জানাযার নামায ও দাফনের মাসায়েল: নিয়ম, ফরজ ও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
ইসলামে মানুষের জীবনের মতো মৃত্যুর পরও তার প্রতি সম্মান, দায়িত্ব ও অধিকার রক্ষার নির্দেশনা রয়েছে। কোনো মুসলমান মৃত্যুবরণ করলে তাকে গোসল দেওয়া, কাফন পরানো, জানাযার নামায আদায় করা এবং যথাযথভাবে দাফন করা মুসলিম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
জানাযার নামায ফরযে কিফায়া। অর্থাৎ, সমাজের কিছুসংখ্যক মুসলমান জানাযার নামায আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। কিন্তু কেউই যদি জানাযার নামায আদায় না করে, তাহলে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব পালন না করার কারণে সংশ্লিষ্ট সবাই গুনাহগার হবে।
নিচে জানাযার নামায, এর নিয়ম, ফরজ, সুন্নত এবং দাফনসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।
জানাযার নামায কী?
মৃত মুসলমানের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা, রহমত ও মাগফিরাত প্রার্থনা করার উদ্দেশ্যে যে বিশেষ নামায আদায় করা হয়, তাকে জানাযার নামায বলা হয়।
জানাযার নামাযে রুকু ও সিজদা নেই। এতে দাঁড়িয়ে মোট চারটি তাকবির বলা হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা হয়।
জানাযার নামাযের প্রস্তুতি
জানাযার নামায আদায়ের আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—
১. মৃত ব্যক্তিকে শরিয়তসম্মতভাবে গোসল দিতে হবে।
২. মৃতকে কাফন পরাতে হবে।
৩. জানাযার স্থান পরিষ্কার ও উপযুক্ত হতে হবে।
৪. ইমাম ও মুসল্লিদের পবিত্রতা অর্জন করতে হবে।
৫. মৃত ব্যক্তিকে কিবলার দিকে রেখে সামনে স্থাপন করতে হবে।
৬. ইমাম ও মুসল্লিরা কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াবেন।
জানাযার নামাযে সাধারণত মৃত ব্যক্তির মর্যাদা ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ইমাম দাঁড়ান। এ বিষয়ে মাজহাবভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
জানাযার নামাযের নিয়ত
নিয়ত মূলত অন্তরের ইচ্ছার নাম। জানাযার নামায আদায়ের সময় অন্তরে এই সংকল্প করতে হবে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মৃত মুসলমানের জানাযার নামায আদায় করছি এবং তার জন্য দোয়া করছি।
নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়। তবে কেউ নিজের মনোযোগ স্থির করার জন্য মুখে নিয়ত উচ্চারণ করলে তা প্রচলিত ফিকহি মত অনুযায়ী করতে পারেন।
জানাযার নামায পড়ার নিয়ম
হানাফি ফিকহের প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী জানাযার নামাযে চারটি তাকবির বলা হয়।
প্রথম তাকবির
ইমাম ‘আল্লাহু আকবার’ বলে প্রথম তাকবির বলবেন। প্রথম তাকবিরের সময় হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে নাভির নিচে হাত বাঁধা হবে।
এরপর সানা পড়তে হবে। জানাযার নামাযে প্রচলিত সানার মধ্যে সাধারণত—
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَجَلَّ ثَنَاؤُكَ وَلَا إِلٰهَ غَيْرُكَ
পড়া হয়।
এর অর্থ:
“হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র, আপনারই প্রশংসা। আপনার নাম বরকতময়, আপনার মর্যাদা মহান, আপনার প্রশংসা মহিমান্বিত। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।”
দ্বিতীয় তাকবির
প্রথম তাকবিরের পর দ্বিতীয়বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলা হবে। দ্বিতীয় তাকবিরের সময় সাধারণত হাত উঠানো হয় না।
এরপর দরূদে ইবরাহিম পড়তে হবে। নামাযে যে দরূদে ইবরাহিম পড়া হয়, জানাযার নামাযেও তা পড়া যায়।
তৃতীয় তাকবির
তৃতীয়বার ‘আল্লাহু আকবার’ বলার পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে হবে।
মৃতের জন্য প্রচলিত একটি দোয়া হলো—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ
নারী মৃত হলে ‘لَهُ’-এর পরিবর্তে ‘لَهَا’ পড়া হবে।
অর্থ:
“হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, তার প্রতি দয়া করুন, তাকে নিরাপদ রাখুন এবং তাকে মার্জনা করুন।”
মৃত ব্যক্তি শিশু হলে তার জন্য উপযুক্ত দোয়া করা হয়। জানাযার দোয়ায় মৃতের মাগফিরাত, রহমত এবং জান্নাতের প্রার্থনা করা উচিত।
চতুর্থ তাকবির
চতুর্থবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলার পর ইমাম ডান দিকে এবং বাম দিকে সালাম ফিরিয়ে জানাযার নামায শেষ করবেন।
মুসল্লিরাও ইমামের অনুসরণ করে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করবেন।
জানাযার নামাযের ফরজ
হানাফি ফিকহের প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী জানাযার নামাযের প্রধান ফরজ দুটি—
১. চারটি তাকবির বলা
জানাযার নামাযে চারবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলা আবশ্যক। প্রতিটি তাকবির জানাযার নামাযের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২. দাঁড়িয়ে নামায আদায় করা
সামর্থ্য থাকা অবস্থায় জানাযার নামায দাঁড়িয়ে আদায় করতে হয়। কোনো গ্রহণযোগ্য ওজর না থাকলে বসে জানাযার নামায আদায় করা ঠিক নয়।
জানাযার নামাযের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত
জানাযার নামাযে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত রয়েছে। প্রচলিত হানাফি ফিকহ অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো—
১. প্রথম তাকবিরের পর সানা পড়া।
২. দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরূদ শরিফ পড়া।
৩. তৃতীয় তাকবিরের পর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা।
৪. ইমামের অনুসরণ করা।
৫. জানাযার নামাযে একাগ্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে দাঁড়ানো।
সুন্নতের সংখ্যা ও শ্রেণিবিন্যাসে ফিকহের বিভিন্ন গ্রন্থে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।
জানাযার নামাযে কাতার
জানাযার নামাযে একাধিক কাতার করা উত্তম। অনেক ফকিহ তিনটি কাতার করার বিষয়টি মুস্তাহাব বা সুন্নত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মুসল্লি বেশি হলে একাধিক কাতার করা যায়। কাতার সুশৃঙ্খল, সোজা ও পরস্পর সংযুক্ত হওয়া উচিত।
জানাযার নামাযে কিছু আদব
জানাযার নামায আদায়ের সময় মুসল্লিদের কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা উচিত—
- অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা না বলা।
- মৃত ব্যক্তির জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা।
- ইমামের তাকবির অনুসরণ করা।
- কাতার সোজা রাখা।
- মৃত ব্যক্তির সম্মান বজায় রাখা।
- জানাযাকে সামাজিক প্রদর্শন বা অহংকারের বিষয় না বানানো।
- মৃত ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি আলোচনা না করা।
দাফন করা
মৃত ব্যক্তিকে যথাযথভাবে দাফন করাও মুসলিম সমাজের দায়িত্ব। জানাযার নামাযের পর দ্রুত ও সম্মানের সঙ্গে দাফনের ব্যবস্থা করা উচিত।
দাফনের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির মর্যাদা, কবরস্থানের নিয়ম, স্থানীয় পরিস্থিতি এবং শরিয়তের নির্দেশনা বিবেচনা করতে হবে।
কবরে মৃত ব্যক্তিকে রাখার নিয়ম
মৃত ব্যক্তিকে কবরে সাধারণত ডান কাত করে কিবলামুখী করে রাখা হয়। এটি প্রচলিত সুন্নত পদ্ধতি।
কবরে মৃত ব্যক্তিকে নামানোর সময় কোমলতা ও সম্মান বজায় রাখতে হবে। মৃতের শরীর যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
মৃতকে কবরে রাখার সময়—
بِسْمِ اللَّهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللَّهِ
বলা প্রচলিত রয়েছে।
এর অর্থ:
“আল্লাহর নামে এবং আল্লাহর রাসুলের আদর্শের ওপর।”
এই দোয়াটি পড়ার বিষয়ে ফিকহি গ্রন্থে আলোচনা রয়েছে।
নারীর দাফনের সময় পর্দা
নারী মৃত ব্যক্তিকে কবরে নামানোর সময় পর্দার ব্যবস্থা করা উত্তম। বিশেষ করে মৃতের দেহ বা কাফন প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা থাকলে পর্দার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।
মৃত নারীর সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা করা জীবিত মুসলমানদের দায়িত্ব।
কবরের ওপর মাটি দেওয়া
মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার পর মাটি দিয়ে কবর বন্ধ করতে হবে। সাধারণত উপস্থিত মুসলমানেরা নিজ হাতে কিছু মাটি দিয়ে থাকেন।
মাটি দেওয়ার সময় কুরআনের এই আয়াতের অংশগুলো পড়া প্রচলিত রয়েছে—
مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ
“আমি তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি।”
وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ
“এবং তাতেই তোমাদের ফিরিয়ে দেব।”
وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى
“আর তা থেকেই তোমাদের পুনরায় বের করব।”
এগুলো সূরা ত্বহা-এর ৫৫ নম্বর আয়াতের অংশ।
দাফনের পর মৃতের জন্য দোয়া
দাফন শেষ হওয়ার পর কিছু সময় কবরের পাশে অবস্থান করে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা উত্তম।
মৃতের জন্য এভাবে দোয়া করা যায়—
“হে আল্লাহ! আপনি এই মৃত ব্যক্তিকে ক্ষমা করুন। তার কবর প্রশস্ত করুন। তাকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করুন। তার ভুলত্রুটি মার্জনা করুন এবং তাকে জান্নাতের অধিবাসী করুন।”
দাফনের পর মৃত ব্যক্তির জন্য ইস্তিগফার ও দোয়া করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আমল।
কবরে পানি ছিটানো
অনেক স্থানে দাফনের পর কবরের ওপর পানি ছিটানোর প্রচলন রয়েছে। এ বিষয়ে ফিকহি মতপার্থক্য আছে। স্থানীয় প্রচলন অনুসরণ করার আগে নির্ভরযোগ্য আলেমের মতামত জানা ভালো।
কবরের ওপর পানি ছিটানোকে ইসলামের সর্বসম্মত ও আবশ্যিক বিধান হিসেবে দাবি করা উচিত নয়।
একটি কবরে একাধিক মৃত ব্যক্তিকে দাফন
সাধারণ অবস্থায় একজন মৃত ব্যক্তিকে একটি পৃথক কবরে দাফন করা উত্তম। তবে যুদ্ধ, দুর্যোগ, মহামারি, জায়গার সংকট বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক মৃত ব্যক্তিকে একই কবরে দাফন করার অনুমতি ফিকহে আলোচিত হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় আলেম ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কবরের ওপর দালান বা সৌধ নির্মাণ
কবরকে সৌন্দর্য প্রদর্শন, অহংকার বা লোকদেখানোর মাধ্যম বানানো ইসলামের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কবরের ওপর অপ্রয়োজনীয় দালান, গম্বুজ, মিনার বা জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে হাদিসে সতর্কতা এসেছে। তাই কবরকে সাধারণ, পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ রাখা উচিত।
কবরের ওপর স্থাপনা নির্মাণের বিধান নিয়ে ফিকহি বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় কবরস্থানের নিয়ম ও নির্ভরযোগ্য আলেমের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
সমুদ্রে কারও মৃত্যু হলে
সমুদ্রযাত্রার সময় কেউ মৃত্যুবরণ করলে প্রথমে সম্ভব হলে মৃত ব্যক্তির গোসল, কাফন ও জানাযার ব্যবস্থা করতে হবে।
যদি কাছাকাছি স্থলভূমি থাকে এবং সেখানে নিয়ে গিয়ে দাফন করা সম্ভব হয়, তাহলে স্থলভূমিতে দাফন করাই উত্তম।
কিন্তু স্থলভূমিতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগলে এবং লাশ নষ্ট বা বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সমুদ্রে দাফনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ধরনের জরুরি সিদ্ধান্ত জাহাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট আলেমদের পরামর্শে নেওয়া উচিত।
জানাযা ও দাফনের সময় যেসব বিষয় এড়িয়ে চলতে হবে
জানাযা ও দাফনের সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকা উচিত—
১. উচ্চস্বরে বিলাপ করা।
২. মৃত ব্যক্তির নামে শরিয়তবিরোধী কথা বলা।
৩. অপ্রয়োজনীয় লোকদেখানো আয়োজন করা।
৪. মৃত ব্যক্তির সম্পদ নিয়ে ঝগড়া করা।
৫. কবরস্থানে হাসি-ঠাট্টা ও অশোভন আচরণ করা।
৬. মৃত ব্যক্তির গোপনীয়তা ও দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করা।
৭. কবরকে ব্যবসা বা প্রদর্শনের বস্তু বানানো।
৮. জানাযা ও দাফনকে রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম করা।
উপসংহার
মৃত্যু প্রত্যেক মানুষের জন্য অবশ্যম্ভাবী। একজন মুসলমানের মৃত্যুর পর তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, জানাযার নামায আদায়, দাফন সম্পন্ন করা এবং তার জন্য দোয়া করা জীবিত মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
জানাযার নামায ফরযে কিফায়া। এতে চারটি তাকবির বলা হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাত ও রহমতের দোয়া করা হয়। দাফনের সময় মৃতের সম্মান, পর্দা, কিবলামুখী অবস্থান এবং কবরের সরলতা বজায় রাখা উচিত।
জানাযা ও দাফনের অনেক বিস্তারিত বিধান মাজহাব, পরিস্থিতি ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই বাস্তব কোনো ঘটনায় নির্ভরযোগ্য আলেম, মুফতি বা দায়িত্বশীল ইসলামি কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে জানাযা ও দাফনের দায়িত্ব পালন করার তাওফিক দান করুন এবং সকল মৃত মুসলমানকে ক্ষমা করে দিন। আমিন।