শেষ সিজদা | হৃদয়ছোঁয়া ইসলামিক শিক্ষামূলক গল্প
গ্রামের নাম শান্তিপুর। ছোট্ট একটি গ্রাম, চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে সরু একটি নদী। গ্রামের এক প্রান্তে ছিল পুরোনো একটি মসজিদ। মসজিদটির দেয়ালে বয়সের ছাপ পড়লেও সেখানে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান উঠত।
সেই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন আবদুল্লাহ নামে এক বৃদ্ধ। বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। স্ত্রী অনেক বছর আগেই মারা গেছেন। একমাত্র ছেলে শহরে চাকরি করত। আবদুল্লাহ সাহেব একাই থাকতেন ছোট্ট একটি টিনের ঘরে।
তিনি খুব ধনী ছিলেন না। কিন্তু গ্রামের মানুষ তাকে সম্মান করত। কারণ তিনি কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন না। কারও বিপদ হলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করতেন।
প্রতিদিন ফজরের আজান শোনার পর তিনি ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে হাঁটতেন।
একদিন ফজরের নামাজ শেষে ইমাম সাহেব বললেন,
— “ভাইয়েরা, আমাদের গ্রামের রফিকের মেয়েটার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন। পরিবারটি খুব অসহায়। আমরা যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, সাহায্য করি।”
সবাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা দিল।
আবদুল্লাহ সাহেব চুপচাপ বসে রইলেন।
তার পকেটে ছিল মাত্র পাঁচশ টাকা। এই টাকা দিয়েই তাকে কয়েকদিনের বাজার করতে হবে।
তিনি টাকাগুলো হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে ইমাম সাহেবের হাতে পুরো পাঁচশ টাকা দিয়ে বললেন,
— “ইমাম সাহেব, আমার পক্ষ থেকে এটুকু দিয়ে দিন।”
ইমাম সাহেব অবাক হয়ে বললেন,
— “চাচা, আপনার তো নিজেরই কষ্ট হবে!”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
— “আমার রব আমাকে এতদিন খাইয়েছেন। আজ যদি তাঁর কোনো বান্দার বিপদে একটু দিতে পারি, তাহলে হয়তো তিনিই আমার জন্য কোনো ব্যবস্থা করবেন।”
ইমাম সাহেবের চোখে পানি চলে এল।
সেদিন দুপুরে আবদুল্লাহ সাহেবের ঘরে খাবার ছিল না।
তিনি অজু করে নামাজ পড়লেন। তারপর হাত তুলে বললেন,
— “হে আল্লাহ, তুমি আমার অবস্থা জানো। আমি কারও কাছে চাইতে চাই না। তুমি যদি আমার জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করো, তবে তা তোমার রহমত। আর যদি না করো, তবুও আমি তোমার ওপর অসন্তুষ্ট নই।”
দোয়া শেষ করে তিনি জায়নামাজে বসে কাঁদতে লাগলেন।
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
দরজা খুলে দেখলেন, তার ছেলে রাকিব দাঁড়িয়ে আছে।
আবদুল্লাহ অবাক হয়ে বললেন,
— “তুই হঠাৎ?”
রাকিব বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— “আব্বা, কয়েকদিন ধরে আপনাকে ফোনে পাচ্ছিলাম না। তাই চলে এলাম।”
কথা বলতে বলতে রাকিব দেখল ঘরে খাবার নেই।
সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আব্বা, আপনি কিছু খাননি?”
বৃদ্ধ কিছু বললেন না। শুধু মৃদু হাসলেন।
রাকিবের চোখে পানি এসে গেল।
সে সেদিনই বাজার করে ঘর ভরে দিল।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।
কয়েক মাস পর এক রাতে আবদুল্লাহ সাহেব খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
রাকিব তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন,
— “উনার অবস্থা খুব গুরুতর। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।”
রাকিব বাবার হাত ধরে বসে রইল।
রাত গভীর হলো।
হাসপাতালের জানালা দিয়ে দূরের মসজিদের মিনার দেখা যাচ্ছিল।
হঠাৎ ফজরের আজান শুরু হলো।
“আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার...”
আবদুল্লাহ সাহেব ধীরে ধীরে চোখ খুললেন।
তিনি ছেলেকে বললেন,
— “রাকিব, আমাকে একটু বসিয়ে দে।”
রাকিব বাবাকে ধরে বসিয়ে দিল।
বৃদ্ধ খুব কষ্ট করে বললেন,
— “নামাজের সময় হয়েছে?”
রাকিব কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “হ্যাঁ আব্বা।”
বৃদ্ধ বললেন,
— “তাহলে আমাকে অজু করিয়ে দে।”
রাকিব হাসপাতালের নিয়ম মেনে যতটা সম্ভব পানি দিয়ে তার বাবাকে অজু করিয়ে দিল।
তারপর আবদুল্লাহ সাহেব বিছানার পাশে বসে নামাজ আদায় করতে চেষ্টা করলেন।
সিজদায় গিয়ে তিনি অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে রইলেন।
রাকিব বাবার কাঁপতে থাকা শরীরের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিল।
কিছুক্ষণ পর আবদুল্লাহ সাহেব মাথা তুললেন।
তার ঠোঁটে মৃদু হাসি।
তিনি বললেন,
— “রাকিব... মনে রাখিস, মানুষের জন্য ভালো কাজ করতে কখনো ভয় পাবি না। আমরা যা দিই, আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম কিছু দিতে পারেন। আর জীবনে যত ব্যস্ততাই থাকুক, নামাজ যেন কখনো ছেড়ে না দিস।”
রাকিব বাবার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— “আব্বা, আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না।”
বৃদ্ধ ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— “সবাইকে একদিন যেতে হয় বাবা। কিন্তু ভয় পাবি না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবি।”
এরপর তিনি আবার চোখ বন্ধ করলেন।
তার ঠোঁটে তখনও হাসি।
কিছুক্ষণ পর তার হাতটি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে গেল।
রাকিব বুঝতে পারল—তার বাবা চলে গেছেন।
বাবার জানাজায় গ্রামের অসংখ্য মানুষ এসেছিল।
ইমাম সাহেব জানাজার আগে বললেন,
— “আবদুল্লাহ সাহেব আমাদের শিখিয়ে গেছেন—আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর পথ শুধু বড় বড় কাজের মাধ্যমে নয়; একটি ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দেওয়া, বিপদে কাউকে সাহায্য করা, ভালো কথা বলা—এসব ছোট ছোট আমলও মানুষের জীবনে বড় হয়ে উঠতে পারে।”
রাকিব বাবার কথা মনে করে কাঁদছিল।
তার মনে হচ্ছিল, বাবার শেষ সিজদাটি যেন তাকে একটি বার্তা দিয়ে গেছে—
“দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ভালো কাজের প্রতিদান আল্লাহর কাছে চিরস্থায়ী।”
সেদিন থেকে রাকিব বাবার মতো মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল।
আর গ্রামের সেই পুরোনো মসজিদে আজও ফজরের আজান উঠলে মানুষ আবদুল্লাহ সাহেবকে মনে করে।
কারণ তিনি ধন-সম্পদ রেখে যাননি।
তিনি রেখে গেছেন একটি সুন্দর জীবনযাপনের শিক্ষা।
গল্পের শিক্ষা
মানুষের জীবনে সম্পদ, সম্মান কিংবা ক্ষমতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের উপকার করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নশীল থাকা একজন মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আমরা জানি না আমাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত কখন আসবে। তাই প্রতিটি দিনকে ভালো কাজ, তওবা, ইবাদত ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো উচিত।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈমানের সঙ্গে জীবন কাটানোর এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।