নিকট লেখা-পড়া শিখেন নি। সুতরাং তিনি ছিলেন উন্মী, তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরক্ষর। পবিত্র কুর'আনে আছে-

"আপনি এই কিতাবের (কুরআনের) পূর্বে কোন কিতাবও পড়েন নি। আর কোন কিতাব নিজ হাতে লিখতেও পারতেন না। (যদি এমন হত) তবে এ সমস্ত অসত্যবাদী (এ) সন্দেহ করতে পারত (যে, হয়ত আপনি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ দেখে সুযোগমত কুর'আন লিখে নিয়েছেন অথবা মুখস্থ করে লোকদেরকে শোনায়ে দিয়েছেন।"

মক্কাবাসী কাফিররা যদি এমন কোন প্রমাণ পেত যে তিনি জীবনে কোন দিন কোন ওস্তাদের নিকট একটি অক্ষরও লিখতে বা পড়তে শিখাতেন তবে তারা নিশ্চয়ই বলত, কুরঅঅনের উল্লিখিত আয়াতটি তথা পূর্ণ কুরআন মিথ্যা। সুতরাং আপনি যে নবী হওয়ার দাবি করেন তাও মিথ্যা (নাউযুবিল্লাহ)। পাড়া-প্রতিবেশী এবং আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর শত্রু ছিল। কিন্তু তিনি যে, লেখা-পড়া জানতেননা, একথা কেউ কোন দিন বলেনি। মোটকথা রাসূল (সাঃ) যে সম্পূর্ণ উম্মী ও নিরক্ষর ছিলেন, ইহাতে সন্দেহের লেশমাত্রও নেই। এমনকি ইউরোপীয় লেখক মারগোলিয়থ, যিনি রসূল (সাঃ) এর জীবনীকে বিকৃত করার চেষ্টা করতে বিন্দুমাত্রও ত্রুটি করেনি। সে লিখেছে-

"What is known as education, he clearly had not received"

"শিক্ষা বলতে যা বুঝা যায় তিনি তা আদৌ প্রাপ্ত হন নি"।

যে বালক একটি অক্ষরও শিখে নি, আবার কুসংস্কার জর্জরিত, তিমিরাচ্ছন্ন মূর্খ জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করলেন, কোন শিক্ষিত লোকের নিকট জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোন একটি বাক্য শুনার সুযোগও পেলেন না, অথচ তিনি ধর্মনীতি, আধ্যাত্মিকতত্ত্ব, সমাজনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সন্ধি, দেশ শাসন ও প্রজাপালন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও দর্শন-বিজ্ঞান ইত্যাদি জ্ঞানের প্রত্যেক বিভাগের এত উচ্চস্তরে আরোহণ করলেন যে, সারা দুনিয়া আজ পর্যন্ত তার কোন একটির সাথে প্রতিযোগিতা করতে সমর্থ হয় নি; আর কিয়ামত পর্যন্তও সক্ষম হবে না। তাঁর এক একটি বাক্য জ্ঞানভাণ্ডারস্বরূপ। দুনিয়া জ্ঞানের গবেষণায় যতই উন্নত ও অগ্রসর হচ্ছে ততই তাঁর প্রত্যেকটি বাণীর মধ্যে অচিন্তিত পূর্ব তথ্যের সন্ধান পেতেছে।

এ উম্মী বালকের অন্তরে এ মহাজ্ঞানের উৎস ফুটে উঠল কি প্রকারে? মানুষ যা শিখে নি তা কখনও জানতে বা বুঝতে পারে না। তবে সত্যই কি মুহাম্মদ (সাঃ) কারও নিকট হতে কিছু শিখেন নি। হাঁ, সত্যই তিনি কোন মানুষের বা কোন সৃষ্ট প্রাণীর নিকট হতে কোন কিছুই শিখেন নি। কারণ তিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। আর নবীদের শিক্ষার পদ্ধতি ও উপাদান সাধারণ মানুষের শিক্ষা পদ্ধতি হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। মানুষের অপূর্ণ শিক্ষা ও কৃত্রিম জ্ঞান তাঁদের জন্য নয়। তাঁদেকে শিক্ষা দেন স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলা। অনন্ত জ্ঞানের সেই মহাকেন্দ্র হতে জ্ঞানের জ্যোতিঃ বিকশিত হয়ে হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর হৃদয়কে উদ্ভাসিত করেছিল। তিনি সর্বজ্ঞ আল্লাহ তা'আলার নিকট হতে শিক্ষা না করে একটি কথাও বলেন নি। আল্লাহ তা'আলা বলেন-

"তিনি নিজের প্রবৃত্তি অনুযায়ী কোন কথা বলেন না, তিনি যা কিছু বলেন তা আল্লাহর তরফ হতে প্রেরিত ওহী বৈ আর কিছুই নয়।"

বিশ্বগুরু হবার জন্য ধরাধামে যাঁর আগমন, মানুষের রচিত অপূর্ণ শিক্ষা তাঁর জন্য সমীচীন নয়। সুতরাং তাঁর উম্মী বা নিরক্ষর থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তিনি যে আল্লাহর প্রেরিত পয়গম্বর, তিনি যে বিশ্বনবী এবং জগদগুরু, তাঁর নিরক্ষর থাকা এর একটা বড় প্রমাণ। এত বড় জ্বলন্ত প্রমাণ বিদ্যমান থাকতে, যার জ্ঞান চক্ষু আছে সে তাঁর নবুওয়তের প্রতি কখনও সন্দিহান হতে পারে না।

 মহানবী সাঃ এর সিরিয়া ভ্রমণ 

দুনিয়া দারুল আস্রাব। এখানে সব কাজ উপকরণ ও উপাদানের সাহায্যে সম্পাদিত হয়ে থাকে। তা সৃষ্টির সাধারণ নিয়ম। নবী (আঃ) গণের মু'জিয়া এবং ওলীদের কারামত ভিন্ন আর কোন স্থলেই এ সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে না। কোন ব্যক্তিকে কোন দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করতে হলে পূর্বাহ্নেই তাঁকে ট্রেনিং দিয়ে উক্ত দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত করে তোলা দুনিয়ার সাধারণ নিয়ম। বালক মুহাম্মদ (সাঃ) কে একদিন নিখিল বিশ্বের পথপ্রদর্শক হতে হবে, বিশ্বনবীর মসনদে উপবিষ্ট হয়ে সারা জাহানের নেতৃত্ব দিতে হবে। নেতৃত্বের উচ্চ পতাকা হাতে নিয়ে আল্লাহর পিয়ারা বান্দা পয়গম্বরগণের অগ্রণী হতে হবে; সুতরাং সর্বজ্ঞ বিশ্বনিয়ন্তা আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ট হওয়ার সাথে সাথেই তাঁকে বিশাল মরুপ্রান্তরে বেদুইন সমাজে উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে অবস্থান করায়ে মদীনা ভ্রমণ, মাতৃ-বিয়োগ, পিতামহের অন্তর্ধান প্রভৃতি নানা অবস্থা বিভিন্ন স্তরের ভিতর দিয়ে তাঁর পয়গম্বর-জীবনকে মজবুত করে গড়ে তুলতেছেন। নবুওয়ত প্রাপ্তি পর্যন্ত তাঁর পবিত্র জীবনে যা কিছু ঘটবে তার প্রত্যেকটির মধ্যেই এ উদ্দেশ্য নিহিত থাকবে এবং প্রত্যেকটি ঘটনাই অতি গুঢ় রহস্যপূর্ণ হবে।

মক্কায় প্রত্যার্বতনের সাথে সাথেই রাসূল (সাঃ)-এর জীবনের এক নূতন অধ্যায়ের সূচনা হল। উন্মুক্ত প্রকৃতির বিশ্বয়কর দৃশ্য অবলোকনের অনুশীলনী সমাধা করে এবার তিনি সামাজিক রীতি-নীতি, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার ও জীবনযাত্রা-পদ্ধতির প্রতি মনোযোগ দিলেন। এখন তিনি বাল্যজীবন অতিক্রম করে কৈশোরে পদার্পণ করেছেন। কিশোর নবী নির্বিষ্ট চিত্তে মানব-সমাজের জীবনযাত্রা প্রণালীর বৈচিত্র অবলোক করতে লাগলেন।

হজ্জের মৌসুমে অথবা বাণিজ্য-প্রদর্শনী উপলক্ষে দেশ-দেশান্তর হতে য়্যাহুদী, খৃষ্টান, আরব, পারসিক নানা জাতীয় লোক এসে মক্কা নগরে সমবেত হত; তখন তিনি অতি মনোযোগ সহকারে তাদের গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য করতেন। মক্কার বাইরের দুনিয়াটা যে কেমন, তা দেখার জন্য তখনই হয়ত তাঁর মনে কৌতূহল জন্মিয়ে থাকবে।

পাঠকগণ পূর্বেই জানতে পারছেন যে, রাসূল (সাঃ)-এর প্রপিতামহ হাশিম যখন মক্কার শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তখন তিনি রোম-সম্রাট ও হাবশ-রাজের নিকট হতে ছাড়পত্র লাভ করে এবং আরবের নানা গোত্রের সরদারদের সাথে বাণিজ্য-চুক্তি সম্পাদন করে কুরায়শদের জন্য বাণিজ্যের সুব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এ ব্যবস্থার ফলে য়্যামন ও সিরিয়ার বাণিজ্যপথ অত্যন্ত সুগম ছিল। এ পথে বণিকগণ পণ্যদ্রব্য নিয়ে কাফেলায় কাফেলায় যাতায়াত করত। মক্কার তোরণে তোরণে ব্যবসায়ীদের সারি সারি মালবাহী উটের কাফেলা দৃষ্টিগোচর হত। হয়ত এই সব দেখে কিশোর নবীর স্পৃহায়ালু অন্তরে সিরিয়া ভ্রমণের অদম্য কৌতূহল জেগে উঠেছিল।

বাণিজ্যের জন্য বছরে একবার সিরিয়া গমন করা কুরায়শদের সাধারণ নিয়ম ছিল। রাসূল (সাঃ)-এর বয়স যখন বার বছর দুই মাস দশ দিন তখন তাঁর চাচা আবু তালিব অন্যান্য ব্যবসায়ীদের সাথে পণ্য-দ্রব্য নিয়ে সিরিয়া যাত্রা করতে মনস্থ করলেন। এবার কিশোর নবীর মনের সাধ পূর্ণ হওয়ার সুযোগ ঘটল।

তিনি বললেন চাচাজান, আমিও আপনার সাথে যাব। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মরুভূমির প্রখর রৌদ্রে এবং উত্তপ্ত বাতাসে প্রিয়তম কিশোর ভ্রাতুষ্পুত্র ক্লান্ত হয়ে পড়বে, এ ভেবে অথবা অন্য কোন কারণে তাঁকে সাথে নিয়ে যেতে আবূ তালিব প্রথমতঃ অসম্মতি প্রকাশ করলেন। কিন্তু পিতৃব্য-মহব্বতে অনুরক্ত এবং ভ্রমণ স্পৃহার আতিশয্যে কৌতুহলী কিশোর ভাতিজা নাছোড় বান্দা হয়ে চাচাকে আঁকড়ায়ে ধরলেন। এ প্রস্তাবে সম্মতি না দিয়ে প্রাণাধিক ভাতিজার অন্তরে বিশেষ আঘাত লাগতে পারে ভেবে তিনি তাঁকে সাথে নিয়ে চললেন।

বর্হিজগতের সাথে আজ ভাবী বিশ্বনবীর প্রথম পরিচয় আনন্দ ও কৌতূহলে তাঁর কিশোর মন ভরে উঠল। স্থল-জাহাজে আরোহণ করে আজ মরু-সমুদ্র পাড়ি দিতে চললেন। গবেষণা-প্রিয় কিশোর নবীর অনুসন্ধিৎসুনয়ন-যুগল পথের উভয় পার্শ্বস্থ সৃষ্টির অপূর্ব দৃশ্য অবলোকন করতে লাগল। মাঠের পর পাঠ অতিক্রম করে কাফেলা ধীরে ধীরে গন্তব্য পথের দিকে অগ্রসর হতে লাগল।

মরুপ্রান্তর অতিক্রম করে কাফেলা বুসরা সীমান্তে উপনীত হল। এতদিন পর্যন্ত কিশোর নবী প্রকৃতির রুক্ষরূপ ও গুরুগম্ভীর রুদ্র মূর্তিই দেখে আসতেছেন। কিন্তু বুসরায় উপনীত হয়ে আজ তাঁর চক্ষে প্রাকৃতির আর এক নূতন দৃশ্য ভেসে উঠল। তা যেন প্রকৃতির চিত্রপটের অপর পৃষ্ঠা। কি মধুর যে এ-দৃশ্য। কত স্নিগ্ধ কোমল, কত শ্যামকান্তি যে এ দৃশ্যপট।। গোটা দেশটা শ্যামল তরুলতায় আবৃত। ছায়া ঢাকা পাখী-ডাকা কুঞ্জবন পল্লব-কিশলয় দোলায় পবন। বৃক্ষের শাখায় শাখায় ফুল ও ফল, আবার অদূরেই দেখা যায় উচ্ছন কলকল নদী জল। সৃষ্টির এই অপরূপ বৈশিষ্ট্য দেখে শিল্পের এই অভিনব বৈচিত্র্য অবলোকন করে হয়ত কিশোর নবীর তরুণ কল্পনা ছুটে চলছিল অনুপম শিল্পী অদ্বিতীয় স্রষ্টা আল্লাহ্ তা'আলার দিকে, তাঁর মহত্ত্বের দিকে, তাঁর একত্বের দিকে। কারণ এ অভিনব সৃজনলীলা, এই অভূতপূর্ব শিল্প নৈপুণ্যই তাঁর অস্তিত্বের, একত্বের ও মহত্ত্বের সেরা প্রমাণ।

কাফেলা বুসরা নগরের সন্নিকটে তাঁবু ফেলল। তৎকালে এ বুসরা নগরী ছিল নেষ্টয়ীয় খৃষ্টানদের আবাসভূমি। তখন খৃষ্টানদের অন্যান্য সম্প্রদায় শিরক্, বিদ'আত এবং পৌত্তলিকতায় নিন্মজিত হয়ে পড়ছিল। পরন্ত এ নেষ্টয়ীয় খৃষ্টানগণ পৌত্তলিকতা পছন্দ ফরত না। এমনকি পৌত্তলিকতার গন্ধ আছে মনে করে তাঁরা ক্রুশ চিহ্নকেও পরিত্যাগ করেছিল। হযরত 'ঈসা (আঃ)-এর প্রচারিত পবিত্র একত্ববাদ ও ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষা করাই ছিল এ সম্প্রদায়ের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।

আবু তালিবের তাঁবুর অদূরেই ছিল একটি নেষ্টরীয় ধর্মাশ্রম। এই আশ্রমের প্রধান যাজকের নাম ছিল বহীয়া। সাধু বহীরা বাইবেল পাঠ করে জানতে পারলেন যে, হযরত 'ঈসা' ('আঃ)-এর পরে এক একত্ববাদী বিশ্বনবীর আবির্ভাব হবে এবং তাঁর অভ্যুদয়ের সময় আসন্ন হয়ে পড়ছে। সুতরাং বহীরা সর্বদা তাঁর আগমনের প্রতীক্ষায় অনুসন্ধিৎসু থাকতেন। 

বহীরা আবু তালিবের তাঁবুর নিকটে এসে হঠাৎ আমাদের প্রিয় হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-এর হাতে ধরে বলতে লাগলেন: "এ ত যীশুর প্রতিশ্রুত শাস্তিদাতা বিশ্বনবী। ইনিই ত সকল জগতের কল্যাণস্বরূপ প্রেরিত হবেন।" এ কথা শুনে কাফেলার লোকেরা অবাক হয়ে চেয়ে রইল। বাইবেলে বর্ণিত ভাবী বিশ্বনবীর লক্ষণসমূহ প্রত্যক্ষ করেই তিনি তাঁকে চিনতে পারছিলেন।

হযরত আবু মূসা (আঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আবূ তালিব মুহাম্মদ মুস্তফা (সাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে সিরিয়া যাত্রা করেন। কয়েকজন কুরায়শ প্রধানও সাথে ছিলেন। তাঁরা (বহীরা নামক) জনৈক খৃষ্টান সন্ন্যাসীর (আশ্রমের) নিকট অবতরণ করলেন। এমন সময় সন্ন্যাসী (আশ্রম হতে) বের হয়ে তাঁদের নিকট আসলেন। ইতঃপূর্বেও তাঁরা এই পথে অতিক্রমকালে এখানে নামতেন, কিন্তু তখন সন্ন্যাসী তাঁদের নিকট আসত না।

আবূ মূসা (রাঃ) বলেন: উটের উপর হতে তাঁরা তাদের মালপত্র নামাচ্ছেন, এমন সময় বহীরা পাদ্রী তাঁদের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। বহীরা ঘুরতে ঘুরতে রাসূল (সাঃ)-এর নিকটে আসলেন এবং তাঁর হাত ধরে বলতে লাগলেন, "এই ত বিশ্ব জগতের সরদার, এই ত আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তাঁকে সর্বজগতের করুণাস্বরূপ নবীরূপে আবির্ভূত করবেন।" বহীরার কথা শুনিয়া কুরায়শ সরদারগণ জিজ্ঞেস করলেন, "এই সব তত্ত্ব আপনি কিরূপে অবগত হলেন?" বহীরা তদুত্তরে বললেন, "আপনারা যখন পাহাড় হতে নামলেন তখন প্রত্যেক বৃক্ষ এবং প্রত্যেক প্রস্তর খণ্ডই তাঁকে সিজদা করার জন্য মস্তক অবনত করেছে। আর বৃক্ষ ও পাথর 'নবী' ব্যতীত অন্য কাউকেও সিজদা করে না। অধিকন্তু আমি তাঁর কাঁধের নিম্নভাগে 'মোহরে নবুওয়ত' দেখে ও তাঁকে চিনতে পারতেছিনা। অতঃপর বহীরা ফিরে গিয়ে তাঁদের জন্য ভোজের আয়োজন করলেন। যখন বহীরা খাবার নিয়ে তাঁদের নিকট আসলেন, তখন রাসূল (সাঃ) উটের রক্ষণাবেক্ষণে ছিলেন। এইজন্য তিনি তাঁদেরকে বললেন যে, আপনারা তাঁকে ডেকে আনুন। (তাঁকে ডাকান হল।) তিনি আসতেছেন, এমন সময় দেখা গেল যে, একখণ্ড মেঘ তাঁর মাথার উপর ছায়া করে আছে। তিনি যখন কাফেলার নিকটে আসলেন। তখন দেখতে পেলেন যে, কাফেলার লোকেরা পূর্বেই একটি বৃক্ষের ছায়ায় বসে আছেন। (স্থানাভাবে) তিনি যখন (রৌদ্রে) বসে পড়লেন তখন বৃক্ষের ছায়া তাঁর দিকে সরে গেল। তখন বহীরা বললেন, দেখুন, গাছের ছায়া তাঁর দিকে সরে গেল। অতঃপর বহীরা বললেন, "আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করতেছি তোমাদের মধ্যে তাঁর অভিভাবক কে?" তাঁরা বললেন, "আবূ তালিব।” (তাঁকে য়‍্যাহ্দীদের নিকট নিয়ে যেতে নিষেধ কর)। তিনি আবু তালিবকে পুনঃপুনঃ কসম দিতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত আবূ তালিব রাসূলকে ফেরত পাঠায়ে দিলেন এবং আবু বকর তাঁর সাথে বিলালকে পাঠালেন। আর পাদরী সাহেব তাঁর পাথেয় স্বরূপ রুটি ও যয়তুন দিলেন।


পরিশেষেঃ 

প্রিয় পাঠক, আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আমরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সঃ এর জীবনী সিরিজ পর্বের ২য় পর্ব শেষ করেছি। এই সিরিজের য় পর্বটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url