প্রকৃত মুসলমান হওয়ার জন্য যেসকল জ্ঞান থাকা প্রয়োজন

অপরিহার্য জ্ঞানসমূহ

আরবি 'ইলম' শব্দের বাংলা হলো বিদ্যা বা জ্ঞান। ইলম হচ্ছে এমন একটি আলো যা দ্বারা মানুষ অজ্ঞতার অন্ধকার হতে সঠিক পথের সন্ধান পায়। ইসলামে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে মানবজাতির প্রতি প্রথম নির্দেশই ছিল 'ইকরা' অর্থাৎ পড়ো তথা জ্ঞান অর্জন করো। এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

'পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন।

সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না।' (সূরা আলাক: ১-৫)

উপরোক্ত আয়াতে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য এবং তা অর্জনের দুটি মাধ্যমের দিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে 'পড়ো তোমার প্রভুর নামে'।

মুসলিম হওয়ার জন্য যেসকল জ্ঞান থাকা আবশ্যক
প্রকৃত মুসলমান হওয়ার জন্য যেসকল জ্ঞান থাকা প্রয়োজন

অর্থাৎ পড়ার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করার দিকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আবার চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে 'যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়ে থাকেন' অর্থাৎ লেখনীর মাধ্যমে জ্ঞানকে সংরক্ষণ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আর পড়ার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সম্পর্কে জানা।

তাছাড়া রাসূল (সা.) জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত 

'জ্ঞানার্জন একটি কলাণ্যকর কাজ। জ্ঞান অর্জন মানুষকে ভুলপথ পরিহার করে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সহযোগিতা করে।'

ইলম অর্জনকারী ব্যক্তি অধিক মর্যাদার অধিকারী। এ সম্পর্কে হজরত আবু উমামা বাহেলি (রা.) হতে বর্ণিত হাদিস, একদা নবি কারিম রাসূল (সা.)-এর নিকট এমন দুই ব্যক্তির বিষয় আলোচনা করা হলো, যাদের একজন ছিলেন আবেদ অন্যজন ছিলেন আলেম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমাদের একজন সাধারণ মুসলমানের তুলনায় একজন ইলম অর্জনকারীর মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) জ্ঞানার্জনকারীর মর্যাদা সম্পর্কে বললেন,

'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা, ফিরেশতাগণ, আসমান জমিনের অধিবাসীরা, এমনকী গর্তের পিপীলিকা থেকে মাছ পর্যন্ত সে ব্যক্তির জন্য দু'আ করে, যে লোকদের কল্যাণের (ইলম) শিক্ষা দান করে।' (আবু দাউদ: ৩৬৪১)

জ্ঞান বা ইলমের প্রধান উৎস ৪টি:
১। আল কুরআন
২। আল হাদিস
৩। ইজমা
৪। কিয়াস

১. আল কুরআন

ইসলামে জ্ঞানের প্রধান উৎস হলো আল কুরআন। যা আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে সুদীর্ঘ ২৩ বছরে হয়রত মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর নাজিল হয়। আল কুরআনের সূরা সংখ্যা ১১৪টি, আয়াত সংখ্যা ৬২৩৬/৬৬৬৬ টি, পারা সংখ্যা ৩০টি, রুকু সংখ্যা ৫৪০টি। আল কুরআনের প্রথম সূরা আল ফাতিহা আর শেষ সূরা আন নাস। আল কুরআনে মানবজাতির জন্য সকল সমস্যার সমাধান দেওয়া হয়েছে এবং এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, 

'এটা মানুষের জন্য সুস্পষ্ট বর্ণনা এবং আল্লাহভীরুদের জন্য পথ প্রদর্শক ও উপদেশ।' (সূরা আলে ইমরান: ১৩৮)

'নিশ্চয়ই আমি এ উপদেশবাণী নাজিল করেছি, আমিই এর সংরক্ষণ করবো।' (সূরা হিজর: ৯)

রাসূল (সা.) বলেছেন,

'কুরআনের একটি হরফ পাঠের জন্য ১০টি করে নেকি প্রদান করা হবে।' (তিরমিজি: ২৯১০)

তাছাড়া যে ব্যক্তি কুরআন বুঝে পড়ে ও সে অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করে বিচার দিবসে ওই ব্যক্তির মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট কুরআন সুপারিশ করবে। আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জীবন পরিচালনা করার প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ের মূলনীতি বর্ণনা করেছেন। অতএব আমাদের উচিত অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ পুরো কুরআন বার বার অধ্যয়ন করা। কুরআন থেকে আমাদের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সংগ্রহ করা। এ জন্য প্রয়োজন কুরআন সহীহভাবে পড়তে শেখা। প্রতিদিন কিছু সময় আল্লাহর এই কিতাব অধ্যয়ন করা এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।

২. আল হাদিস

হাদিস বা সুন্নাহ ইসলামী শরিয়তে ২য় প্রধান জ্ঞানের উৎস। সুন্নাহর আরেক অর্থ হাদিস। রাসূল (সা.) এর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতিকে সুন্নাহ বা হাদিস বলে। হাদিসও একপ্রকার ওহী যাকে ওহীয়ে গায়রে মাতলু বলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

'তিনি (রাসূল) অহি ব্যতীত কোনো কথাই বলতেন না।' (সূরা নজম: ৩-৪)

রাসূল (সা.)-এর অসংখ্য হাদিস আছে, এসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থে। এর মাঝে ৬টি হাদিস গ্রন্থকে বিশুদ্ধ বা সহিহ হাদিস গ্রন্থ বলা হয়। 

ইসলামের প্রাথমিক পরিচয় গুলো হলো:
১. সহিহ বুখারি 
২. সহিহ মুসলিম 
৩. জামে আত তিরমিজি
৪. সুনানে আবু দাউদ 
৫. সুনানে ইবনে মাজাহ এবং 
৬. সুনানে নাসাই।

রাসূল (সা.)-এর জীবন সম্পর্কে জানার জন্য উক্ত হাদিস গ্রন্থগুলো পড়া আবশ্যক। তাছাড়াও তার জীবনী সম্পর্কে রচিত হয়েছে অসংখ্য সিরাত গ্রন্থ, যা অধ্যয়নের মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর জীবন হতে আমাদের জীবন পরিচালনার জন্য পাথেয় অর্জন করা সম্ভব।

৩। ইজমা

ইজমা ইসলামী শরিয়াতে তৃতীয় প্রধান জ্ঞানের উৎস। ইজমা শব্দের অর্থ ঐক্যমত হওয়া। যদি ব্যক্তি জীবনে চলার পথে কোনো বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে সরাসরি নির্দেশনা পাওয়া না যায় তাহলে উক্ত বিষয়ে মুসলিম উম্মার আলেম শ্রেণির সামষ্টিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তাকেই ইজমা বলে। তবে ইজমার ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হবে না।

ইজমার ভিত্তি হিসাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

'আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন।

পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করুন আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।' (সূরা আলে ইমারান: ১৫৯) 

'যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, নামাজ কায়েম করে; পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।' (সূরা শুরা: ৩৮)

এ বিষয়ে রাসূল (সা.) বলেন,

'আমার উম্মত যা ভালো মনে করে তা আল্লাহর কাছেও ভালো। আমার উম্মত কখনো ভ্রান্ত বিষেয়ে একমত হবে না।' (তিরমিজি: ২১৬৭)

৪। কিয়াস

কিয়াস ইসলামী শরিয়তে ৪র্থ প্রধান জ্ঞানের উৎস। কিয়াস অর্থ অনুমান করা, তুলনা করা, সাদৃশ্য। শরিয়তের পরিভাষায় যদি কোনো বিষয়ে কুরআন হাদিস ও ইজমার মাধ্যমে সুস্পষ্ট সমাধান পাওয়া না যায়। তবে অনুরূপ কোনো বিষয়ে কুরআন হাদিসে বর্ণিত নির্দেশনাকে বিবেচনায় রেখে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তাকেই কিয়াস বলে। তবে বিশুদ্ধতার বিচারে কিয়াস জ্ঞানার্জনের একটি দুর্বল উৎস।

কতটুকু ইলম বা জ্ঞান অর্জন আবশ্যক?

যে ব্যক্তি ইসলামী জীবনবিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে চায় তাকে সর্বপ্রথম ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে হবে। এজন্য সংক্ষিপ্ত নয়; বরং কমবেশি বিস্তারিত জ্ঞানার্জন করতে হবে। আর এ স্বল্পতা ও বিপুলতা মানুষের যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। এ প্রশ্নের সহজ জবাব হলো, যার ওপর যে দায়িত্ব আসে তা পালন করার জন্য যতটুকু ইলম জরুরি ততটুকু ইলম হাসিল করাই ফরজ। কালেমা তাইয়েবাতে আমরা দু'দফা ওয়াদা করেছি যে, জীবনে সব সময় আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের (সা.) তরিকা মেনে চলব। তাই আমাদের যে দায়িত্বই পালন করতে হয়, মুসলিম হিসেবে তা পালন করতে হলে ওই ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম কী ও রাসূলের তরিকা কী তা জেনে নেওয়া ফরজ। তা না হলে কাফিরের মতোই দায়িত্ব পালন করা হবে। ইসলামী আকিদা বিশ্বাসকে জাহেলি চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাস থেকে পৃথক করে জানতে হবে। জীবনের বিভিন্ন বিভাগে ইসলাম যেসব দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে তা জানতে হবে।

এ জ্ঞানার্জন ছাড়া একজন মানুষ নিজে ইসলাম মেনে চলতে পারবে না এবং অন্যকে ইসলামী অনুশাসনের দিকে আহবানও করতে পারবে না।

যার ওপর জাকাত দেওয়া ফরজ নয় তার ওপর জাকাতের ইলম হাসিলও ফরজ নয়। জাকাত দেওয়ার দায়িত্ব আসলে সে ইলম ফরজ হয়ে যাবে। যে বিয়ে করেনি, মুসলিম স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে কীভাবে চলতে হবে সে ইলম তার ওপর ফরজ নয়। বিয়ে করার সাথে সাথে দুজনের ওপর তা ফরজ হয়ে যাবে।

যে ব্যবসা করে তাকে এ বিষয়ে ওহির ইলম জানতে হবে। তা না হলে কাফির ব্যবসায়ীর মতোই ব্যবসা করবে, যদিও সে পাক্কা নামাজি ও রোজাদার হয়।

যে দেশ শাসনের দায়িত্ব পালন করছে, সে যদি মুসলিম শাসকের মর্যাদা পেতে চায় তাহলে রাসূল (সা.) কীভাবে শাসন করেছেন তা তাকে জানতে হবে। তা না হলে সে কাফির শাসকের মতোই দেশ শাসন করবে। যখন কারো সন্তানের জন্ম হয় তখন মুসলিম পিতা ও মাতার দায়িত্ব পালন করতে হলে এ বিষয়ে ওহির ইলম হাসিল করতেই হবে। তবে সহজে আমরা এ কথা বলতে পারি যে একজন মানুষের জীবন পরিচালনা করার জন্য যতটুকু জ্ঞান প্রয়োজন ততটুকু অর্জন করা ফরজ।

তবে যতটুকু জ্ঞান অর্জন আবশ্যক হোক না কেন এ কথা বলা যায় যে জ্ঞানার্জনের দিক থেকে যারা যত বেশি এগিয়ে আজকের দুনিয়াতে তারাই তত বেশি নেতৃত্বের আসনে সমাসীন। তাই মুসলমানদের তাদের হারানো ঐতিহ্য মর্যাদা ফিরে পেতে হলে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় আরও বেশি নজর দিতে হবে। 

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url